বয়স্ক কর্মচারীটি তার যুবক সহকর্মীকে ধমকে দিলেন, দ্যাশ ছাইড়া এনারা চইলা যাইতে আছে। ভালভাবে কথা ক’ সিরাজ। বিনুর দিকে ফিরে সহানুভূতির সুরে বলে, অর কথায় মনে কিছু কইরেন না। কাইল কইলকাতার ট্রেন দ্যায় নাই, আইজ নিচ্চয় দিব। মনে লয়, দ্যাড় দুই ঘণ্টার মইদ্যে লাইনে ট্রেন আইসা যাইব।
যুবক কর্মচারীটির কথায় মন তিক্ত হয়ে গিয়েছিল বিনুর। এর উপযুক্ত জবাব দেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু এখন যা পরিস্থিতি, সেটা করতে গেলে আগুন ধরে যাবে। মুখ বুজে তাকে মেনে নিতে হল। তবে পরিবেশ যতই অগ্নিগর্ভ হোক, পৃথিবীতে ভাল মানুষ থাকেই। বয়স্ক কর্মচারীটি অনেক বিবেচক এবং বিচক্ষণ। তার সহৃদয় ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে গেল সে।
ট্রেন সম্পর্কে যা জানার ছিল, জেনে নিয়েছে বিনু। সে ফিরে আসছিল। হঠাৎ চোখে পড়ল, জনতিনেক সাদা চামড়ার সাহেব এবং দুই মেম কী যেন করছে। তাদের ঘিরে মোটামুটি একটা ভিড়।
গোয়ালন্দের স্টিমারঘাটের বাইরে ভিটেমাটি ফেলে আসা উদ্বাস্তুদের ভেতর সাহেব-মেম দেখা যাবে, ভাবতে পারেনি বিনু। তার কৌতূহল হচ্ছিল। নিজের অজান্তেই ওদের দিকে এগিয়ে গেল।
সাহেব-মেমদের বয়স খুব বেশি নয়। তিরিশের নিচেই হবে। পুরুষদের পরনে হাঁটুঝুল হাফপ্যান্ট, শার্ট এবং মোটা কটনের জ্যাকেট। মাথায় শোলার হ্যাঁট। মেমসাহেবরা পরেছে চাপা ট্রাউজার্স, ঢোলা শার্ট, মাথায় হেলানো ফেল্ট হ্যাঁট। সবারই পায়ে পুরু সোলের মজবুত জুতো। কারোর কারোর চোখে সানগ্লাস। এরা কোন দেশের মানুষ–ব্রিটিশ, ফ্রেঞ্চ না জার্মান–বোঝা যাচ্ছে না।
দূর থেকে চোখে পড়ে নি, কাছে এসে দেখা গেল, এই দলটার একজন হাঁটু গেড়ে মুভি ক্যামেরা চালিয়ে উদ্বাস্তুদের ছবি তুলছে। অন্য একজন তাকে সাহায্য করছে। আগে কী একটা বইতে মুভি ক্যামেরার ছবি দেখেছে বিনু, এই প্রথম স্বচক্ষে দেখল।
অন্য একটি সাহেব এবং দুই মেম টেপ রেকর্ডার নিয়ে উদ্বাস্তুদের প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে চলেছে। তাদের বাড়ি কোন গ্রামে, কেন তারা দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছে, কলকাতায় গিয়ে তারা কোথায় উঠবে, কী করবে, ইত্যাদি।
উদ্বাস্তুরা ইংরেজি জানে না। সাহেব-মেমরা বাংলা বোঝে না, বিশেষ করে পূর্ববঙ্গের আঞ্চলিক বাংলা তাদের কাছে একেবারেই দুর্বোধ্য। তাই সাহায্য করার জন্য তিনজন শিক্ষিত বাঙালি যুবককে সঙ্গে নিয়েছে। তারা দোভাষীর কাজ করছে। সাহেব-মেমদের প্রশ্নগুলো বাংলা করে উদ্বাস্তুদের জানিয়ে দিচ্ছে, আর উদ্বাস্তুদের জবাব ইংরেজি করে সাহেব-মেমদের বলছে। কিন্তু এই যুবকেরা ইংরেজি : বলায় তেমন সড়গড় নয়। মাঝে মাঝে গোলমাল করে ফেলছে।
নানা জনের দেশছাড়ার কারণ টেপ রেকর্ডারে ধরে রাখতে রাখতে এক বিদেশি তরুণী বিনুর সামনে চলে আসে। তার দলামোচড়া ময়লা পোশাক, উষ্কখুষ্ক চুল, চোখের তলায় কালির পোঁচ, ইত্যাদি দেখতে দেখতে বিদেশিনীর মনে হয়েছে সে-ও ছিন্নমূল জনতার একজন। অন্য অনেকের মতো তারও ধারণা, বিনু শিক্ষিত যুবক। মেয়েটি ইংরেজিতে জিজ্ঞেস করে, আপনি কি ইংরেজি জানেন?
মাথা সামান্য হেলিয়ে দেয় বিনু, জানি।
অন্তত বিনুর ব্যাপারে যে ইন্টারপ্রেটারের সাহায্য নিতে হবে না, সরাসরি কথা বলা যাবে, এতে মেয়েটি যথেষ্ট স্বস্তিবোধ করে। বলে, আপনি নিশ্চয়ই দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছেন?
উত্তর দেবার আগে আমার কিছু বলার আছে।
হ্যাঁ হ্যাঁ, বলুন—
আপনারা এই যে ছবি তুলছেন, লোকজনের কথা রেকর্ড করছেন–এসব কী জন্যে?
তরুণীটি জানায়, তারা ব্রিটিশার। লণ্ডনের একটা বড় ফিল্ম কোম্পানির সঙ্গে যুক্ত। এই কোম্পানি পূর্ণদৈর্ঘের ছবি করা ছাড়া ডকুমেন্টারি ছবিও করে থাকে। এই শতাব্দীতে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের মতো মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে গেছে, প্রাণহানি হয়েছে লক্ষ লক্ষ মানুষের। কিন্তু ভারতবর্ষের বিভাজন তার চেয়ে এতটুকু কম ভয়াবহ নয়। পৃথিবীর এই গোলার্ধে জাতি-দাঙ্গায় কত জনের মৃত্যু হয়েছে, সীমান্তের এপার থেকে ওপারে, ওপার থেকে এপারে কত লক্ষ মানুষ চলে গেছে, তার হিসেব নেই। এই শতকের এমন ব্যাপক হিউম্যান ট্র্যাজেডি’র প্রামাণ্য চিত্র ভবিষ্যতের জন্য তুলে রাখা অত্যন্ত জরুরি।
এই ইংরেজ তরুণ-তরুণীরা মানবিক দায়িত্ববোধে বিশাল কাজে হাত দিয়েছে। পূর্ব পাকিস্তানে আসার আগে তারা পশ্চিম পাকিস্তানের সিন্ধু ও পাঞ্জাবে গিয়েছিল দেশভাগের ঠিক পরে পরেই। পাঞ্জাবের সম্পূর্ণ জন-বিনিময়ের ছবি তারা যতটা পেরেছে তুলে রেখেছে। এই সেঞ্চুরিতে এমন টোটাল ট্রান্সফার অফ পপুলেশন আর কোনও দেশে হয়েছে কিনা, তাদের জানা নেই।
কোথায়, কত হাজার মাইল দূরে, ভূমণ্ডলের দূর প্রান্তে এই তরুণ-তরুণীদের বাড়ি, আর কোথায় এই খণ্ডিত উপ-মহাদেশ! ভারত-ভাগের শোচনীয় ঐতিহাসিক ঘটনাকে চিরস্থায়ী করে রাখার জন্য তারা গোয়ালন্দের স্টিমারঘাটে ছুটে এসেছে, এ যেন ভাবা যায় না। অভিভূতের মতো তাকিয়ে থাকে বিনু।
মেয়েটি বলে, এবার তা হলে পুরনো প্রশ্নটায় ফিরে যাওয়া যাক। ইস্ট পাকিস্তান ছেড়ে চলে যাচ্ছেন?
বিনু বলল, হ্যাঁ।
কেন যাচ্ছেন?
যে যুবকেরা ইন্টারপ্রেটারের কাজ করছে তাদের সামনে এই প্রশ্নের উত্তর দিতে ঠিক সাহস হচ্ছিল না। যদি বিনু বলে, এখানে নির্ভয়ে থাকা যাচ্ছে না, ওরা হয়তো ক্ষিপ্ত হয়ে উঠবে। দ্বিধান্বিতভাবে সে বলল, এই—ঠিক–
