অন্য টাউটরাও একই সুরে বলে যায়। তাদের ব্যবস্থাও অতি উত্তম। কারোর হোটেলে পাওয়া যাবে শিলং মাছ, বাঁচা মাছ, কারোর হোটেলে চিতলের পেটি, বড় গোলসা ট্যাংরা ও টাটকিনি মাছ। সেই সঙ্গে পাকা পায়খানার ব্যবস্থা তো আছেই।
কেউ কেউ বলছে, টিরেনে (ট্রেনে ওঠনের আগে প্যাট ভইরা খাইয়া লন। এইর পর কবে ভাত পাইবেন ঠিক নাই।
এই লোকগুলোর খদ্দের টানার কৌশল, কথা বলার চমৎকারিত্বে মুগ্ধ হয়ে যায় বিনু। ভূ-ভারতে এমন করে কেউ লোক ভজাতে পারে কিনা, তার জানা নেই। দুশ্চিন্তার চাপ থাকা সত্ত্বেও সে বেশ মজাই পায়।
যে মানুষগুলো ভিটেমাটি ফেলে প্রায় খালি হাতে দেশ ছাড়ছে তাদের বেশির ভাগেরই মাথাপিছু পাঁচ সিকে খরচ করে উৎকৃষ্ট আহার করার মতো শৌখিনতা নেই। যারা কিছু পয়সা নিয়ে আসতে পেরেছে তাদের কেউ কেউ অবশ্য টাউটদের সঙ্গে হোটেলে যাচ্ছে।
অধর ভুইমালী বা হরিরা টাউটদের ফিরিয়ে দিল। হাতে যদি কিছু সম্বল থাকেও, ভালমন্দ খেয়ে উড়িয়ে দেবে না, দুর্দিনের জন্য রেখে দেবে। রামরতনের শরীরের যা হাল তাতে তার মেয়েরা বা স্ত্রী খেতে যাবেন না। বাসন্তীর অবশ্য হোটেলে খাওয়ার প্রশ্নই নেই। সে ব্রাহ্মণের ঘরের বিধবা, নিশ্চয়ই নিরামিষ খায়।
পরিচিত মানুষগুলোকে ফেলে হোটেলে যাবার ইচ্ছে নেই বিনুর। তবু ঝিনুককে জিজ্ঞেস করল, ভাত খেয়ে নেবে?
রামরতন হরিন্দদের দেখিয়ে ঝিনুক বলল, ওরা খাবে না। আমাদের খেতে যাওয়া কি উচিত হবে?
বিনুও তা-ই ভেবেছে। বলল, তা হলে থাক। সঙ্গে যা চিড়ে মুড়ি আছে, একটা দিন ঠিক চলে যাবে। তারপর সবার যা হবে, আমাদেরও তাই হবে।
তাদের ঠিক বাঁ পাশে রয়েছে জন ছয়েকের একটি পরিবার। পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই একটা ঢ্যাঙা, রোগাটে চেহারার লোক পরিবারটির কর্তা। তার লম্বা মুখ, থ্যাবড়া থুতনি, চওড়া কপালের চামড়ায় জালি জালি কালচে দাগ, গর্তে বসা চোখ, চামড়া ঘেঁষে ছোট ছোট করে ছাঁটা চুল। পরনে ফতুয়া আর খাটো ধুতি। গলায় তুলসীর মালা, হাতে রুপোর তাবিজ।
লোকটা মাথা ঝুঁকিয়ে হাতজোড় করে বলল, পরণাম (প্রণাম)।
বিনুকে দেখলে বড় ঘরের শিক্ষিত যুবক মনে হয়। অক্ষরপরিচয়হীন চাষাভূষো ধরনের গেঁয়ো লোকেরা তাকে যথেষ্ট সম্মান দিয়ে কথা বলে।
বিনু বলল, নমস্কার।
লোকটা বলে, আমার নাম ভোবন দাস। কিছুক্ষণ আগে ইস্টিমার থিকা আপনাগো লাইমা আইতে দেখলাম। ভিটামাটি আছিল কোন গেরামে?
ভোবন অর্থাৎ ভুবন দাস। বিনু বলল, রাজদিয়া। আপনারা কোত্থেকে আসছেন?
তাহেরগঞ্জ। ভুবন দাস নদীর ওপারে, বহুদূর দিগন্তের দিকে আঙুল বাড়িয়ে দিয়ে বলে, লৌহজং পার হইয়া চাল্লিশ মাইল গেলে আমাগো গেরাম। গলা নামিয়ে জিজ্ঞেস করল, আপনেগো রাইজদার খবর কী? বড়সড় গণ্ডগোল হইছে নিকি?
বিনু জানায়, রাজদিয়াতে তেমন কিছু ঘটেনি, তবে সেখানকার আবহাওয়া খুবই উত্তপ্ত।
ভুবন দাস বলল, আমাগো উই দিকেও কিছু হয় নাই। জিগাইতে পারেন, তয় (তবে) দ্যাশ ছাইড়া যাইতে আছি ক্যান? তরাসে–তরাসে। গেরামের মেলা (বহু) মানুষ গ্যাছে গিয়া। কার ভরসায় থাকুম? একটু থেমে বলল, আইজ কিছু হয় নাই। কাইল যে হইব না, ক্যাঠা (কে) কইব?
বিনু অন্যমনস্কর মতো ভাবল, এত মানুষ যে পালিয়ে যাচ্ছে তার বড় কারণ সর্বগ্রাসী ভয়। তাদের সাহস আর আত্মবিশ্বাসের ভিত ধসে পড়েছে। বলল, গ্রাম থেকে কবে এখানে এসেছেন?
পরশু বিকালে।
এখনও ট্রেন ধরতে পারেননি?
ভুবন হাসল, পারলে কি বউ পোলাপান লইয়া খুলা জাগায় (জায়গায়) পইড়া থাকি? পরশু একখান টেরেন দিছিল। মাইনষের গুতাগুতিতে উঠতে পারি নাই। কাইল গাড়ি দ্যায় নাই। আইজ দিব কিনা, ভগমান জানে–
স্টিমারের মতো ট্রেনও তা হলে অনিশ্চিত। নিয়মিত কলকাতায় যাতায়াত করছে না। কিন্তু কী আর করা যাবে? অপেক্ষা করা ছাড়া গতি নেই।
ভুবন বলল, একখান কথা জিগাই—
কী?
ইণ্ডিয়ায় তো আগে কুনোকালে যাই নাই। শুনতে আছি সোনার দ্যাশ। এইপার থিকা যারা যাইতে আছে হেগো (তাদের) নিকি মেলা জমিন আর ট্যাকাপয়সা দিতে আছে?
বিনু এ সম্বন্ধে স্পষ্ট কিছুই জানে না। তবে এপারের মানুষজনের অনেকেরই ধারণা, উদ্বাস্তু হয়ে যারা সীমান্তের ওপারে যাচ্ছে তাদের প্রচুর সুযোগ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। সে বলল, কে বলল আপনাকে?
ভুবন বলল, শুনাশুন কানে আইছে।
আমার জানা নেই। আস্তে আস্তে মাথা নাড়ে বিনু।
আশায় ভুবনের চোখ চকচকে করে। সে বলে, অ্যাতখানি বয়স তরি চাষবাস ক্ষেতি উতি ছাড়া তো কিছু বুঝি নাই। জমিন পাইলে বাইচা যামু–
বিনু আর বসল না। ট্রেনের ব্যাপারে শত চেষ্টা করেও নিজেকে নিস্পৃহ রাখা যাচ্ছে না। খোঁজখবর নেওয়া দরকার। ঝিনুককে বলল, তুমি একটু বসো, আমি আসছি।
ঝিনুক জিজ্ঞেস করল, কোথায় যাচ্ছ? তার চোখেমুখে দুশ্চিন্তার ছাপ। আসলে এক মুহূর্ত বিনুকে সে কাছছাড়া করতে চায় না।
কোথায় যাচ্ছে, জানালো বিনু। তারপর দূরে যেখানে রেলের চার পাঁচজন কর্মচারী জটলা করছে, পায়ে পায়ে সেখানে চলে আসে। জিজ্ঞেস করে, আজ কি কলকাতার ট্রেন পাওয়া যাবে?
একজন বয়স্ক কর্মচারী, মুখভর্তি কাঁচাপাকা দাড়ি, বলল, পাওয়ার তো কথা। হেরপর (তারপর) বড় সাহেবগো মর্জি।
একটি কম বয়সের কর্মচারীর এই সব জিজ্ঞাসাবাদ পছন্দ হচ্ছিল না। তার চোখ কুঁচকে গিয়েছিল। বিরক্ত, কর্কশ গলায় বলল, যহন আইব, দেখতেই পাইবেন। ভ্যাজর ভ্যাজর না কইরা বইসা থাকেন গিয়া–
