বিন জিজ্ঞেস করল, এখন কেমন লাগছে স্যার?
রামরতন বললেন, কাইল রাইতের থিকা অনেক ভাল। তবে বুকের বেদনাটা পুরাপুরি যায় নাই।
আরও কিছুক্ষণ ঘুমোতে পারলে বাকি কষ্টটুকু থাকত না। কিন্তু তার উপায় নাই। আমাদের নামার সময় হয়েছে। তাই আপনাকে জাগাতে হল।
গোয়ালন্দ আইসা গেল নিকি?
হ্যাঁ। স্টিমার থেকে নেমে খোঁজ করে দেখব, যদি ডাক্তার পাওয়া যায়—
রামরতন বললেন, অখন আর দরকার নাই। একেবারে কইলকাতায় গিয়া চিকিৎসা করামু–
বিনু বলল, আপনি বিছানা থেকে নেমে বসুন। মালপত্র গোছাতে হবে–
হ হ, ঠিকই। আমার আর আমার স্ত্রীর বয়স হইছে। শরীরে শক্তি নাই। মাইয়ারাও এই সব পারব না। রামরতন বলতে লাগলেন, তোমার লগে দেখা না হইলে কী বিপদে যে পড়তাম!
কিন্তু উঠে দাঁড়াতে গিয়ে মাথা টলে গেল রামরতনের। মুখ থুবড়ে হুড়মুড় করে পড়েই যেতেন, বিনু আর বাসন্তী ধরাধরি করে বিছানা থেকে নামিয়ে ডেকের পাটাতনে তাকে বসিয়ে দিল। বোঝাই যাচ্ছে, কাল রাতের ধাক্কাটা সম্পূর্ণ কাটিয়ে উঠতে পারেননি বৃদ্ধ। সুস্থ, স্বাভাবিক হয়ে উঠতে তাঁর সময় লাগবে।
বিনু জিজ্ঞেস করল, শরীরটা আবার কি খুব খারাপ লাগছে?
মাথাটা এলিয়ে পড়েছিল রামরতনের। চোখের পাতা বুজে গেছে। ক্ষীণ স্বরে বললেন, খাড়ইতে গিয়া মাথা ঘুইরা গেল। চাইর দিক অন্ধকার।
কিছুক্ষণ শুয়ে নেবেন স্যার?
না না, অখন শুইলে স্টিমারঘাটায় নাইমা আইজ আর ট্রেন ধরতে পারুম না। তুমি গোছগাছ কইরা ফেলাও। বাসন্তী আমারে ধইরা থাকুক।
শুধু বাসন্তীই নয়, রামরতনের অন্য দুই মেয়েও তাঁকে তিন দিক থেকে ধরে থাকে। বুড়ো মানুষটি ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে গেলে নতুন বিপদ।
বিনু হরিন্দকে ডেকে দু’জনে ক্ষিপ্র হাতে বাঁধাছাঁদা শেষ করে ফেলে। ততক্ষণে স্টিমার গোয়ালন্দের জেটিঘাটে পৌঁছে গেছে।
তারপাশায় স্টিমারে ওঠার জন্য যেমন মরণপণ গুতোর্থতি ধাক্কাধাক্কি আর খিস্তিখেউড় চলেছিল, এখানেও গ্যাংওয়ে দিয়ে নামার জন্য সেই একই দৃশ্য। সবার ধারণা, আগে নামতে পারলে কলকাতার ট্রেনে আগে উঠতে পারবে।
অধর ভূঁইমালী আর হরিন্দর প্রচুর লটবহর, তাছাড়া বউ ছেলেমেয়ে। তবু বিনুর ডাকে তারা সাড়া দিল। নিজেদের মালপত্রের সঙ্গে রামরতনদের বাক্স বিছানা টিছানা কাঁধে এবং মাথায় তুলে বৃদ্ধকে ধরাধরি করে স্টিমার থেকে নামিয়ে আনল।
একটা ব্যাপারে বিনু কিছুটা হলেও দুশ্চিন্তামুক্ত। ঝিনুকের সেই আতঙ্কগ্রস্ত ভাবটা অনেকখানিই কেটে গেছে। গোয়ালন্দে পৌঁছবার পর তার হয়তো ধারণা হয়েছে, এবার নির্বিঘ্নে কলকাতায় চলে যেতে পারবে। তা ছাড়া, আন্দাজে ওষুধ দিলেও তার জ্বর ছেড়ে গিয়েছিল, নতুন করে সেটা আর আসেনি।
জেটিঘাটের বাইরে খানিকটা গেলে বিশাল ফাঁকা জায়গা। তার একধারে টিনের চালের সারি সারি হোটেল, নানা ধরনের দোকানপাট। একটু দূরে রেল লাইন। সেখানে কলকাতার ট্রেনের চিহ্নমাত্র নেই।
ফাঁকা জায়গাটায় আগে থেকে অগুনতি ভিটেমাটি খোয়ানো মানুষ বসে আছে। তারপাশার স্টিমারঘাটে যেমনটা দেখা গিয়েছিল, অবিকল সেই দৃশ্য। কলকাতার ট্রেনের জন্য তারা অপেক্ষা করছে।
বিনু শুনেছে, দিনে একটাই ট্রেন কলকাতায় যায়। এত লোক আগে থেকে জমা হয়েছে, তার ওপর তারা এসে সংখ্যাটা অনেক বাড়িয়ে দিল। আজ আদৌ ট্রেনে ওঠা যাবে কিনা, কে জানে।
একসময় বিনুরা থিকথিকে ভিড়ের ভেতরে একটু জায়গা করে বসে পড়ে। মাটির ওপরেই দ্রুত বিছানা পেতে রামরতনকে শুইয়ে দেওয়া হল। উর্দি-পরা রেলের কিছু কর্মচারী এবং কয়েকজন পুলিশ কনস্টেবলকে ঘোরাঘুরি করতে দেখা যাচ্ছে।
বিনুদের ডান পাশে রয়েছে রামরতনরা, তারপর হরিন্দ এবং অধর ভুঁইমালীর পরিবার।
স্টিমারে রামরতনের যে উপসর্গ দেখা দিয়েছিল সেটা এখনও কাটেনি। চোখ বুজে, নিজীবের মতো তিনি শুয়ে আছেন। এই অসুস্থ বুড়ো মানুষটাকে কিভাবে ট্রেনে তোলা সম্ভব হবে, কিভাবেই বা ধকল সয়ে তিনি কলকাতায় পৌঁছতে পারবেন, কে জানে।
অন্য যারা আগে থেকেই বসে ছিল তাদের চোখেমুখে দুশ্চিন্তার ছাপ। ট্রেন কখন আসবে, এই নিয়ে তারা নানা মন্তব্য করছিল। একসঙ্গে বহু লোক কথা বললে যা হয়, সারা এলাকা জুড়ে ভনভনে গুঞ্জন চলছে।
হেমন্তের বেলা অনেকটা চড়েছে। রোদের তেজও পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। তবে নদীর ওপর দিয়ে ঠাণ্ডা উত্তুরে হাওয়া ছুটে আসায় রোদের আঁচ তেমন গায়ে লাগে না। বেশ আরামদায়ক মনে হয়।
এর আগে হেমনাথের সঙ্গে দু’চার বার গোয়ালন্দে এসেছে বিনু। এখানকার হোটেলগুলো তেমনই রয়েছে। মালিকরা কেউ ইন্ডিয়ায় চলে যায়নি। হাজারে হাজারে মানুষ দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ায় তাদের ব্যবসা বরং ফুলে ফেঁপে উঠেছে।
পুরনো দিনের মতোই হোটেলের টাউটরা ভিড়ের ভেতর ঘোরাঘুরি করছে। খদ্দের টেনে নিয়ে যাবার কতরকম কসরত তাদের!
এক দালাল তাদের হোটেলের অজস্র মহিমা কীর্তন করে জানায়, পাবদা মাছ, রুইত মাছ, বোয়াল মাছ, খাসির মাংস–যা চাইবেন হেয়াই (তাই) পাইবেন। প্যাটচুক্তি পাঁচ সিকা। আমাগো পাকা পাইখানাও আছে। অর্থাৎ সুখাদ্যের অতিরিক্ত ইট সিমেন্ট বাঁধানো পায়খানার আরামও পাওয়া যাবে। পেটে যত ভাত-মাছ-তরকারি আঁটে তার জন্য মূল্য মাত্র পাঁচ সিকে বা এক টাকা চার আনা।
