রামরতনের স্ত্রী বললেন, যদি ডাক্তার পাওনা যাইত–
বিনুও ঠিক তা-ই ভাবছিল। কিন্তু যে ছিন্নমূল মানুষের দল সর্বস্ব খুইয়ে দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছে তাদের জন্য স্টিমারে ডাক্তার থাকবে, সেটা নেহাতই দুরাশা। তবু একটা বৃদ্ধ মানুষ চোখের সামনে এত ক্লেশ ভোগ করবেন, আর সে চুপচাপ বসে থাকবে, তা হতে পারে না।
বিনু উঠে পড়ল। বলল, দেখি কী করা যায়
সারেঙ লোকটাকে ভাল লেগেছিল বিনুর। তার সঙ্গে কিন্তু এবার দেখা করা গেল না। তিনি ইঞ্জিন ঘরে রয়েছেন। দু’জন খালাসিকে অবশ্য পাওয়া গেল। যা ভাবা গিয়েছিল তাই। খালাসিরা জানায়, স্টিমারে ডাক্তার নেই।
হতাশ বিনু ফিরে আসে। রামরতনের স্ত্রী এবং মেয়েরা উদ্বিগ্ন মুখে বসে ছিল। সে তাদের বলল, না, পাওয়া গেল না।
বিহ্বলের মতো রামরতনের স্ত্রী বললেন, অখন তা হইলে কী করা? ওষুধ বিষুধ না পড়লে– বলতে বলতে থেমে গেলেন।
বিনু উত্তর দিল না। রামরতনের যন্ত্রণার উৎস যে বুকে সেটা আগেই জানা গিয়েছিল, কিন্তু কারণটা অজানা। এই পরিস্থিতিতে কী করা উচিত, সে প্রথমটা ভেবে পাচ্ছিল না। তারপর মরিয়া হয়ে রামরতনের হাত সরিয়ে জামার ভেতর নিজের হাত ঢুকিয়ে বুকটা ডলতে থাকে। কার কাছে। সে যেন শুনেছিল, অতিরিক্ত মানসিক চাপে এবং উৎকণ্ঠায় নাকি এরকম বুকের ব্যথা হয়।
বেশ কিছুক্ষণ ডলার পর রামরতনের ছটফটানি কমে আসে। এখন তিনি অনেকটা শান্ত। কাতরানিও বন্ধ। চোখ বুজে গেছে। বোধ হয় ঘুমিয়ে পড়েছেন। মনে হচ্ছে, কষ্টের উপশম হয়েছে।
বুকে মালিশ করাটা ঠিক হয়েছে কিনা, সে সম্বন্ধে যথেষ্ট সংশয় আছে বিনুর। রামরতনের ক্ষতি হল কিনা, বোঝা যাচ্ছে না।
তারপাশায় ঝিনুকের জ্বর হয়েছিল। ডাক্তার পাওয়া যায়নি। তবে ওষুধের দোকানে গিয়ে বলতে যে ওষুধ দিয়েছিল তাতে কাজ হয়েছে। যাদের ওষুধের কারবার তাদের প্রচুর অভিজ্ঞতা। কোন রোগে কী ওষুধ খেতে হয়, মোটামুটি ওরা জানে। রামরতনের যন্ত্রণাটা যদি তারপাশায় হত, লক্ষণ জানিয়ে ওষুধ নিয়ে আসা যেত।
বিনু জিজ্ঞেস করে, এরকম কষ্ট কি স্যারের আগেও হয়েছে?
রামরতনের স্ত্রী বললেন, না।
আমি এখন যাই। আবার যদি যন্ত্রণা হয়, আমাকে ডাকবেন।
ডাকুম।
বিনু নিজের জায়গায় ফিরে এসে ফের শুয়ে পড়ে।
কুয়াশা আর অন্ধকার যেভাবে নদীর ওপর জমাট বেঁধে আছে, রাত ফুরোতে এখনও অনেক দেরি।
.
৩.১৩
বেশ কিছুক্ষণ ধরে অস্পষ্ট সোরগোল কানে আসছিল। ঘুমের ঘোরে মনে হচ্ছিল, বহু দূরের অলীক কোনও শব্দ। স্বপ্নে যেমন শোনা যায়। কিন্তু আওয়াজটা ক্রমশ বাড়ছে। বেড়েই চলেছে।
ঘুমটা হঠাৎ ছিঁড়ে খুঁড়ে গেল বিনুর। রাতের আঁধার আর নেই। আকাশ যেখানে নদীর সঙ্গে দিগন্তে একাকার হয়ে আছে, রক্তবর্ণ সূর্য সেখান থেকে উঠে আসছে। কুয়াশা কেটে যাচ্ছে দ্রুত। আলোয় ভরে যাচ্ছে চরাচর।
হাতের ভর দিয়ে উঠে বসল বিনু। যে হইচইটা ঘুমের ভেতর আবছাভাবে শুনেছিল, স্টিমারের তিনটে ডেক জুড়ে সেটা চলছে। যেদিকে তাকানো যায়, তুমুল ব্যস্ততা। সবাই তাদের পোঁটলা পুঁটলি ডালাকুলো বাক্সবিছানা গুছিয়ে নিচ্ছে।
স্টিমার গজরাতে গজরাতে জল কেটে চলেছে। ইঞ্জিনের ধকধকানিও শোনা যাচ্ছে।
হরিন্দর গলা কানে এল, ছুটোবাবু, বৌঠাইনরে জাগান। গোয়ালন্দ আইসা গেল। উই দ্যাখেন– পাড়ের দিকে আঙুল বাড়িয়ে দিল সে।
দূরে, নদীর কোনাকুনি স্টিমারঘাট দেখা যাচ্ছে। এত চাঞ্চল্য এবং শোরগোলের কারণ এতক্ষণে বোঝা গেল। স্টিমার থেকে নেমেই ট্রেন ধরতে হবে। তারই প্রস্তুতি চলছে।
ঝিনুকের ঘুম ভাঙেনি। বিনু তাকে জাগিয়ে দিয়ে তাড়াতাড়ি কল-ঘরে নিয়ে গেল। তাদের লটবহর নেই বললেই হয়। দু’টো মোটে চাদর। দুজনে মুখটুখ ধুয়ে ফিরে এসে চাদর ভাঁজ করে নিল। হরিরা শোবার জন্য সেই সুজনিটা দিয়েছিল। সেটা ফেরত দিতে গিয়ে রামরতনদের দিকে বিনুর চোখ চলে যায়। অসুস্থ মাস্টারমশাইয়ের খোঁজ নেওয়া দরকার। তা ছাড়া, ওঁদের মালপত্র গোছগাছ। করে দিতে হবে। অশক্ত, অপটু বৃদ্ধের পক্ষে সব কিছু সামলে নামানো সম্ভব নয়। তার স্ত্রীকে বিনু যেটুকু দেখেছে, মনে হয়েছে বৃদ্ধার স্বাস্থ্য খুব নড়বড়ে। বাকি রইল তিন মেয়ে। লটবহর টানাহ্যাঁচড়া করে ভিড় ঠেলে স্টিমারঘাটে নামানো, তারপর ধাক্কাধাক্কি করে ট্রেনে ওঠা–এ সব কি মেয়েদের কাজ? যা করার বিকেই করতে হবে। এই অসহায় পরিবারটার ওপর কেমন এক দায়িত্ববোধ এসে গেছে তার। তা ছাড়া, কাল রাতে বুক মালিশ করে দেবার পর রামরতন কেমন আছেন সে সম্বন্ধে যথেষ্ট উৎকণ্ঠাও রয়েছে।
বিনু রামরতনদের কাছে চলে আসে। সকাল হলেও রামরতন এখনও শুয়ে আছেন। চোখ বোজা, খুব সম্ভব ঘুমোচ্ছেন। তার স্ত্রী এবং মেয়েরা বৃদ্ধকে ঘিরে বসে আছে। মুখচোখ দেখে মনে হচ্ছে, সারা রাত ওরা ঘুমোয়নি।
বিনু বলে, কাল রাতে আপনাদের এখান থেকে যাবার পর ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। তাই খবর নিতে পারিনি। স্যারের বুকের কষ্টটা আর হয়নি তো?
রামরতনের বিধবা মেয়ে অর্থাৎ বাসন্তী বলল, না।
দুর্ভাবনা কাটে বিনুর। জিজ্ঞেস করে, সেই থেকেই ঘুমোচ্ছন?
হ।
এবার ওঁকে জাগাতে হবে। গোয়ালন্দ এসে গেছে।
বাসন্তী বেশ কয়েক বার ডাকার পর চোখ মেলে তাকালেন রামরতন। আস্তে আস্তে উঠে বসে শিয়রের কাছে রাখা নিকেল ফ্রেমের চশমাটা পরে নিলেন।
