নানা দিক থেকে শোরগোল ভেসে আসছিল।
কী হইল? কী হইল?
ইস্টিমার কিনারে যায় ক্যান? সিধা মইদ্য গাঙ দিয়া যাওনের কথা–
কে একজন বলে ওঠে, শুনছি আইজকাইল গোয়ালন্দের দিকে অনেক কালের পুরানা ঝইরা ইস্টিমার দিতে আছে। কিছুদূর গিয়া হেইগুলান থাইমা যায়, সারাইয়া সুরাইয়া আবার কিছু সোময় চলে। এইভাবে গোয়ালন্দে পৌছায়–
আরেক জন বলল, দ্যাশ ছাইড়া যারা যাইতে আছে তাগো উপুর মায়া দয়া নাই।
ইস্টিমার কিনারে নিয়া যাইতে আছে ক্যান, বুঝি না—
রামরতন আর বিনু সবার কথা শুনতে পাচ্ছিল। চিন্তাগ্রস্তের মতো রামরতন বললেন, আমাগো যা অদৃষ্ট, সহজে কিছু হওনের উপায় নাই। কী হইছে, খবর নিয়া আসতে পার?
সবাই জেগে গেলেও ঝিনুকের ঘুম ভাঙেনি। রামরতনকে তার পাশে বসে থাকতে বলে বিনু উঠে পড়ল।
যাত্রীদের জিজ্ঞেস করে সদুত্তর পাওয়া যাবে না। তারা জানেই বা কী? খুঁজে খুঁজে একতলায় গিয়ে সারেঙকে ধরল বিনু। লোকটা ভদ্র। মোটামুটি স্বীকার করে নিল, স্টিমারটা মান্ধাতার আমলের। ইঞ্জিনে গোলযোগ দেখা দিয়েছে। তবে দুশ্চিন্তার কারণ নেই। মেরামত করে দু’চার ঘন্টার ভেতর ছেড়ে দেওয়া হবে। তীরের কাছে নিয়ে যাবার কারণ এইভাবে ব্যাখ্যা করলেন। কলকজার ব্যাপার ততা, সারাই করতে যদি দেরি হয়ে যায় অসুবিধা দেখা দেবে। স্টিমারে রসদ ফুরিয়ে এসেছে; পাড়ের কাছে থাকলে গ্রাম থেকে যোগাড় করে আনা যাবে।
বিনু ফিরে এসে রামরতনকে সব জানিয়ে দেয়।
রামরতন উদ্বিগ্ন মুখে বললেন, দ্যাশ ছাইড়া যারা যাইতে আছে, শুনছি নদীতে তাগো উপর হামলা হয়।
বিনু নিজেই যে ভুক্তভোগী, সেটা আর জানালো না।
রামরতন আবার বললেন, স্টিমারে তেমন কিছু হইছে বইলা শুনি নাই। নদীর কিনারের কাছে অনেকক্ষণ খাড়ইয়া থাকলে কী হইব জানি না।
অর্থাৎ পাড়ের কাছাকাছি স্টিমার কয়েক ঘন্টা দাঁড়িয়ে থাকলে, হানাদারদের চড়াও হবার সম্ভাবনা আছে। এমনই আশঙ্কা রামরতনের। দেশের যা অবস্থা তাতে বৃদ্ধের মনোবল বিশেষ কিছু অবশিষ্ট নেই। সবসময় তিনি উতলা হয়ে থাকেন।
বিনু বলল, আমরা এত লোক রয়েছি। মনে হয়, তেমন কিছু হবে না।
রামরতন বললেন, না হইলেই মঙ্গল।
স্টিমার নদীর পাড় থেকে তিনশ’ সাড়ে তিনশ’ হাত দূরে থেমে গেল। দু’ধারের চাকা এখন ঘুরছে না। ইঞ্জিনের ঘড়ঘড়ানি বন্ধ হয়ে গেছে।
রামরতন এবার বললেন, আর বইসা থাকতে পারতে আছি না। যাই, কিছুক্ষণ শুইয়া থাকি গিয়া–
বিনু রামরতনের হাত ধরে তাঁর স্ত্রী এবং মেয়েদের কাছে পৌঁছে দিয়ে এল।
.
৩.১২
সন্ধের পর খালাসিরা তিনটে ডেকে টিমটিমে আলো জ্বেলে দিয়েছিল। তারপর শুরু হয়েছিল ইঞ্জিন মেরামতির কাজ। ঠুকঠাক, খটখট, ঘটাং ঘটাংকত রকমের যে আওয়াজ।
তারই মধ্যে একসময় চিড়ে গুড় খেয়ে শুয়ে পড়েছিল বিনু আর ঝিনুক। সারা শরীর জুড়ে ক্লান্তি ছড়িয়ে ছিল। শোবার সঙ্গে সঙ্গে ঘুমিয়ে পড়েছে বিনু। তারা যখন শোয়, স্টিমারের যাত্রীদের অনেকেই জেগে বসে ছিল।
কার ডাকাডাকিতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল। চোখ মেলে বিনু দেখতে পায়, সাদা থান পরা কেউ একজন কাছে দাঁড়িয়ে আছে। ঘুমের ঘোর পুরোপুরি কাটেনি। ডেকের নিস্তেজ আলোয় প্রথমটা চিনতে পারল না সে। জিজ্ঞেস করল, কে?
মেয়েটি বলল, আমি বাসন্তী। বাবার শরীর খারাপ হইছে। মা আপনেরে ডাইকা নিয়া যাইতে কইল। তার গলায় গভীর উৎকণ্ঠা।
এবার চেনা গেল। রামরতনের সেই মাঝবয়সী বিধবা মেয়ে। হাতের ভর দিয়ে দ্রুত উঠে পড়ে বিনু।
ঝিনুক চাদর মুড়ি দিয়ে ঘুমোচ্ছে। তিনটে ডেকের একজন যাত্রীও জেগে আছে বলে মনে হল।
স্টিমার জল তোলপাড় করে এখন ছুটে চলেছে। বিনু যখন ঘুমোচ্ছিল সেই সময় ইঞ্জিন সারাই হয়ে কখন সেটা চলতে শুরু করেছে, টের পাওয়া যায়নি। নদী, আকাশ, দুই তীর, কিছুই দেখা যাচ্ছে না। গাঢ় কুয়াশায় এবং অন্ধকারে সব ঢেকে আছে। এখন কত রাত, কে জানে।
বিনু গিয়ে দেখল, বুক দু’হাতে খামচে ধরে ছটফট করছেন রামরতন। তার গলা থেকে ক্ষীণ, কাতর শব্দ বেরিয়ে আসছে। তাকে ঘিরে বসে আছে তার স্ত্রী এবং দুই অবিবাহিত তরুণী মেয়ে। কেউ মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে, কেউ হাত-পা টিপছে। সবাই ভীষণ দিশেহারা। কিভাবে শুশ্রূষা করলে রামরতনের কষ্ট লাঘব হবে, তারা ভেবে পাচ্ছিল না।
বিনু জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে ওঁর?
রামরতনের স্ত্রী বললেন, বুঝতে পারতে আছি না। ঘুমাইয়া আছিল। খানিকক্ষণ আগে আতখা (হঠাৎ) চিৎকার কইরা আমাগো ডাইকা তুলল। কইল ভীষণ বেদনা। কয় আর ছটফট করে। আমরা ডরাইয়া গেলাম। এত রাইতে কী করুম, দিশা করতে না পাইরা বড় মাইয়ারে তোমার কাছে পাঠাইছি।
ভাল করেছেন। কিন্তু বিকেলেও তো উনি সুস্থ ছিলেন। আমার সঙ্গে অনেকক্ষণ কথা বললেন।
হ। তোমার লগে কথা কইয়া আইসা সন্ধ্যা তরি (পর্যন্ত) শুইয়া আছিল। হেরপর উইঠা খাইল। খাইয়া আবার শুইল। তহনও তো ভালই আছিল–
রামরতনের পাশে বসে পড়ল বিনু। ডাকতে লাগল স্যার, স্যার—
প্রথমটা সাড়া পাওয়া গেল না। বেশ কয়েক বার ডাকার পর চোখ আধাআধি মেললেন রামরতন।
বিনু অনেকখানি ঝুঁকে জিজ্ঞেস করল, কী কষ্ট হচ্ছে?
রামরতন নিজের বুক থেকে হাত সরাননি। আগের চেয়েও জোরে খামচে ধরেছেন। তার নখ জামার ওপর দিয়ে চামড়ার মাংসে গেঁথে যাচ্ছে। গোঙানির মতো শব্দ করে কোনও রকমে বোঝালেন, ভীষণ যন্ত্রণা হচ্ছে।
