স্টিমারের একঘেয়ে গজরানি শুনতে শুনতে কানে তালা লেগে যাচ্ছে। মাথা ঝিম ঝিম। নদীতে সেই একই দৃশ্য। একমাল্লাই, দু’মাল্লাই, চারমাল্লাই, বাদামহীন বা পাল-খাটানো নৌকোর মেলা। যতক্ষণ না তারা গোয়ালন্দ পৌঁছচ্ছে, এর হেরফের হবে না।
ওধার থেকে স্টিমারের দোলানিতে টলতে টলতে রামরতন উঠে এসে বিনুর পাশে বসে পড়লেন। বললেন, শুইয়া আছিলাম, কিন্তু ঘুম আসে নাই। মাথায় বড় দুশ্চিন্তা। তাই চইলা আসলাম।
ঝিনুক অসাড়ে ঘুমোচ্ছে। চেনাজানা মানুষজনের মধ্যে হরিন্দরাও শুয়ে আছে। অধর ভূঁইমালী অবশ্য নিজে থেকে এসে আলাপ পরিচয় করে গেছে। তাও বেশ খানিকক্ষণ হল। চুপচাপ, একটানা নদী আকাশ নৌকা দেখতে দেখতে ক্লান্তি বোধ করছিল বিনু। রামরতনকে দেখে বলল, ভাল করেছেন এসে–
রামরতন বললেন, তোমার সম্বন্ধে বিশেষ কিছুই জানি না। কোনখানে বাড়ি আছিল?
খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বিনুর ব্যাপারে সব জেনে নিলেন রামরতন। এমনকি কলকাতায় গিয়ে সে কোথায় উঠবে, তা-ও। তবে ঝিনুক সম্পর্কে কোনও প্রশ্ন করলেন না। অন্য সবার মতো তিনিও ধরে নিয়েছেন, ঝিনুক তার স্ত্রী।
রামরতন বললেন, কইলকাতায় তোমার বাবা আছেন, বইনেরা আছে। তোমার চিন্তা নাই। বিনু বলল, আপনারও তো ভাইপো আছে।
তা আছে। বিমল পোলা হিসাবে চমৎকার। আমারে শ্রদ্ধা করে, ভালবাসে। ওর মা-বাপ মারা গেছিল অল্প বয়েসে। আমিই ওরে মানুষ করছি। সগলই ঠিক। কিন্তুক কইলকাতায় ভাড়া বাড়িতে থাকে। নিজের সংসার, বউ, পোলা-মাইয়া আছে। তার উপুর আমরা এতজন গিয়া যদি তার কান্ধে চাপি, কী কইরা যে চালাইব! চিন্তাকুল মুখে রামরতন বলতে লাগলেন, দ্যাশ থিকা শ’ চাইরেক টাকা, কিছু জামাকাপড়, বাসনকোসন ছাড়া আর কিছুই লগে আনতে পারি নাই। যথাসর্বস্ব ফেলাইয়া যাইতে আছি। কী যে করুম, ভাইবা কুল পাই না।
কী উত্তর দেবে, ঠিক করে উঠতে পারে না বিনু। এই যে স্টিমার বোঝাই মানুষ সীমান্তের ওপারে চলেছে, কিংবা আরও হাজার হাজার দেশ ছাড়ার জন্য পা বাড়িয়ে আছে, তাদের সবারই তো অবিকল এক সমস্যা।
রামরতন একই সুরে বলতে থাকেন, আমার আর আমার স্ত্রীর তিন কাল গেছে। কিন্তুক তিন মাইয়া তো এখনও অনেক দিন বাচব। একটা বিধবা, দুইটার বিয়া দিতে পারি নাই। কী যে ওগো (ওদের) ভবিষ্যৎ, জানি না। ওগো চিন্তায় মইরাও আমি শান্তি পামু না।
খোলা নদীতে হেমন্তের অফুরান আলো, অপর্যাপ্ত বাতাস, তবু আবহাওয়া কেমন যেন ভারী আর স্নান মনে হয় বিনুর। অস্পষ্টভাবে সে কিছু একটা উত্তর দেয়, নিজের কাছেই তা পরিষ্কার নয়।
রামরতন বলেন, গত আষাঢ় মাসে তিয়াত্তর বৎসরে পড়ছি। শরীরে শক্তি নাই, উৎসাহ নাই। তবে এম. এ’র ডিগ্রিখান আছে। শুনছি, ইস্ট পাকিস্তান থিকা উৎখাত হইয়া যারা ওই পারে যাইতে আছে, ইন্ডিয়া গভর্নমেন্ট গো চাকরি বাকরির ব্যবস্থা কইরা দিতে আছে। আমি কি একটা কিছু কাজকর্ম পামু না?
বিনুর মনে হল, তাকে সামনে বসিয়ে রামরতন যেন নিজের সঙ্গেই কথা বলছেন, নিজেকেই। প্রশ্ন করছেন। তাকে ভরসা দেবার জন্য সে বলে, নিশ্চয়ই পাবেন। পণ্ডিত মানুষ আপনি, এত বছরের পড়ানোর অভিজ্ঞতা। আপনার মতো একজনকে পাওয়া তো যে কোনও স্কুলের পক্ষে ভাগ্যের কথা।
কিন্তু আমার এই বয়সে কি স্কুলে নিব?
নেওয়া তো উচিত।
সংশয়ের সুরে রামরতন বলেন, কী জানি! ভবিষ্যতের চিন্তায় তিনি ব্যাকুল হয়ে পড়েন।
একটু চুপচাপ।
তারপর রামরতন হঠাৎ গলার স্বর উঁচুতে তুলে আবার বলে ওঠেন, যুবক বয়সে একটা মহা ভুল কইরা ফেলাইছিলাম। অখন সেই কথা ভাইবা অনুশোচনার শ্যাষ নাই–
ঠিক কী বলতে চান রামরতন, ধরতে না পেরে তার দিকে তাকিয়ে থাকে বিনু।
রামরতন থামেননি, এম. এ পাস করার পর সিদ্ধান্ত নিছিলাম, নেশান বিল্ডিংয়ের কামে লাগুম। গ্রামে গিয়া জ্ঞানের আলো বিতরণ করুম। আইডিয়ালিয়াজিমের দানব কান্ধে চাপছিল। স্বপ্ন দেখতাম, আমার হাত দিয়া হাজার হাজার ছাত্র বাইর হইব। তারা দ্যাশরে নানান দিক দিয়া আগাইয়া নিয়া যাইব। কত বড় বড় চাকরির অফার আইছিল কইলকাতা থিকা। তখন যদি চইলা যাইতাম, শ্যাষ জীবনে এই দুর্গতি হইত না।
তাঁর আক্ষেপের কারণ এবার স্পষ্ট হয়ে যায়। আস্তে মাথা নাড়ে বিনু।
রামরতন অদ্ভুত এক ঝোঁকে একটানা বলে যান, কী নেশান বিল্ড করছি একবার ভাবো। জমিজমা ভিটামাটি ছাইড়া মাথার উপুর দুই আনম্যারেড যুবতী মাইয়া আর এক বিধবা মাইয়া লইয়া চইলা যাইতে আছি। শিক্ষাব্রতী হইয়া কী লাভটা হইল? স্বার্থপর হওয়া উচিত ছিল আমার, সেলফ-সেন্টারড হওয়া উচিত ছিল, নিজের বুঝ বুইঝা নেওয়া উচিত ছিল। বৃদ্ধ বয়েসে পথের ভিখারি হইয়া গেলাম।
রামরতনের কথা শেষ হতে না হতেই আচমকা স্টিমারের ইঞ্জিন থেকে বিকট ঘড় ঘড় আওয়াজ আসতে লাগল। দু’পাশের চাকাগুলো এখন আর আগের মতো জোরে জোরে ঘুরছে না। বিশাল জলযানের গতি কমে আসছে। সেটা মাঝনদী থেকে ক্রমশ ডান ধারে পাড়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
দোতলার ডেক জুড়ে যারা ঢুলছিল বা ঘুমিয়ে ছিল, তারা ধড়মড় করে উঠে বসে। বিনুরা যেখানে বসে আছে সেখান থেকে একতলা এবং তেতলার ডেকের অনেকটা অংশ চোখে পড়ে। ওই দুই ডেকের যাত্রীদের একই অবস্থা। সবাইকে বেশ উদ্বিগ্ন দেখাচ্ছে।
