বিনুর সঙ্গে আলাপ করার খুব ইচ্ছা লোকটার। কিন্তু তার কাছে আসবে কি আসবে না, ঠিক করতে পারছিল না। শেষ পর্যন্ত দ্বিধা কাটিয়ে পা টেনে টেনে উঠে এল। হাতজোড় করে বিনীতভাবে বল, পন্নাম হই বাবুমশয়।
চমকে নদীর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে বিনু বলল, নমস্কার—
আমার নাম অধর ভুইমালী। লোকটা বলতে লাগল, আপনার কাছে ইট্র বসুম?
হ্যাঁ হ্যাঁ, বসুন না–
অধর একটু দূরে বাঁ পা’টা ছড়িয়ে বেশ কষ্ট করে বসল। চাপা গলায় বলল, আপনের লগে দুই একখান কথা আছে।
একটা অচেনা লোক আচমকা উঠে এসে কী বলতে চায় তাকে? বেশ অবাকই হল বিনু।
অধর ভুঁইমালী বলল, আমাগো চৈদ্দ পুরুষের ভিটা আছিল তালসোনাপুরে। নাম শুনছেন নি জাগাখানের (জায়গাটার)?
বিনু বলে, নামটা তার জানা। তবে সেখানে কখনও তার যাওয়া হয়নি।
অধর গলা আরও নামিয়ে এবার বলল, আমাগো উইদিকে জবর খুনাখুনি হইছে। দ্যাশে আর থাকন গ্যাল না। বাড়িঘর ছাইড়া কইলকাতায় যাইতে আছি।
এসব নতুন কিছু নয়। এই স্টিমারে যারা যাচ্ছে, কিংবা পূর্ব পাকিস্তান জুড়ে আরও অসংখ্য মানুষ যারা যাবার জন্য পা বাড়িয়ে আছে, তাদের সবারই দেশ ছাড়ার ওই একটাই কারণ।
এদিকে কোনও কার্যকারণ সম্পর্ক নেই, রাজদিয়ায় অধর সাহার কথা মনে পড়ে গেল বিনুর। যে কিনা বেঁচে থাকতেই নিজের দানসাগর শ্রাদ্ধের ব্যবস্থা করে রেখেছে। হয়তো দু’জনের নামের মিলের জন্যই এই মনে পড়া। অধর সাহা অবশ্য দেশেই আছে। ইন্ডিয়ায় যাবার কথা ভাবে নি।
অধর তার বাঁ পায়ের প্রকান্ড ব্যান্ডেজ দেখিয়ে বলল, এই দ্যাখেন, সড়কি ফেইকা (ছুঁড়ে) পাও এ-ফোড় ও-ফোড় কইরা ফেলাইছিল। এইর পর ঘেটি থেইকা মাথা লামাইয়া দিত। ভিটায় পইড়া থাকতে আর ভরসা হইল না।
বোঝা যাচ্ছে, লোকটার বক্তব্য অন্য। সেটা শুরু করার আগে ভণিতা করে নিচ্ছে। বিনু চুপ করে থাকে।
অধর আর অযথা প্যাচাল না পেড়ে আসল কথায় চলে এল। রামরতনকে দেখিয়ে বলল, আপনের সুমখে তারপাশার হেই মিঞাসাব ওনারে কইতে আছিল, অবোস্তা ইট্টু শান্ত হইলে দ্যাশের ভিটামাটি ব্যাচন (বিক্রি করা) যাইব।
বিনু বুঝতে পারে, নাসের আলির কথা বলছে অধর। হ্যাঁ, তার সামনেই নাসের সাহেব রামরতনকে এরকম ভরসা দিয়েছিলেন।
বিনু উত্তর দেবার আগেই অধর ফের বলে ওঠে, আপনেরে মনে লয়, পণ্ডিত মানুষ। আবার রামরতনকে দেখিয়ে বলল, মিঞাসাব পথে উনাগো দেখাশুনার ভার আপনেরে দিয়া গ্যাছে। আপনে যে সে মানুষ না।
দেখা যাচ্ছে, বিনুর ওপর আগাগোড়া লক্ষ্য রেখে গেছে অধর। হয়তো স্টিমারঘাটে বসে থাকার সময় থেকেই। যেহেতু নাসের আলির মতো একজন বয়স্ক, শিক্ষিত ভদ্রলোক তাকে রামরতনদের দায়িত্ব দিয়ে গেছেন, অধরের চোখে তার গুরুত্ব অনেক বেড়ে গেছে।
আগের কথার খেই ধরে অধর বলল, আপনের কী মনে লয়, পাকিস্থানে আর কি সুদিন ফিরা আসব? কাটাকাটি খুনাখুনি কি থামব?
বিনুও জানে না, এখানে যেভাবে ভয় আতঙ্ক আর মত্ততা ছড়িয়ে আছে, সেসব কাটিয়ে আদৌ সুস্থিতি ফিরে আসবে কিনা। এখন যা পরিস্থিতি, কবে যে সব কিছু স্বাভাবিক হবে, মানুষের মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস আর ঘৃণা ঘুচে যাবে, সে সম্বন্ধে পরিষ্কার কোনও ধারণা নেই তার। হয়তো অধর ভুঁইমালীর মনে উৎসাহ জাগাবার জন্য বিনু বলল, এমন অবস্থা তো চিরকাল চলতে পারে না। বলেছে ঠিকই, নিজের কানেই কথাগুলো বেখাপ্পা শোনাল তার।
অধরের ভাঙাচোরা মুখ আলো হয়ে ওঠে। কেউ তার আশাকে জিইয়ে রাখুক, এটাই খুব সম্ভব সে চায়। বলল, ঠিকই কইছেন বাবুমশয়। ইন্ডিয়ায় গিয়াও বডারের এই পারে তাকাইয়া থাকুম। যদ্দিন শ্বাস তদ্দিন আশ। একটু থেমে বলল, বাপ ঠাউরদার জমিজেরাত হগলই তো দ্যাশে পইড়া রইল।
বিনু জিজ্ঞেস করল, দিনকাল ভাল হলে জমি বাড়ি বেচতে আসবেন; রেজিস্ট্রির সময় দলিলপত্র কিন্তু লাগবে।
অধর বলল, হেয়া (তা) জানি।
রামরতনের দিকে আঙুল বাড়িয়ে বিনু বলল, উনি ওঁদের দলিল টলিল নাসের সাহেবের কাছে রেখে যাচ্ছেন। আপনি নিশ্চয়ই বিশ্বাসী কারোর হাতে দিয়ে এসেছেন?
অধর অস্বস্তি বোধ করতে লাগল। এধারে ওধারে তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে আরও কাছে ঘন হয়ে বসল। বলল, দলিলগুলার পাকা ব্যবস্তা করছি। হারাইব না, নষ্টও হইব না।
অধর ভুঁইমালী লেখাপড়া জানে বলে মনে হয় না। নিরক্ষরই হবে। তবে বেশ চালাক চতুর। তার বিষয়বুদ্ধিও প্রখর। বিনু আর কোনও প্রশ্ন করল না।
অধর বলল, বাবুমশয়, গোয়ালন্দে গিয়া একলগে রেলগাড়িতে চাইপা (চেপে) কইলকাতায় যামু কিলাম–
রামরতন, হরিন্দদের মতো এই লোকটাও কলকাতা পর্যন্ত গায়ের সঙ্গে জুড়ে থাকবে। কিন্তু কী আর করা যাবে। বিনু বলল, ঠিক আছে, যাবেন।
এই পেরথম কইলকাতায় যাইতে আছি। শুনছি জবর শহর, কুনখানে আগা কুনখানে শ্যাষ, দিশা পাওন যায় না। আপনের লাখান (মতো) একজন বিদ্বান মানুষ লগে থাকলে ভরসা পাওন যায়। আইচ্ছা, অহন উঠি। পরে আবার আসুম।
অধর ভুঁইমালী চলে গেল।
বেলা হেলে গেছে। সূর্যটা গড়াতে গড়াতে পশ্চিম দিকে অনেকখানি নেমে গিয়ে থমকে আছে। রোদে এখন গলানো গিনির রং। উত্তর দিকে আকাশের গায়ে হেলান দিয়ে রয়েছে কয়েক টুকরো মেঘ। হেমন্তের মেঘ বর্ষায় না, নীলাকাশের শোভা খানিক বাড়িয়ে দেয়।
