বিনু বলল, তুমি করেই তো বলবেন। চলুন—
জোরে ছোটার জন্য স্টিমার বেশ দুলছিল। টাল সামলে রামরতনের পক্ষে ডেকের ওপর দিয়ে হেঁটে যেতে অসুবিধা হচ্ছিল। বৃদ্ধ মানুষটির হাত ধরে নিজেদের জায়গায় ফিরে এল বিনু। রামরতনকে তার স্ত্রী এবং মেয়েদের কাছে বসিয়ে ঝিনুকের কাছে চলে এল।
ঝিনুক বসে ছিল। তাকে অনেকটা সুস্থ মনে হচ্ছে। কপালে হাত দিয়ে বিনু বুঝতে পারল, জ্বর নেই। ওষুধে কাজ হয়েছে। জিজ্ঞেস করল, এখন ভাল লাগছে?
হ্যাঁ– আস্তে মাথা হেলিয়ে দিল ঝিনুক।
যাক, একটা ব্যাপারে দুশ্চিন্তা কাটল বিনুর। এমনিতেই মানসিক দিক থেকে বিপর্যস্ত ঝিনুক সারাক্ষণ ভয়ে ভয়ে থাকে। তার ওপর জ্বরটা বাড়লে কলকাতা পর্যন্ত তাকে টেনে নিয়ে যেতে কী সমস্যা যে হত, ভাবা যায় না।
ঝিনুক বলল, স্টিমারে জল পাওয়া যাবে? মুখটুখ ধোয়া হয়নি—
সকালে স্টিমার আসতে দেখে এমন হইচই আর ধাক্কাধাক্কি শুরু হয়ে গিয়েছিল যে অন্য কোনও দিকে লক্ষ্য ছিল না। বিনু নিজেও চোখেমুখে জল দিয়ে আসতে পারেনি।
দোতলার ডেকে ওঠার পর খানিক দূরে যে জায়গাটা থেকে স্টিমারের মোটা চোঙা ওপরে উঠে গেছে তার গা ঘেঁষে পর পর তিনটে স্নানের ঘর। বিনু ঝিনুককে নিয়ে সেখানে গেল।
গামছা বা তোয়ালে কি দাঁতের মাজন কিছুই সঙ্গে নেই। তারপাশার স্টিমারঘাটে বাজার থেকে কাল যখন একজোড়া চাদর কিনেছিল বিনু, তখন খেয়াল করে গামছা টামছাও কেনা উচিত ছিল। এখন কী আর করা। গোয়ালন্দেও বাজার আছে। সেখান থেকে দরকারী জিনিসগুলো কিনে নেবে।
আঙুলে দাঁত ঘষে মুখ ধুয়ে ঝিনুক তার শাড়ির আঁচলে আর বিনু তার কেঁচার খুঁটে জল মুছতে মুছতে ফিরে এল। ঝিনুক বলল, আমার খিদে পেয়েছে।
পরশু হেমনাথের বাড়ির পুকুরঘাটে রাজেকের নৌকোয় ওঠার পর এই প্রথম নিজের থেকে খেতে চাইল ঝিনুক। তাকে অনেকটা স্বাভাবিক দেখাচ্ছে। বিনুর খুব ভাল লাগল।
নাসের আলির পরামর্শে ভাগ্যিস কিছু চিড়ে মুড়ি কিনেছিল। দোকানদার কাগজের ঠোঙায় ভরে পাটের সুতো দিয়ে ভাল করে বেঁধে দিয়েছে। বাঁধন খুলে মুড়ি আর মুছি গুড় বার করে ঝিনুককে দিল বিনু, নিজেও খানিকটা নিল।
খেতে খেতে ঝিনুক বলল, আর ভয় নেই, কী বল? মনে হচ্ছে, এবার শান্তিতে আমরা কলকাতায় যেতে পারব।
মেয়েটা ত্ৰাস কাটিয়ে উঠছে, সাহস ফিরে পাচ্ছে। বিনুও আশা করছে, এবার হয়তো নির্বিঘ্নে সীমান্তের ওপারে যাওয়া যাবে।
৩.১১-১৫ সূর্য এখন সোজাসুজি
৩.১১
সূর্য এখন সোজাসুজি মাথার ওপর উঠে এসেছে। হেমন্তের রোদ নদীর ঢেউয়ে ঢেউয়ে ঝলকে যাচ্ছে।
মাঝনদী দিয়ে একঘেয়ে আওয়াজ করতে করতে ছুটে চলেছে স্টিমার। দু’পাড় ধুধু। গাছপালা, গ্রাম, কিছুই স্পষ্ট নয়। মনে হয়, এপাড়ে ওপাড়ে দিগন্ত ঘেঁষে কেউ ধূসর রঙের মোটা লাইন টেনে রেখেছে। নদী জুড়ে অসংখ্য নৌকো। কোনওটায় বাদাম খাটানো, কোনওটায় পাল নেই, মাঝিরাই বৈঠা টেনে চলেছে। যে নৌকোগুলো স্টিমারের কাছাকাছি, উত্তাল ঢেউয়ে সেগুলো মোচার খোলার মতো ওঠানামা করছে।
তখন খাওয়ার পর ঝিনুককে ওষুধ খাইয়ে দিয়েছিল বিনু। কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে অলস দৃষ্টিতে চারপাশের দৃশ্য দেখল ঝিনুক। তারপর বলল, আমি একটু ঘুমবো। বলেই শুয়ে পড়ল।
যখন তখন ঘুমোতে পারে না বিনু। বিশেষ করে দিবানিদ্রার অভ্যাস নেই তার।
অনেকক্ষণ নদীর দিকে তাকিয়ে থাকার পর দৃষ্টিটাকে ডেকে ফিরিয়ে আনল বিনু। থোকায় থোকায় চার পাঁচ ছয় সাতজনের এক একটা পরিবার গা ঘেঁষাঘেঁষি করে রয়েছে। সকলের সঙ্গেই কম বেশি লটবহর। বোঁচকা বুচকি, টিনের বাক্স, এসব তো আছেই। কেউ কেউ ফলন্ত লাউগাছ, নারকেল পাতার শলা দিয়ে তৈরি ঝটা, ছোবড়াসুদ্ধ নারকেল, পাকা সুপারির ছড়া, ডাটা শাক, মাটির পাতিল অর্থাৎ পার্থিব সম্পত্তি বলতে যেটুকু পেরেছে নিয়ে এসেছে।
স্টিমারের একটানা দোলানিতে চারপাশের মানুষজন সমানে ঢুলছে। কেউ কেউ শুয়েও পড়েছে।
হঠাৎ চাপা কান্নার পরিচিত শব্দ কানে ভেসে আসে বিনুর। এধারে ওধারে তাকাতে হরিদাস সাহাদের দেখতে পায় সে। তাদের ডান পাশে বসেছে হরিন্দরা, তারপর রামরতনরা, তাঁদের ঠিক পরেই হরিদাস এবং তার বউ ছেলেমেয়ে।
তারপাশা স্টিমারঘাটে, নদীর কিনারে বসে বিনুরা যখন গোয়ালন্দের স্টিমারের জন্য অসীম উৎকণ্ঠায় অপেক্ষা করছে সেই সময় হরিদাস সাহার বৌকে কাঁদতে দেখেছিল। তেমনই মুখে আঁচল চাপা দিয়ে, একই রকম ক্ষীণ শব্দ করে এখনও কাঁদছে। কোন এক নয়া চিকন্দি গ্রামে যুবতী মেয়েকে খুইয়ে এসেছে তারা। মা তো, বাকি জীবনটা কেঁদে কেঁদেই তার কেটে যাবে।
শোকাতুর মহিলার জন্য পুরনো কষ্টটা ফের নতুন করে অনুভব করতে থাকে বিনু। কিছুক্ষণ বিষণ্ণ চোখে তাকে দেখার পর নদীর দিকে মুখ ফিরিয়ে নেয়।
বাঁ ধারে কোনাকুনি, ডেকের রেলিং পর্যন্ত, যারা বসে বা শুয়ে আছে তাদের মধ্যে একজন অনেকক্ষণ বিনুকে লক্ষ করছিল। লোকটার বয়স পঞ্চাশ বাহান্ন। রোগা, হাড় বার করা চেহারা। লম্বা শীর্ণ মুখে কয়েকদিনের কঁচাপাকা দাড়ি, পাটের ফেঁসোর মতো চুল, চোখা থুতনি, চোখ গর্তে বসা। কণ্ঠমণি ঠেলে বেরিয়ে এসেছে। পরনে খাটো ময়লা ধুতি আর ফতুয়া। লোকটার বাঁ পায়ে উরুর মাঝামাঝি থেকে পায়ের পাতা পর্যন্ত পুরনো কাপড় ছিঁড়ে পুরু করে ব্যান্ডেজ বাঁধা।
