নাসের আলি তার কণ্ঠস্বর ফিরে পেলেন। ধরা গলায় বললেন, হ, ঠিকই কইছেন স্যার। তবে এখনই কিছু করতে গ্যালে হিতে বিপরীত হইয়া যাইব। সংক্ষেপে বুঝিয়ে দিলেন, মানুষ ক্ষিপ্ত হয়ে আছে, পূর্ব পাকিস্তানের সর্বত্র তুমুল উত্তেজনা। রামরতনদের জমিজমা বিক্রি করতে গেলে নাসের আলি বিপদে পড়বেন। পরিস্থিতি একটু শান্ত হোক, মানুষের মাথায় যে খ্যাপামি ভর করে আছে সেটা কাটুক, তারপর ধীরেসুস্থে সুযোগ বুঝে ঠিকই বন্দোবস্ত করা যাবে।
নাসের আলির কথায় আরও জানা যায়, প্রায় তিরিশ কানির মতো দোফসলা উত্তম জমি রামরতনদের। তা ছাড়া পঁচিশের বন্দের পাঁচখানা ঘরওলা বাড়ি, পুকুর, গোটা তিরিশেক ফলন্ত নারকেল গাছ, সুপারি বাগিচা, আম জাম বাতাবি কাউ আর উয়া ফলের বাগান।
রামরতনদের বাড়িঘরের দিকে অনেকেরই নজর। কেনার জন্য তারা মুখিয়ে আছে। কিন্তু বেশ কিছু লোকের ধারণা, উদ্বাস্তুদের সম্পত্তি কেনার দরকার নেই। এমনিই দখল করে নেওয়া যাবে। : কেউ যদি নগদ টাকা বার করে কিনতে যায়, তাকে ঝামেলায় পড়তে হবে। এখন বুদ্ধিমানের কাজ হল, অপেক্ষা করে থাকা এবং সময় সুযোগ এলে কাজে লাগানো।
রামরতন উদ্বিগ্ন মুখে বললেন, বাড়ি জমিন বেদখল হইয়া যাইব না তো?
নাসের আলি বললেন, যতদিন বাইচা আছি, আপনের এক টুকরা জমিন কেও কাইড়া নিতে পারব না। তবে মইরা গেলে কী হইব, জানি না।
এই কি তর মরণের বয়স! আশীর্বাদ করি দীর্ঘায়ু হ। তুই যে জমিজমা অন্যেরে দখল করতে দিবি না, এইতেই আমি নিশ্চিন্ত।
যদি খরিদ্দার পাই, রেজিস্ট্রি কইরা দেওনের লেইগা আপনেরে কিন্তুক জামতলিতে আইতে লাগব।
বাইচা থাকলে আসুম। যা করনের তরাতরি করিস।
স্টিমার ঘন ঘন ভোঁ দিচ্ছিল। চমকে নাসের আলি দেখলেন, জেটির মোটা মোটা থাম থেকে লোহার শেকল খুলে ফেলা হচ্ছে। বন্ধন মুক্তির পরই গ্যাংওয়ে তুলে নেওয়া হবে। তিনি চঞ্চল হয়ে উঠলেন। বললেন, স্যার, এহনই স্টিমার ছাইড়া দিব। আর থাকন যাইব না।
রামরতন ব্যস্ত হয়ে পড়লেন, হ হ, নাইমা যা–
প্রাক্তন মাস্টারমশাইকে প্রণাম করে দ্রুত বিনুর দিকে তাকিয়ে নাসের আলি বললেন, পথে স্যারেগো দেইখেন–
এই অনুরোধটা আগেও করেছেন। ফের বিনুকে মনে করিয়ে দিয়ে বড় বড় পা ফেলে সিঁড়ির দিকে চলে গেলেন নাসের আলি। একটু পর চোখে পড়ল, একতলায় নেমে গ্যাংওয়ে পেরিয়ে জেটির এধারের গেটের মুখে গিয়ে তিনি দাঁড়িয়েছেন। বোঝা যাচ্ছে, যতক্ষণ না স্টিমার তারপাশা ছেড়ে চলে যায়, ওখানেই দাঁড়িয়ে থাকবেন।
শেকল ভোলা হয়ে গিয়েছিল। সিলেট জেলার খালাসিরা অদ্ভুত সুর করে দুর্বোধ্য ভাষায় কী যেন বলতে বলতে গ্যাংওয়ে তুলে ফেলল। ভোঁ বাজছিলই। হঠাৎ সেটার জোর দশগুণ বেড়ে যায়। সমস্ত চরাচরে কাঁপন তুলে স্টিমার শেষ ভোঁ দিল। সঙ্গে সঙ্গে বিকট শব্দ করে জলযানের ইঞ্জিনও চালু হয়ে গেল।
নাসের আলি নেমে যাবার পর বিনু খোলা ডেকের রেলিংয়ের কাছে এসে দাঁড়িয়ে ছিল। তার পাশে রামরতন।
হেমন্তের নদীতে বিশাল বিশাল ঢেউ তুলে স্টিমারের দু’ধারের চাকা ঘুরে চলেছে। ধীরে ধীরে তারপাশা দূরে সরে যাচ্ছে।
নাসের আলি জেটির মুখে দাঁড়িয়ে হাত নাড়ছিলেন। তার পাশে এবং পেছনে বাস্তুহারা, বিষণ্ণ, হতাশ মানুষদের ভিড়। পরের বা তার পরের কিংবা তারও পরের স্টিমারে ওঠার জন্য তাদের কতদিন তারপাশায় পড়ে থাকতে হবে, কে জানে।
বিনু এবং রামরতনও হাত নাড়ছিলেন। বিনু লক্ষ করল, চশমার পুরু কাঁচের ভেতর রামরতনের ঘোলাটে চোখ ক্রমশ জলে ভরে যাচ্ছে।
রাজদিয়া থেকে বেরুবার পর দুটি মানুষকে দেখেছে বিনু–আফজল হোসেন এবং নাসের আলি। এদের সঙ্গে এ জীবনে আর দেখা হবে না। বিনু ভাবে, যদি সে বেঁচে থাকে, শেষ পর্যন্ত কলকাতায় পৌঁছতে পারে, সময়ের পলি পড়ে পড়ে একদিন এই চরম দুঃসময়ের অনেক কিছুই ঢেকে যাবে, কিন্তু এই দুটো মানুষকে কোনও দিনই ভোলা যাবে না।
স্টিমারের গতি বেড়ে যাচ্ছে। তারপাশার স্টিমারঘাট ছোট হতে হতে একসময় বিন্দুবৎ মিলিয়ে গেল।
এক ঝাঁক নাছোড়বান্দা শঙ্খচিল মাথার ওপর চক্কর দিতে দিতে আসছিল। স্টিমারটাকে গোয়ালন্দর দিকে খানিকটা এগিয়ে দিয়ে এখন তারা ফিরে যাচ্ছে। বিনু জানে, এই জল-বাংলায় যেখানে যে স্টিমারই আসুক, আর যেদিকেই যাক, শঙ্খচিলেরা সেগুলোকে কিছুক্ষণ সঙ্গ দেয়।
কার্যকারণ নেই, অসংলগ্নভাবে হঠাৎ একটা কথা মনে পড়ল বিনুর। মুন্সিগঞ্জ, ভাগ্যকুল কি তারপাশা, আগে যেখানেই সে গেছে, দেখেছে স্টিমার এলেই ঝাঁকে ঝাঁকে মিঠাইয়ের নৌকো সেটাকে ঘেঁকে ধরত। কত রকমের মিষ্টি-রসগোল্লা, রাজভোগ, পান্তুয়া, ক্ষীরমোহন। এসব ছাড়াও মাঠা, কলপাতায় চিনি ছড়ানো ধবধবে মাখনের দলা, পাতক্ষীর। কিন্তু এখন এসব খাওয়ার লোক নেই। যারা সর্বস্ব খুইয়ে চলে যাচ্ছে, তাদের পয়সা কোথায় যে কিনবে। কাজেই মিঠাইয়ের নৌকোও আসে না।
সূর্য অনেকখানি ওপরে উঠে এসেছে। রোদের তাপ বাড়ছে। চাকার অবিরত ঘূর্ণনের শব্দ আর ইঞ্জিনের একটানা গজরানি ছাড়া তেমন কোনও আওয়াজ নেই। নদীর জল উথলপাথল করে, সফেন ঢেউ তুলে স্টিমার ছুটে চলেছে।
বিনুরা রেলিং ধরে দাঁড়িয়েই ছিল। রামরতন বললেন, বহুক্ষণ খাড়ইয়া আছি, পা ধইরা গ্যাছে। চল, বসি গিয়া। তুমি কইরা কইলাম কিন্তুক। তুমি আমার নাতির বয়সী।
