অগত্যা দোকানদারের কাছ থেকে সাধারণ জ্বরজারি কমানোর কিছু বড়ি কিনল বিনু। ইনফ্লুয়েঞ্জা বা গা ব্যথা করে জ্বরটর হলে ডাক্তাররা এ সবই দেয়। খুব চেনা ওষুধ।
নাসের আলি বললেন, আর এক কাম করেন। কাইল হউক, পরশু হউক, স্টিমার আসবই। পথে খাওনের লেইগা কিছু শুকনা জিনিস কিনা লন (নিন)।
আগে গোয়ালন্দগামী স্টিমারে ভাত আর মুরগির মাংস পাওয়া যেত। বিনু শুনেছে, দেশভাগের পর সে সব বন্ধ হয়ে গেছে। নাসের আলি মানুষটা খুবই দুরদশী। সকল দিকে তার নজর।
বিনু কিছু চিড়ে, মুড়ি, মুছি গুড় আর এক ফানা মোহনবাঁশি কলা কিনল। নাসের আলিও রামরতনদের জন্য চিড়ে টিড়ে কিনে নিলেন।
জেটিতে ফিরে ঝিনুকের ঘুম ভাঙিয়ে একটা বড়ি খাইয়ে দেওয়া হল, কিন্তু চিড়ে টিড়ে কিছুই খাওয়ানো গেল না।
ওষুধ খেয়ে ফের শুয়ে পড়েছিল ঝিনুক। সঙ্গে সঙ্গে ঘুম।
বিনুরও খেতে ইচ্ছা করছিল না। সে চুপচাপ ঝিনুকের শিয়রের কাছে বসে থাকে।
রাত বাড়ছিল। স্টিমারঘাটের কলরোল ক্রমশ ঝিমিয়ে আসে। স্টিমারের জন্য অপেক্ষা করতে করতে আরও একটা রাত কেটে যাবে বিনুদের।
.
৩.১০
পরদিন সকালে যা ঘটল তা প্রায় অভাবনীয়। অবিশ্বাস্যও বলা যায়।
সবে রোদ উঠেছে। কাল বিকেল থেকে সমস্ত চরাচরের ওপর পুরু হয়ে যে কুয়াশা জমে ছিল, তা দ্রুত বিলীন হয়ে যাচ্ছে। খানিক বাদে তার চিহ্নটুকুও থাকবে না। হেমন্তের কুয়াশামুক্ত নীলাকাশ এখন পরিষ্কার, তকতকে। নদীর অগুনতি পলকা ঢেউয়ের মাথায় রোদ সোনার কলস উপুড় করে দিয়েছে।
আকাশের নীল ছুঁয়ে ছুঁয়ে উড়ছে শঙ্খচিল। সারা রাত তারা কোথায় থাকে, কে জানে। জল বাংলার যেখানেই যাওয়া যাক, ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই ওরা ঝাঁকে ঝাঁকে বেরিয়ে পড়ে।
ঠিক এই সময় দেখা গেল, দূর দিগন্ত পেরিয়ে স্টিমার আসছে। জেটিঘাটে বা বাইরে যারা দলা পাকিয়ে পড়ে ছিল, এখনও তাদের অনেকেরই ঘুম ভাঙেনি। যারা জেগে গিয়েছিল তাদের চোখেও রয়েছে দুলুনি।
হঠাৎ কারা যেন চেঁচিয়ে ওঠে, ইস্টিমার আসে, ইস্টিমার আসে–
কালকের মতোই স্টিমারঘাটে তীব্র ঝাঁকানি লাগে। যারা ঘুমোচ্ছিল, ধড়মড় করে উঠে বসে। যারা ঢুলছিল তাদের চটকা ভেঙে যায়। সবার শরীরে তড়িৎপ্রবাহ খেলতে থাকে।
কালকের মতোই ঠেলাঠেলি, ধাক্কাধাক্কি শুরু হয়ে যায়। স্টিমারে ওঠার জন্য মরণপণ প্রতিযোগিতা। জেটিঘাটার ভেতরেও তুমুল শোরগোল চলছে। সকলেই নদীর দিকের গেটে পৌঁছতে চায়।
দেখতে দেখতে কালো ধোঁয়া ছেড়ে, গম্ভীর ভোঁ বাজিয়ে স্টিমার জেটিঘাটে এসে ভিড়ল। কাল যেটা গোয়ালন্দে গিয়েছিল এটা সেই স্টিমার নয়। সেটার পক্ষে রাতারাতি গোয়ালন্দে লোক নামিয়ে নারায়ণগঞ্জে ফিরে গিয়ে আবার তারপাশায় আসা অসম্ভব। সরকারের সুবুদ্ধির উদয় হয়েছে। তারা হয়তো ভেবেছে, যারা দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছে তাদের কষ্টটা যাতে লাঘব হয়, সেজন্য গোয়ালন্দ রুটে বেশি করে স্টিমার চালানো উচিত।
কাল বিনুরা যে যার মতো আলাদা আলাদা স্টিমারে ওঠার চেষ্টা করেছিল। আজ নাসের আলি পুরো দায়িত্বটা নিজের হাতে তুলে নিলেন। বিনুকে বললেন, আসেন আমার লগে–
রামরতন এবং বিনুদের নিয়ে এগুতে লাগলেন নাসের আলি। হরিন্দরাও তাদের গায়ে লেপটে রয়েছে। সামনে চাপ-বাঁধা মানুষ। গলা চড়িয়ে কর্তৃত্বের সুরে নাসের আলি বললেন, অ্যাই, পথ দাও। দ্যাখো না, আমার লগে বুড়া মানুষ, রুগী মানুষরা রইছে।
একজন মাঝবয়সী, ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মুসলমানকে দেখে কেউ আর বাধা দিতে বা হইচই করতে সাহস পায় না। সামনের ভিড়টা ভয়ে ভয়ে পথ করে দেয়।
গ্যাংওয়ে পেতে দেওয়া হয়েছিল। নাসের আলি সঙ্গীদের নিয়ে স্টিমারে চলে এলেন।
কালকের স্টিমারটার মতোই এটাও কানায় কানায় ঠাসা। একতলায় পা ফেলার জায়গা নেই। নাসের আলি বললেন, এইখানে হইব না, উপুরে চলেন–
দোতলার ডেকেও যথেষ্ট ভিড়। তবু সামান্য কিছু ফাঁকফোকর বার করে রামরতনদের সঙ্গে বিনু এবং হরিন্দদেরও বসিয়ে দিলেন নাসের আলি।
অবাক বিস্ময়ে লোকটাকে দেখছিল বিনু। নাসের আলি প্রায় অসাধ্য সাধন করেছেন। তিনি না থাকলে আজও স্টিমারে ওঠা যেত না।
নাসের আলি রামরতনকে বলছিলেন, স্টিমার এইখানে বেশিক্ষণ খাড়ইব না। বিশ পঁচিশ মিনিটের মইদ্যে ছাইড়া দিব। সাবধানে যাইয়েন। বিনুকে দেখিয়ে বললেন, বাবুসাহেব আছেন, যা দরকার ওনারে কইয়েন। কইলকাতায় গিয়া পৌঁছ সম্বাদটা দিয়েন। খুব চিন্তায় থাকুম।
রামরতন বললেন, হ, দিমু। তবে উইপারের চিঠি এইখানে আসব কিনা, জানি না। একটু চুপ করে থেকে ভাঙা ভাঙা, ঝাঁপসা গলায় বলতে লাগলেন, তুই যা করলি, নিজের পোলাও তা করে না।
এই কথা কইয়েন না স্যার। এইটা আমার কর্তব্য।
কর্তব্য তো অনেকেরই থাকে। পালন করে কয়জন?
একটু নীরবতা।
তারপর রামরতন বললেন, দ্যাশের লগে সম্পর্ক চুইকা গেল। এই জীবনে তগো লগে আর দেখা হইব না। তার ভারী কণ্ঠস্বর হাহাকারের মতো শোনায়।
নাসের আলি কিছু বলতে চেষ্টা করলেন, পারলেন না। তার গলার কাছে কী যেন ক্রমাগত ডেলা পাকিয়ে যাচ্ছে। ঢোক গিলে গিলে প্রবল আবেগকে তিনি সামলাতে চেষ্টা করছেন।
রামরতন বললেন, জমিজমা বাড়িঘরের দলিলপত্র তর কাছেই রইল। যত তরাতরি পারস, ব্যাচনের (বিক্রির ব্যবস্থা করিস। খালি হাতে দ্যাশ ছাড়তে আছি। অর্থবল একটা বড় শক্তি। টাকা থাকলে মনের জোর বাড়ে।
