বাইরে এসে বিনু দেখতে পেল, সবাই উঠে পড়েছে। সুধা সুনীতি অবনীমোহন সুরমা শিবানী স্নেহলতা, সব্বাই। স্নেহলতা তো এর ভেতর স্নানই চুকিয়ে ফেলেছেন। তাড়াতাড়ি মুখ ধুয়ে আবার দাদুর কাছে ফিরে এল বিনু।
কাল স্টিমারঘাট থেকে বাড়ি আসতে যা একটু সঙ্গ পেয়েছে বিনু, তারপর সারাটা দিন তো কেতুগঞ্জেই কাটিয়ে এলেন হেমনাথ। রাত্রিবেলা যখন ফিরলেন তখন মজিদ মিঞারা সঙ্গে রয়েছে। খাওয়া দাওয়া গল্পগুজবের পর অবশ্য হেমনাথকে একেবারে একলা পাওয়া গিয়েছিল, কিন্তু তখন অনেক রাত, আর বিনুর চোখও ঘুমে জড়িয়ে আসছিল।
বিনুর খুব ইচ্ছা, এই সকালবেলা দাদুর সঙ্গে বসে বসে অনেকক্ষণ গল্প করে, কিন্তু সে সুযোগ মিলল না। তার আগেই রান্নাঘরে ডাক পড়ল।
রান্নাঘরটা প্রকান্ড, রাঁধাবাড়া ছাড়াও অনায়াসে পনের কুড়ি জন লোক বসে খেতে পারে। সারি সারি পিঁড়ি পাতা ছিল। হেমনাথের সঙ্গে এ ঘরে এসে বিনু দেখতে পেল, ইতিমধ্যে অন্য সবাই এসে গেছে। তারা বসে পড়তেই স্নেহলতা আর শিবানী খেতে দিতে শুরু করলেন।
কাল রাত্তিরে প্রচুর মিষ্টি এনেছিল মজিদ মিঞারা। সকালে স্টিমারঘাট থেকে হেমনাথ যে রসগোল্লা আর কলা এনেছিলেন তার অনেকটাই থেকে গেছে। তা ছাড়া, স্নেহলতা গাওয়া ঘিয়ের লুচি তরকারি আর হালুয়া করেছেন।
খেতে খেতে হেমনাথ বললেন, মজিদ মিঞাকে কাল কিরকম দেখলে অবনী?
অবনীমোহন বললেন, চমৎকার। এমন সরল ভালমানুষ জীবনে আর কখনও দেখি নি। শুধু আমাদের দেখবার জন্যে রাত্তিরে কেউ এতখানি পথ আসতে পারে, নিজের চোখে না দেখলে কোনও দিন বিশ্বাস করতাম না।
গভীর আবেগের সুরে হেমনাথ বললেন, এখানকার প্রায় সব মানুষই ওই রকম। সরল, ভাল। কিন্তু খেপে গেলে রক্ষে নেই।
অবনীমোহন হাসলেন।
খানিক চুপ করে থেকে হেমনাথ অন্য প্রসঙ্গে চলে গেলেন, কাল সারাদিন কেতুগঞ্জেই কেটে গেছে। তোমাদের সঙ্গে বসে দু’টো কথা বলতে পারি নি। আজ আমি ফ্রি–একেবারে মুক্ত। চল–
স্নেহলতা নাক কুঁচকে কেমন করে যেন বললেন, তুমি মুক্ত! তবেই হয়েছে। দেখ, আবার কোন হাঙ্গামা এসে জোটে!
যাই জুটুক, আমি কোনও দিকে তাকাচ্ছি না। আজকের দিনটা নাতি-নাতনী-মেয়ে-জামাই নিয়ে হই হই করে কাটাব।
সঙ্কল্পটা ভালই।
হেমনাথ এবার অবনীমোহনকে বললেন, কাল সমস্ত দিন তো ঘরে বসে ছিলে। খাওয়াদাওয়া হলে চল একটু ঘুরে আসি। আমাদের রাজদিয়াটা তোমাদের দেখিয়ে আনি।
সাগ্রহে অবনীমোহন বললেন, হ্যাঁ, নিশ্চয়ই।
হেমনাথ কিছু বলতে গিয়ে থেমে গেলেন। হঠাৎ তার কী মনে পড়ে গেছে। বেশ ব্যস্তভাবেই বললেন, হই-হট্টগোলের ভেতর ঝিনুকের কথা খেয়াল ছিল না। সে কোথায়?
স্নেহলতা বললেন, ওর বাবা কাল নিয়ে গেছে।
ভবতোষ ঢাকা থেকে ফিরেছে তা হলে?
হ্যাঁ।
বৌমাকে রেখেই এল?
হ্যাঁ। স্নেহলতা বিমর্ষ মুখে মাথা নাড়লেন। স্ত্রীর রেখে আসার কারণ হিসেবে ভবতোষ কাল যা যা বলে গিয়েছিলেন, সব জানালেন।
তিক্ত সুরে হেমনাথ বললেন, নিজেরা খাওয়াখাওয়ি করে মরছে। মাঝখান থেকে ঝিনুকটার জীবন নষ্ট হয়ে গেল।
কেউ আর কিছু বলল না। বিচিত্র কষ্টদায়ক নীরবতার মধ্যে সকলের খাওয়া শেষ হল। ঝিনুকের প্রসঙ্গ এলেই এ বাড়িতে ঘন হয়ে বিষাদের ছায়া নামে।
খাওয়ার পর হেমনাথ বললেন, চল অবনী, এবার বেরিয়ে পড়া যাক। তোরা কে কে যাবি? বিনুদাদা নিশ্চয়ই যাবে। সুধাদিদি সুনীতিদিদি, তোরা যাবি তো?
সুধা সুনীতি, দু’জনেই ঘাড় কাত করল, অর্থাৎ যাবে।
রমুর গিয়ে দরকার নেই। অনেকখানি হাঁটতে হবে। দুর্বল মানুষ। অত হাঁটাহাঁটি করলে শরীর খারাপ হবে। এক কাজ করলে হত, ভবতোষ কী লালমোহনের ফিটনখানা আগে থেকে চেয়ে রাখলে পারতাম। কাল মনে পড়ে নি। সে যাক গে, পরে গাড়ি ঠিক করে রমুকে একদিন ঘুরিয়ে আনব।
একসময় হেমনাথরা বেরিয়ে পড়লেন। উঠোন বাগান পেরিয়ে শহরগামী সেই পথটায় আসতেই মনে হল, আশ্বিনের এই চমৎকার উজ্জ্বল সকালটা সামনের দিকে অবিরত হাতছানি দিয়ে যাচ্ছে। এই পথটা ছাড়া রাজদিয়ার আর কিছুই মাথা তুলে নেই, প্রায় সবই জলের তলায় ডুবে আছে।
দু’ধারে কালকের সেই পরিচিত দৃশ্য। মাছরাঙা, বাঁশের সাঁকো, নিস্তরঙ্গ জল, মাঝে মাঝে ছাড়া ছাড়া বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো বাড়িঘর, গলানো গিনির মতো রোদ। কথা বলতে বলতে সেই কাঠের পুলটাও পেরিয়ে এল সবাই।
পথ নির্জন নয়। লোক চলাচলে বেশ সরগরমই বলা যায়। যার সঙ্গেই দেখা হচ্ছে, ডেকে ডেকে হেমনাথের সঙ্গে কথা বলছে। বিনুরা যে কলকাতা থেকে এসেছে, সে খবর রাজদিয়ার কারোর জানতে বোধ হয় বাকি নেই। বিনুরা কত দিন থাকবে, এতকাল কেন আসে নি, ইত্যাদি ইত্যাদি হাজারো প্রশ্ন করছে তারা। হেমনাথ উত্তর দিচ্ছেন, অবনীমোহনের সঙ্গে আলাপ টালাপও করিয়ে দিচ্ছেন।
নানা মানুষের কৌতূহল মেটাতে মেটাতে, নানা প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে এবং নিজেদের মধ্যে কথা বলতে বলতে সবাইকে নিয়ে হেমনাথ যখন স্টিমারঘাটের কাছাকাছি পৌঁছলেন, পুব আকাশের ঢাল বেয়ে সূর্যটা অনেকখানি ওপরে উঠে এসেছে। হোগলা-ছাওয়া সেই মিষ্টির দোকানগুলো থেকে ডাকাডাকি শুরু হয়ে গেল, আসেন বড়কত্তা, ভাল মিঠাই আছে। মাইয়া-জামাই-নাতি-নাতনীগো লেইগা লইয়া যান।
মৃদু হেসে হেমনাথ জানালেন, আজ মিষ্টির দরকার নেই।
