অনেকক্ষণ ঝিনুককে জড়িয়ে ধরে রাখার কারণে বুক এবং ডান হাতটা যন্ত্রণায় ছিঁড়ে পড়ছে বিনুর। বাঁ হাত দিয়ে বুকটা ডলতে থাকে সে। চোখেমুখে তীব্র ক্লেশের ছাপ।
হরিন্দ সহৃদয় সুরে বলে, বৌঠাইনেরে অতখানি সোময় ধইরা রাখছিলেন। বুক আর ড্যানা (হাত) নি বিষাইতে (কষ্ট) আছে?
আস্তে মাথা নাড়ে বিনু।
হরিন্দ নিরাশার সুরে এবার বলে, এক ইস্টিমার গেল, উঠতে পারলাম না। কবে যে পরেরটা আসব ক্যাঠা জানে। দুগগতির আর শ্যাষ নাই। তার হা-হুঁতাশ চলতেই থাকে।
হঠাৎ বাঁ দিক থেকে পরিচিত গলা ভেসে আসে, বাবুসাহেব–বাবুসাহেব–
মুখ ঘোরাতেই বিনু নাসের আলিকে দেখতে পায়। খানিক দূরে রামরতন গাঙ্গুলিদের আগলে তিনি বসে আছেন।
আপনেগো জেটিতে না দেইখা চিন্তা হইতে আছিল। যাউক, ভিতরে আইতে পারছেন। বলতে বলতে উঠে এলেন নাসের আলি, আর কিছুক্ষণ দেইখা আপনেগো খোঁজ করতে বাইরে যাইতাম।
স্টিমারে ওঠার জন্য যখন মরণপণ ধাক্কাধাক্কি শুরু হয়েছিল, ঝিনুককে নিয়ে বিনু তখন এতই ব্যতিব্যস্ত, এতই শঙ্কিত যে নাসের বা রামরতনদের কথা খেয়াল ছিল না। লক্ষ করেনি, কখন প্রাক্তন মাস্টারমশাই এবং তার পরিবারকে নিয়ে নাসের আলি জেটিতে চলে এসেছেন।
বিনু বলল, বসুন—
নাসের আলি কাছাকাছি বসে পড়েন।
বিনু বলে, তা হলে আজ আর আপনার গ্রামে ফেরা হল না?
কী কইরা ফিরুম? মাস্টারমশাইগো স্টিমারে না তোলন তরি জেটিঘাটেই থাইকা যামু–
এই কথাটা বুঝিবা আগেও একবার বলেছিলেন নাসের আলি। বিনু একটু ভেবে জিজ্ঞেস করল, আবার কবে স্টিমার আসবে, বলতে পারেন?
নাসের আলি বললেন, ক্যামনে কই? সরকারের মতিগতি বুঝি না। যারা দ্যাশ ছাইড়া যাইতে চায় তাগো তরাতরি যাওনের ব্যবস্থা কইরা দিলেই তো হয়। দিনে তিন চাইটা কইরা স্টিমার দিলে মানুষের এত কষ্ট হইত না।
বিনু ভাবে, এ দেশের সরকার যারা চালায়, তাদের কারোর যদি নাসের আলির মতো সহানুভূতি থাকত! মুখ ফুটে অবশ্য কিছু বলে না।
নাসের আলি থামেননি, এইটুক কইতে পারি, হগলই বড় সাহেবগো মর্জি। স্টিমার যতক্ষণ না আইতে আছে, আশায় আশায় বইসা থাকতে হইব।
মাথাটা সামান্য হেলিয়ে দেয় বিনু, হ্যাঁ।
কথা বলতে বলতে নাসের আলির নজর এসে পড়ে ঝিনুকের ওপর। কয়েক পলক তাকিয়ে থাকেন। তারপর বলেন, বিবিসাহেব খুব কাহিল হইয়া পড়ছেন।
হ্যাঁ।
রোগা মাইয়া, সাবধানে রাখবেন।
আরও কিছুক্ষণ কথা বলে নাসের আলি চলে যান।
এদিকে বেহুঁশের মতো শুয়ে আছে ঝিনুক। তার মুখের ওপর এক গোছা চুল এসে পড়েছে। সেগুলো সরিয়ে দিতে গিয়ে কপালে হাত ঠেকে যায় বিনুর। বেশ গরম। নিশ্চিত হবার জন্য ওর একটা হাত তুলে নেয়। সন্দেহ নেই, জ্বর। দু’দিন একটানা প্রচণ্ড দুশ্চিন্তা, আঙ্ক, হেমন্তের হিম, মৃত্যুভয়, উদভ্রান্তের মতো ছোটাছুটি, এ সবের চাপ ঝিনুকের দুর্বল শরীর সহ্য করতে পারেনি।
বিনু বিচলিত হয়ে পড়ে। রুগণ, ভয়কাতর মেয়েটাকে আগলে আগলে দেশজোড়া বিষাক্ত আবহাওয়ায় রাস্তায় বেরুনোই মস্ত সমস্যা। তার ওপর এই জ্বর। সবে তারপাশা পর্যন্ত আসা গেছে। কলকাতা অনেক দুরের পথ। কিভাবে সেখানে পৌঁছনো যাবে? সমস্যাটা ক্রমাগত জটিল হয়ে যাচ্ছে।
বিনুর মুখ দেখে হরিন্দ কিছু আন্দাজ করে নিয়েছিল। জিজ্ঞেস করল, ছুটোবাবু, বৌঠাইনের শরীল কি খারাপ?
বিনু বলে, হ্যাঁ। জ্বর হয়েছে। ডাক্তার দেখাতে পারলে ভাল হত। এখানে কি ডাক্তার পাওয়া যাবে?
হরিন্দ সাত ঘাটের জল খাওয়া মানুষ। পূর্ব বাংলার নানা অঞ্চলে কত বছর চষে বেড়িয়েছে। কিন্তু সেও কোনও হদিস দিতে পারল না। খানিক চিন্তা করে বলল, উই মিঞাসাব কইতে পারে। নাসের আলিকে দেখিয়ে দিল সে।
সঠিক পরামর্শ দিয়েছে হরিন্দ। নাসের আলি জামতলির বাসিন্দা। তারপাশা থেকে জামতলির দূরত্ব যদিও অনেকটাই, তবু তিনি জানলেও জানতে পারেন।
নাসের আলিকে ডেকে সব বলল বিনু।
নাসের আলি বললেন, শুনছি, এইখানে একজন ডাক্তারের চেম্বার আছে। তরাতরি ওষুধ পড়লে ভাল। নাইলে পথে বিপদে পড়বেন। চলেন দেখি কী করা যায়–
দেশভাগের আগে বেশ কয়েক বার হেমনাথের সঙ্গে তারপশায় এসেছে বিনু। স্টিমার আসার সময় এখানকার গোটা এলাকা জুড়ে চাঞ্চল্য দেখা দিত। সেটা চলে যাবার পর মনে হত, সমস্ত নিঝুম হয়ে গেছে। কিন্তু যেদিন পূর্ব বাংলা পাকিস্তান হল তখন থেকেই এই স্টিমারঘাটের চেহারা আগাগোড়া বদলে গেছে। এখন দিনরাত, অষ্টপ্রহর থিকথিকে ভিড়। আগে দিনে একবার কি দু’বারও স্টিমার আসত। ইদানীং আসাটা অনিয়মিত হয়ে পড়েছে। কদিন পর তার দেখা পাওয়া যাবে, বলা মুশকিল। যখনই আসুক, কয়েক শ উদ্বাস্তু তুলে নিয়ে গোয়ালন্দ যায়। এদিকে ভিটেমাটি ছেড়ে হাজার হাজার মানুষ আসছেই, আসছেই। ভিড় ক্রমাগত বেড়েই চলেছে।
এত মানুষ থাকলে যা হয়, দোকান বাজার অনেক রাত পর্যন্ত খোলা থাকে। চারদিকে হেরিকেন, ত্যাজাক এবং ডেলাইটের আলো জ্বলছে।
বিনুকে নিয়ে জেটির বাইরে চলে এলেন নাসের আলি। এখানে ডাক্তারখানা আছে কিনা, তারও স্পষ্ট ধারণা নেই। অনেক খোঁজাখুঁজি করে একটা ওষুধের দোকান পাওয়া গেল। একজন ডাক্তার সেখানে বসেন, কিন্তু সূর্য ডোবার আগেই সাইকেলে চেপে পাঁচ মাইল দূরে তাঁর গ্রামে ফিরে যান।
