নাসের আলিও তা-ই বললেন।
ঝিনুক জোরে মাথা ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বলল, আমি আর পারছি না, পারছি না, পারছি না।
তাকে এই মুহূর্তে বাইরে বার করে নিয়ে যাওয়া কোনওভাবেই সম্ভব নয়। কেননা, শুধু সামনে আর পেছনেই না, দু’পাশেও অসংখ্য মানুষ।
বিনু বলল, এই স্টিমারটা ধরতে না পারলে এখানেই পড়ে থাকতে হবে। আবার কবে স্টিমার আসবে তার ঠিক নেই। ঝিনুককে নিজের গায়ের সঙ্গে লেপটে দু’হাতে জড়িয়ে রেখে চারদিকের ধাক্কা সামলাতে থাকে সে।
ঝিনুক আর কিছু বলে না। তার নির্জীব রোগা শরীর নেতিয়ে পড়েছে। ঘাড় ভেঙে মাথাটা বিনুর বুকের ওপর যেন ঝুলছে।
গম্ভীর ভোঁ বাজিয়ে ওদিকে স্টিমারটা জেটির গায়ে এসে ভিড়েছে। নোয়াখালি কি সিলেট জেলার খালাসিরা স্টিমার থেকে মোটা মোটা লোহার শেকল জেটির দিকে ছুঁড়ে দিল। জেটিঘাটে আর একদল খালাসি তৈরিই ছিল। তারা শেকলগুলো লুফে মোটা মোটা লোহার থামে বেঁধে ফেলল।
বিনু জানে, স্টিমারটা নারায়ণগঞ্জ থেকে আসছে। জলযানটাতে ঠাসা ভিড়। অর্থাৎ নারায়ণগঞ্জ থেকেই মানুষ তুলতে তুলতে সেটা এখানে এসে পৌঁছেছে।
স্টিমারটা তেতলা। নিচের ডেক থেকে ওপর পর্যন্ত সর্বত্র ছন্নছাড়া উদ্বাস্তুরা দলা পাকিয়ে রয়েছে। কোথাও একটা কুটো ফেলার মতো ফঁক আছে বলে মনে হয় না। এধারে তারপাশা স্টিমারঘাটে হাজার কয়েক লোক ওটায় ওঠার জন্য সমানে ধস্তাধস্তি করছে।
পোক্ত শেকল দিয়ে বাঁধার পর খালাসিরা গ্যাংওয়ে পেতে জেটির সঙ্গে স্টিমারকে জুড়ে দিয়েছিল। সঙ্গে সঙ্গে হুড়মুড় করে গ্যাংওয়ের সরু পথ ধরে পাড়ের লোকজন স্টিমারে ঢুকে পড়তে থাকে।
স্টিমার কানায় কানায় বোঝাই ছিল। তারপরও কী প্রক্রিয়ায় যে আরও দু’আড়াই শ’ মানুষ ঠেসে ঠেসে ঢুকে পড়ল, নিজের চোখে দেখেও বিশ্বাস হচ্ছিল না বিনুর।
হুড়োহুড়ির কারণে জমাটবাঁধা ভিড়টা একদিকে একটু আলগা হয়ে গিয়েছিল। সেই ফাঁক দিয়ে জেটির কাছাকাছি চলে এসেছে বিনুরা, কিন্তু স্টিমার পর্যন্ত পৌঁছোনা গেল না। তার আগেই গ্যাংওয়ে তুলে ফেলেছে খালাসিরা; জেটির মোটা লোহার থামগুলো থেকে শেকল খুলে দিয়েছে। তবু মরিয়া হয়ে অনেকেই স্টিমারে ঝাঁপিয়ে পড়তে চাইছিল। খালাসিরা দাঁত মুখ খিঁচিয়ে তাদের বাপান্ত করতে করতে চেঁচাচ্ছে, পুঙ্গির পুতেরা, গাঙ্গের পানিতে পইড়া মরতে চাও?
জানের মায়া নাই?
যা শালারা, জেটির ভিতরে সান্দ্ (ঢোক) গিয়া–
ঠেলে, ধাক্কা মেরে জলের কিনার থেকে খালাসিরা উদ্ভ্রান্ত মানুষগুলোকে জেটির মাঝখানে ঢুকিয়ে দেয়।
সন্ধে নেমে গিয়েছিল বেশ খানিকক্ষণ আগে। জেটিঘাটে অসংখ্য আলো জ্বলে উঠেছে। গোয়ালন্দগামী স্টিমারটার একতলা থেকে তেতলা পর্যন্ত শুধু আলো আর আলো।
আকাশপাতাল কাপিয়ে বিকট শব্দ করে একসময় স্টিমারের ইঞ্জিন চালু হল। বিরাট বিরাট চাকাগুলো পাহাড়প্রমাণ ঢেউ তুলে দুরন্ত বেগে ঘুরতে শুরু করেছে। নদীতীরের বাঁধন ছিন্ন করে স্টিমারটা গুরুগম্ভীর ভো দিতে দিতে ক্রমশ দূরে সরে যেতে লাগল।
এদিকে সমস্ত জেটিঘাট জুড়ে কান্নার রোল উঠেছে। যারা স্টিমারে উঠতে পারেনি, প্রবল হতাশায় তারা ভেঙে পড়েছে। কেউ কাঁদছে চাপা গলায়, কেউ হাউ হাউ করে। তাদের হয়তো ধারণা, গোয়ালন্দের এটাই শেষ স্টিমার। সীমান্ত পেরিয়ে ইন্ডিয়ায় যাওয়া বুঝি তাদের হল না।
বিনু আগেই বুঝে গিয়েছিল, আজকের স্টিমারে তাদের পক্ষে ওঠা কোনওভাবেই সম্ভব নয়। জেটির মুখ পর্যন্ত চলে আসতে পেরেছে। আশা করা যায়, এরপর যে স্টিমার আসবে সেটায় হয়তো জায়গা পেয়ে যাবে। তাও যদি না পারে, তার পরের স্টিমারে।
হরিন্দর গলা কানে এল, ছুটোবাবু, এইখানে আসেন। এই যে, এই দিকে—
বিনুর চোখে পড়ল, জেটিঘাটের ভেতরে এক কোণে বউ ছেলেমেয়ে নিয়ে বসে আছে হরিন্দ। চোখাচোখি হতে সে হাত নাড়তে লাগল।
বিনুদের সামনে এখনও পঞ্চাশ ষাট জনের নিরেট পাঁচিল। সেটা ভেদ করে ঝিনুককে নিয়ে আর এগুনো যাচ্ছে না। কেউ এক বিঘত জায়গাও ছাড়তে রাজি নয়। জেটির ওধারের গেটের দিকে যতটা এগিয়ে থাকা যাবে, স্টিমার এলে আগে উঠে পড়ার তত বেশি সুযোগ।
বিনু আর পেরে উঠছিল না। পা এবং মাথা টলছে। টের পাচ্ছিল, শরীরের অবশিষ্ট শক্তিটুকু ক্ষয়ে আসছে। যত পলকা আর রোগাই হোক, একটি তরুণীর দেহের ভারে তার শিরদাঁড়া বেঁকে দুমড়ে যাচ্ছে।
হরিন্দ বিনুদের লক্ষ করছিল। লাফ দিয়ে উঠে পড়ে সে। সামনের লোকগুলোকে ঠেলে সরাতে সরাতে চেঁচাতে থাকে, উনাগো (ওঁদের) আসতে দ্যাও–সরো সরো—
লোকগুলো রুখে ওঠে, ক্যান, পিছের মানুষ আগে যাইব ক্যান? কেওরে সুমখে যাইতে দিমু না।
আমরা এক লগে আইছি। গুতাগুতিতে ওনারা পিছাইয়া পড়ছিল। আটকাইও না, পথ ছাড়–
ক্যান ছাড়ুম? পিছাইয়া যহন পড়ছে, পিছাইয়াই থাকব।
হরিন্দ আর কিছু বলে না। লোকটার অলৌকিক ক্ষমতা। হাতে পায়ে তার বিদ্যুৎ খেলতে থাকে। গায়ের জোরে ভিড়ের ভেতর দিয়ে পথ করে করে বিনু এবং ঝিনুককে তার বউ ছেলেমেয়েরা যেখানে বসে ছিল সেখানে নিয়ে আসে। সেই পুরনো সুজনিটা ক্ষিপ্র হাতে পেতে দিয়ে বলে, বৌঠাইনরে তরাতরি শোয়াইয়া দ্যান। বড় কাহিল হইয়া পড়ছে।
নির্জীব, মৃতপ্রায় ঝিনুককে শুইয়ে দেয় বিনু। বাইরে আকাশ থেকে হিম নামছে, নদীর ওপর দিয়ে হেমন্তের ঠাণ্ডা বাতাস বয়ে যাচ্ছে। কিন্তু জেটির ভেতরটা বেশ গরম। চারদিকে থিকথিকে ভিড়। এত মানুষ এক জায়গায় ঠাসাঠাসি করে থাকলে যা হয়, তাদের গায়ের তাপে এবং উষ্ণ নিঃশ্বাসে এখানকার বায়ুমণ্ডল উত্তপ্ত হয়ে আছে।
