দুপুরে খাওয়াদাওয়া চুকিয়ে কাপড়ের দোকান থেকে দু’খানা মোটা সুতির চাদর কিনে এনেছিল বিনু। তারই একটা গায়ে জড়িয়ে শুয়ে আছে ঝিনুক।
এখন বিকেল। সূর্য আকাশের গা বেয়ে পশ্চিমে অনেকখানি ঢলে পড়েছে। গাঢ় হয়ে ছায়া নামছে চারদিকে। রুপোর মিহি রেণুর মতো দিগন্তে কুয়াশা জমছে। শান্ত নদীর ভঙ্গুর ঢেউয়ে ঢেউয়ে হেমন্তের শেষ বেলা সোনা ঢেলে দিচ্ছে।
ঝিনুকের পাশে বসে ছিল বিনু। তার মুখ নদীর দিকে ফেরানো। সেখানে একই চলমান দৃশ্য। নৌকো আসছেই, আসছেই। ঝাকে ঝাকে, বিরতিহীন।
মাঝে মাঝে উঁচু সড়কের দিকে চোখ চলে যায় তার। সেখানেও একই চিত্র। পায়ে হেঁটে মানুষ আসছে ক্লান্ত, ধূলিধূসর, ভয়ার্ত। বেশির ভাগই আসছে নিজের নিজের ছেলেমেয়ে বউ নিয়ে আলাদা আলাদা, ছন্নছাড়া। মাঝে মাঝে চোখে পড়ছে একসঙ্গে জমাট-বাঁধা বহু মানুষ। বোঝা যায়, এক একটা গ্রাম দলবদ্ধ হয়ে চলে এসেছে। পুরুষদের অনেকের হাতেই লাঠি রামদা বা চোখা ফলাওলা বর্শা বা টেটা। অর্থাৎ এরা ভয়ঙ্কর রকমের মরিয়া। ঘরবাড়ি ভিটেমাটি খুইয়ে যখন চলেই যেতে, হচ্ছে, তখন কিসের আর মৃত্যুভয়? হামলা হলে তারা ছাড়বে না, পালটা মার দেবে।
যার শক্তসমর্থ, মেয়ে কি পুরুষ, তাদের সবারই মাথায় বা কাঁধে বাক্সপেটরা। সকাল থেকেই একই দৃশ্য দেখে আসছে বিনু। হঠাৎ নজরে পড়ল, অনেকে থুথুড়ে বুড়োবুড়ি বা অথর্ব পঙ্গুদের পিঠে চাপিয়ে নিয়ে আসছে। নিশ্চয়ই এই বুড়োবুড়িরা ওদের মা-বাপ, ঠাকুমা-ঠাকুরদা, কিংবা প্রিয় কোনও পরিজন। এদের কোথায় ফেলে রেখে যাবে?
অনন্ত প্রতীক্ষা ছাড়া আর কী-ই বা করার আছে? পরশু সন্ধেবেলায় হেমনাথের বাড়ির পুকুরঘাট থেকে রাজেকের নৌকোয় ওঠার পর অনিবার্য মৃত্যু যে কতবার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে তার লেখাজোখা নেই। আতঙ্কে স্নায়ুমণ্ডলী সারাক্ষণ ছিঁড়ে পড়েছে। প্রচণ্ড চাপ সামাল দেবার পর যা হয়, এখন শুধুই অবসাদ। শারীরিক বা মানসিক অনুভূতিগুলো কেমন যেন অসাড় লাগছে।
হয়তো অনেকটা অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিল বিনু, হঠাৎ চারপাশ থেকে তুমুল শোরগোল উঠল।
ইস্টিমার আসতে আছে, ইস্টিমার আসতে আছে—
লৌড়াও লৌড়াও (দৌড়াও দৌড়াও)—
বইসা থাকলে আর জাগা (জায়গা) পামু না।
সচকিত বিনু দেখতে পেল, অনেক দূরে আকাশ যেখানে পিঠ ঝুঁকিয়ে নদীতে নেমে গেছে, একটা জলযানের চেহারা ফুটে উঠেছে। উঁচু চোঙা দেখে অনুমান করা যায়, ওটা সত্যিই স্টিমার।
প্রথমে ছিল হাত চারেক লম্বা কালচে একটা রেখা। ক্রমশ স্টিমারটা স্পষ্ট হতে লাগল। প্রকাণ্ড জলপোকার মতো জলযানটা ঢেউ কেটে কেটে তারপাশার দিকে এগিয়ে আসছে। সেটার চোঙা দিয়ে গল গল করে কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী বেরিয়ে হেমন্তের বাতাসে মিশে যাচ্ছে।
এদিকে স্টিমারঘাটের সুবিশাল চত্বর জুড়ে হুলস্থুল বেধে গেছে। চেঁচামেচি, হুড়োহুড়ি, ধাক্কাধাক্কি, কুৎসিত গালিগালাজের আদানপ্রদান। সবাই আগে গিয়ে স্টিমারে জায়গা দখল করতে চায়। এই হননপুরী থেকে যত তাড়াতাড়ি পালানো যায়।
বিনুর চারপাশে যারা বসে ছিল তাদের মধ্যে প্রচণ্ড চাঞ্চল্য দেখা দিয়েছে। হরিন্দ মালপত্র গোছগাছ করতে করতে তাড়া লাগায়, উইঠা পড়েন ছুটোবাবু, তরাতরি করেন।
ওধার থেকে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে নাসের আলি বিনুকে বলতে থাকেন, আর বইসা থাইকেন না। জেটির দিকে আউগাইয়া (এগিয়ে) যাইতে হইব।
হরিন্দ বা নাসের আলির তাড়া দেবার কারণটা বুঝতে পারে বিনু। কিন্তু তাদের সঙ্গে দুটো সুতি চাদর ছাড়া আর কোনও রকম লটবহর নেই। চাদর দু’টো দ্রুত ভাজ করে ঝিনুককে নিয়ে উঠে পড়ে সে। হরিন্দরাও তাদের বোঁচকাবুচকি, বাক্স বিছানা মাথায় তুলে নিয়েছে।
নাসের আলি যে জোয়ান ছেলেদের পাহারাদার নিয়ে এসেছিলেন, দুপুরে খাইয়ে তাদের গ্রামে ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছেন। হয়তো ভাবেননি, স্টিমার এত তাড়াতাড়ি এসে পড়বে। তিনি নিজে যতটা পেরেছেন রামরতনদের মালপত্র হাতে এবং কাঁধে চাপিয়েছেন, বাকিগুলো নিয়েছে রামরতনের মেয়েরা। শুধু তারাই নয়, চারপাশের সবাই যে যার লটবহর মাথায় চাপিয়ে বা হাতে ঝুলিয়ে জেটিঘাটের দিকে দৌড়বার চেষ্টা করছে। সেই দৌড়ের ভেতর ঢুকে গেল বিরা।
কিন্তু সামনের দিকে মানুষের নিরেট দেওয়াল। ঠাসবুনট ভিড় ঠেলে এগোয় কার সাধ্য।
ওদিকে স্টিমারটা কোনাকুনি নদী পেরিয়ে জেটিঘাটের কাছাকাছি চলে এসেছিল। সেটার বিরাট বিরাট চাকার ঘা লেগে জল তোলপাড় হয়ে যাচ্ছে। এক ঝাঁক শঙ্খচিল তক্কে তক্কে ছিল; কোত্থেকে বেরিয়ে এসে এখন জাহাজের মোটা গোলাকার চোঙাটার চারপাশে চক্কর দিতে শুরু করেছে।
সামনে অগুনতি মানুষ। পেছনেও তাই। দুদিকের চাপে মাঝখানের লোকজনের দম বন্ধ হয়ে আসছিল। বিশেষ করে ঝিনুকের। বিনু সবটুকু শক্তি দিয়ে প্রাণপণে তাকে আগলে রাখতে চাইছে, কিন্তু পেরে উঠছে না। মনে হচ্ছে, তার হাত-পা ঘাড়-মাথা ছিঁড়ে পড়বে। ওদিকে গলার শির ফুলে উঠেছে ঝিনুকের; দুই চোখ ঠিকরে বেরিয়ে আসছে।
ঝিনুক গোঙানির মতো আওয়াজ করে বলে, আমার বুক ফেটে যাচ্ছে। ভিড় থেকে বাইরে নিয়ে যাও।
বিনু বলল, একটু কষ্ট কর ঝিনুক।
হরিন্দ এবং নাসের আলিরা কাছাকাছিই আছেন।
হরিন্দ বলে, অহন বাইর হইয়া গ্যালে ইস্টিমারে ওঠন যাইব না বৌঠাইন।
