বিনু জিজ্ঞেস করল, আমাকে কী করতে হবে বলুন–
নাসের আলি জানালেন, তারপাশার স্টিমারঘাটে দেশ ছাড়ার জন্য যারা জড়ো হয়েছে তারা খুবই সামান্য মানুষ। অক্ষরপরিচয়হীন, অসীম ত্রাসে সবাই কুঁকড়ে আছে। নিজেদের নিয়ে তারা এতই উৎকণ্ঠিত যে অন্য কোনও দিকে তাকাবার সময় নেই। এদের কেউ কখনও কলকাতায় যায়নি। তাদের কারোর ভরসায় রামরতনকে সীমান্তের ওপারে পাঠাতে সাহস হয় না। বিনুকে দেখে মনে হয়েছে–শিক্ষিত, ভদ্র যুবক। সে তো কলকাতায় যাচ্ছেই, কষ্ট করে পথে যদি রামরতনদের একটু দেখাশোনা করে, নাসের আলি নিশ্চিন্ত হতে পারেন। তারই উচিত ছিল শ্রদ্ধেয় মাস্টারমশাই এবং তার পরিবারকে কলকাতায় পৌঁছে দিয়ে আসা। ওই মানুষটার প্রতি তার ঋণের শেষ নেই। কিন্তু দিনকাল খারাপ, বিষবাষ্পে আবহাওয়া ছেয়ে গেছে। সীমান্তের ওপারে কী ঘটছে, তার জানা নেই। কলকাতায় গেলে ফিরে আসা সম্ভব হবে কিনা, কে জানে। প্রতিহিংসা নেবার জন্য সেখানেও মানুষ হয়তো অস্ত্র শানিয়ে অপেক্ষা করছে।
নাসের আলি বিনুর হাত জড়িয়ে ধরে বললেন, না কইবেন না। তার গলার স্বরে অনুনয়।
বিনু একবার ঝিনুককে দেখে নিল। এই রুগণ, লাঞ্ছিত, সদাত্রস্ত তরুণীটি তো রয়েছেই, তার ওপর রামরতনদের দায়িত্ব। ওঁদের সঙ্গে আবার দুটি পূর্ণ যুবতী। এই দুঃসময়ে, ওই বয়সের মেয়েদের নিয়ে সীমান্ত পর্যন্ত পাওয়া যে কতখানি বিপজ্জনক, সে জানে। কিন্তু নাসের আলির মুখের ওপর সোজাসুজি না বলা গেল না।
বিনু বলল, রাস্তায় বিপদ ঘটতে পারে, তাই বুঝে আপনি নিজেই তোকজন সঙ্গে করে পাহারা দিতে দিতে স্টিমারঘাটে এসেছেন। আমাকে ওঁদের নিয়ে যেতে হবে গোয়ালন্দ, সেখান থেকে কলকাতা। বুড়ো মানুষদের নিয়ে ততটা ভয় নেই। কিন্তু মাস্টারমশাইয়ের কম বয়েসের দুই মেয়ে রয়েছে। ঝিনুককে দেখিয়ে বলে, আমার সঙ্গে এও চলেছে। পথে যদি হামলা হয়, আমি কী করে ঠেকাব?
নাসের আলি বলেন, হ, ঠিকই কইছেন।
দেশ ছেড়ে যে হাজার হাজার মানুষ চলেছে তারাও সঙ্গে থাকবে। কিন্তু তাদের কেউ বাধা দেওয়া দূরের কথা, একটা আঙুলও তুলবে না।
জানি। মানুষের মনে এখন বড় ডর।
অনেকক্ষণ ম্রিয়মাণ বসে থাকেন নাসের আলি। রামরতনের দুই যুবতী মেয়ের সম্ভাব্য বিপদের কথা ভেবে হয়তো ভেতরে ভেতরে বিচলিত হয়ে পড়েন। তারপর খানিকটা হতাশার সুরে বলেন, কিছু যদি হয়ই, হেইটা ওনাগো বরাত। তারপাশা পর্যন্ত তিনি ঝুঁকি নিয়ে পৌঁছে দিয়েছেন। এরপর ভাগ্যের হাতে রামরতনদের সঁপে দেওয়া ছাড়া আর কোনও উপায় নেই।
বিনু বলে, আরেকটা কথা—
কন–
ধরুন, কলকাতা পর্যন্ত আমরা পৌঁছতে পারলাম। তারপর মাস্টারমশাইদের কী হবে?
নাসের আলি বলেন, ওনার এক ভাইস্তা (ভাইপো) বিমল গাঙ্গুলি কইলকাতায় থাকে। হেরে চিঠি লেইখা জানান হইছে, মাস্টারমশাইরা যাইতে আছেন।
বিনুর মনে পড়ে যায়, সেও তার দুই দিদি এবং বাবাকে চিঠি লিখে তাদের কলকাতায় যাবার কথা জানিয়েছে। কিন্তু উত্তর আসেনি। জিজ্ঞেস করল, মাস্টারমশাই কি তার ভাইপোর জবাব পেয়েছেন?
আস্তে আস্তে মাথা নাড়েন নাসের আলি, না। আইজ কাইল পোস্টাল ডিপার্টমেন্টে গণ্ডগোল চলতে আছে। ইত্মাি থিকা ঠিকমতো চিঠি আসে না। এইপার থিকা উই পারে যায় কিনা, হেও জানি না।
রামরতন গাঙ্গুলির ব্যাপারটা অনেকখানি অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। তার ভাইপো চিঠি না পেলে কী হবে? ওঁদের কি তার ঠিকানায় বিকেই পৌঁছে দিয়ে আসতে হবে? সে বলে, মাস্টারমশাইয়ের ভাইপো চিঠি না পেয়ে থাকলে তো শিয়ালদা স্টেশনে আসবে না।
কী কইরা আসব? জ্যাঠার যাওনের খবর জানব ক্যামনে?
মাস্টারমশাই কি কলকাতার রাস্তাঘাট চেনেন? ভাইপো না এলে শিয়ালদা থেকে তার বাড়ি চলে যেতে পারবেন?
কইলকাতা তেনার এক্কেবারে অচিনা না। যদূর জানি, অনেক কাল আগে বার দুই ওইখানে গেছিলেন। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ যেইবার মারা যান হেইবার। আরেক বার গেছিলেন ওনার বন্ধু জামতলির সেকেন্দর আলি সাহেবরে লইয়া ডাক্তার বিধান রায়েরে দেখাইতে। সেকেন্দর সাহেব রোগে রোগে মরতে বসছিলেন। বিধান ডাক্তার তেনারে বাঁচাইয়া দিছিলেন।
একটা দুশ্চিন্তা মোটামুটি লাঘব হল বিনুর। শিয়ালদায় পৌঁছতে পারলে রামরতনরা ভাইপোর বাড়ি চলে যেতে পারবেন।
নাসের আলি বলল, আমি এখন যাই। যে পোলাগুলা মাস্টারমশাইগো পাহারা দিয়া আনছে তাগো হোটেলে খাওয়াইয়া বাড়িতে পাঠাইতে হইব।
কী ভেবে বিনু জিজ্ঞেস করল, আপনি ফিরে যাবেন না?
না। যতক্ষণ না মাস্টারমশাইরা স্টিমারে উঠতে আছেন, আমি এইখানেই থাইকা যামু।
গোয়ালন্দের স্টিমার আজ আসবে কিনা, কারোর জানা নাই। রামরতনদের স্টিমারে তুলে না দেওয়া পর্যন্ত তারপাশা ছেড়ে যাবেন না নাসের আলি। দু’চার দিন এখানে যদি থেকেও যেতে হয়, থাকবেন।
বিনু আর কোনও প্রশ্ন করল না। নাসের আলিও আর বসলেন না, রামরতনদের কাছে ফিরে গেলেন।
.
৩.০৯
জামাকাপড়া, বিছানাপত্র, সবই খোয়া গেছে। হরিন্দ একখানা সুজনি পেতে দিয়েছিল, তাই তারা বসতে পেরেছে। কিন্তু সামনে লম্বা পাড়ি। ঠাণ্ডাটা প্রতিদিনই বেড়ে চলেছে। সূর্য ডোবার আগেই কুয়াশায় চরাচর ঢেকে যায়। সীমান্তের ওপারে পৌঁছবার জন্য আকণ্ঠ উদ্বেগ তো রয়েছেই, শীতের সঙ্গেও যোঝযুঝিটা কম নয়।
