ফিরে এসে বিনু দেখতে পেল, ঝিনুক হরিন্দদের সুজনির ওপর বসে উদভ্রান্তের মতো তাকিয়ে তাকিয়ে চতুর্দিকে কী খুঁজছে। ওর মুখচোখ দেখে টের পাওয়া যায়, সবেমাত্র ঘুম ভেঙেছে। জেগে উঠে বিনুকে দেখতে না পেয়ে ভীষণ ভয় পেয়ে গেছে।
ঝিনুক দম-আটকানো গলায় বলল, কোথায় গিয়েছিলে তুমি? কোথায়? বলতে বলতে কেঁদে ফেলল।
হাতের পাত্রগুলো নামিয়ে রেখে বিনু ঝিনুকের পাশে বসে পড়ে। বলে, হোটেলে। দুপুরে খেতে হবে তো–
সেই ঢাকা থেকে ফেরার পর সারাক্ষণ ত্রস্ত হয়ে থাকে ঝিনুক। কী এক আতঙ্ক যেন তাকে দিনরাত তাড়া করে চলেছে।
ঝিনুকের চোখ থেকে ফোঁটায় ফোঁটায় জল ঝরে যাচ্ছে। কান্না-জড়ানো ঝাঁপসা গলায় সে বলে, আমাকে সঙ্গে নিয়ে যাওনি কেন?
তুমি ঘুমোচ্ছিলে।
ডাকতে পার নি?
ঘুম ভাঙালে তোমার শরীর খারাপ হত। তাই–
হলে হত। অবুঝ বালিকার মতো মাথা ঝাঁকাতে থাকে ঝিনুক, তুমি আমাকে ফেলে কক্ষনো আর কোথাও যাবে না।
ঝিনুকের মাথায় হাত বুলিয়ে তাকে শান্ত করতে করতে বিনু বলে, ঠিক আছে, যাব না।
কান্নার বেগ কমে আসে ঝিনুকের। হাতের পিঠে চোখ মুছে সে বলে, কী ভয় যে পেয়েছিলাম! ওই দেখ– বলে ডান ধারে আঙুল বাড়িয়ে দেয়।
বিনু আগে লক্ষ করেনি। এবার চোখে পড়ল, খানিক দূরে সেই প্রৌঢ় মুসলমানটি এবং তার সঙ্গীরা বসে আছে। বৃদ্ধ, বৃদ্ধা, দুই তরুণী আর বিধবাটিকেও দেখা গেল। ওদের পাশে স্থূপাকার মালপত্র। অর্থাৎ অন্য কোথাও ফাঁকা জায়গা না পেয়ে ওরা এখানে চলে এসেছে।
প্রৌঢ় মুসলমানটি অবশ্য চুপচাপ বসে নেই। আশেপাশে যারা আগে থেকে এসে বসে ছিল তাদের কী সব জিজ্ঞেস করছে। খানিকটা দূরে থাকায় বিনুরা অবশ্য কথাগুলো শুনতে পাচ্ছে না।
ঝিনুকের ভীতির কারণটা এবার স্পষ্ট হয়ে যায়। লাঠি সড়কি দেখে প্রচণ্ড ঘাবড়ে গেছে সে। ঢাকার অভিজ্ঞতা তার স্মৃতি থেকে কোনও দিনই মুছে যাবার নয়। বিনু বলল, ভয় পেও না, ওরা লোক ভাল।
ঝিনুক বলে, তুমি কেমন করে জানলে?
লোকগুলো সম্পর্কে কেন তার এমন ধারণা হয়েছে, বুঝিয়ে দেয় বিনু।
ঝিনুক আর কোনও প্রশ্ন করে না।
কথা বলতে বলতে হঠাৎ প্রৌঢ় মুসলমানটির নজর এসে পড়ে বিনুর ওপর। কী ভেবে তিনি উঠে আসেন। বলেন, আদাব। আমার নাম নাসের আলি।
বিনু টের পেল, ঝিনুক তার কোমরের কাছটা প্রাণপণে খামচে ধরেছে। সে যতই নাসের আলিকে ভালমানুষ বলে তাঁর গুণগান করুক, ঝিনুকের সংশয় কাটছে না। লোকটা তাদের কাছে চলে আসায় সে ভীষণ অস্বস্তি বোধ করছে।
বিনু হাতজোড় করে নিজের নাম জানিয়ে উৎসুক চোখে তাকিয়ে থাকে।
নাসের আলি বলেন, আমি জামতলি হাই স্কুলের অ্যাসিস্টান্ট হেডমাস্টার। আপনেগো বাড়ি আছিল কই?
বিনু বলল। জামতলি নামটা তার জানা, তবে সেটা কোথায় সে সম্বন্ধে তার পরিষ্কার ধারণা নেই।
নাসের আলি বলেন, দ্যাশ ছাইড়া চইলা যাইতে আছেন?
হ্যাঁ। আস্তে মাথা নাড়ে বিনু।
দেইখা মনে হয়, আপনে একজন এডুকেটেড ইয়ং ম্যান। দয়া কইরা একটা উপকার করবেন?
কী উপকার?
দূরে বৃদ্ধকে দেখিয়ে নাসের আলি বলেন, ওনার নাম রামরতন গাঙ্গুলি। এক কালে জামতলি হাই স্কুলের হেডমাস্টার আছিলেন। আমি ওনার ছাত্র। ঢাকা ইউনিভার্সিটির এম. এ’তে ফার্স্ট ক্লাস। হেই ব্রিটিশ আমলে ইচ্ছা করলে বড় অফিসার হইতে পারতেন। হন নাই।
নাসের আলি বিস্তারিতভাবে আরও জানান, পঁয়তাল্লিশ বছর আগে ইউনিভার্সিটির শেষ ডিগ্রিটা পাওয়ার পর গ্রামে এসে থিতু হয়ে বসলেন রামরতন। জামতলি অঞ্চলে সে আমলে লেখাপড়া নিয়ে কেউ তেমন মাথা ঘামাত না। জায়গাটা ছিল অশিক্ষা আর কুশিক্ষার বিশাল আড়ত। রামরতন বিপুল উদ্যমে মানুষ গড়ার কাজে নামলেন। জামতলি এবং তার চারপাশের দশ বারটা গ্রামের প্রতিটি হিন্দু আর মুসলমানের বাড়ি বাড়ি ঘুরে তিনি ছাত্র যোগাড় করতে লাগলেন। রামরতনের তুলনা নেই। মানুষ এবং শিক্ষক হিসেবে তিনি সৎ, নির্লোভ, নিষ্ঠাবান। জামতলি এলাকায় তার হাত ধরেই শিক্ষার আলো ঘরে ঘরে পৌঁছে গেছে। এখন ওখানকার প্রতি দশটা পরিবারে কম করে একজন গ্র্যাজুয়েট, প্রতি বিশটা পরিবারে একজন এম. এ।
শুনতে শুনতে রাজদিয়ার আশু দত্তর কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল বিনুর। হুবহু তারই মতো একই ছাঁচে গড়া। নিজের কেরিয়ার, উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ, সব কিছু বিসর্জন দিয়ে জাতি গঠনের কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন আশু দত্ত। সেই সময় এই ধরনের আদর্শবাদীদের পূর্ব বাংলার প্রায় সব অঞ্চলেই দেখা যেত।
নাসের আলি থামেননি, এই মানুষটারে আমাগো মাথায় কইরা রাখনের কথা। কিন্তুক দিনকাল আর আগের মতো নাই। কিছু মানুষ জানোয়ার হইয়া গ্যাছে। যারে বাপের মতো সম্মান দেওনের কথা, তারই সর্বনাশ করতে চায়। চাশভাগের আগে থিকাই আমাগো জামতলি এরিয়াটা গরম হইয়া আছে। তবু আমরা অনেকেই রামরতন স্যারের ফ্যামিলি আগলইয়া রাখছিলাম। কিন্তু আর পারা যাইব না। ওনার ঘরে দুই অবিয়াত (অবিবাহিত) জুয়ান (যুবতী) মাইয়া। কুন দিন কী অঘটন ঘইটা যাইব। হেই লেইগা কয়জন ভাল সাহসী পোলা জুটাইয়া পাহারা দিয়া দিয়া তারপাশায় লইয়া আইছি। পথেও তো ভরসা নাই। কার মনে কী কুমতলব আছে, কে জানে। জুয়ান মাইয়া দেইখা কে কী কইরা বসব, হেইর লেইগা পাহারাদারির বন্দোবস্ত।
