বেশ কিছু হিন্দু হোটেল এখনও টিকে আছে এখানে। সেগুলোর কাছাকাছি মুসলমানদের কটা হোটেলও চোখে পড়ল।
বিনুরা একটা হোটেলে ঢুকতে যাবে, হঠাৎ ডান দিকের সড়কে হইচই শোনা গেল। বহু মানুষের মিশ্র কণ্ঠস্বর। আওয়াজটা স্টিমারঘাটের দিকে এগিয়ে আসছে।
যদিও এখানে পুলিশ মোতায়েন রয়েছে, গভর্নমেন্ট থেকে মোটামুটি সুরক্ষার একটা বন্দোবস্তও করেছে, তবু আবহাওয়া এমনই বিষময়, যে কোনও দিন, যে কোনও সময় চরম কিছু ঘটে যেতে পারে। হয়তো স্টিমারঘাটের পাহারাদারি ফুৎকারে উড়ে যাবে। এতগুলো নির্ভূম মানুষের ওপর যদি হানাদারেরা ঝাঁপিয়েই পড়ে, পুলিশ তাদের কতটা ঠেকাতে চেষ্টা করবে, সে সম্বন্ধে সংশয় আছে।
হোটেলে ঢোকা হল না, উৎকণ্ঠিত বিনু এবং হরিন্দ ডান পাশের সড়কের দিকে তাকিয়ে রইল। দেখা গেল, অনেকগুলো লোক লম্বা লম্বা পা ফেলে এদিকে আসছে। তাদের কারোর হাতে লাঠি, কারোর হাতের সড়কির ফলায় দুপুরের রোদ ঝলকাচ্ছে।
ভয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছিল হরিন্দ। কাঁপা কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল, এই লোকগুলার কী মতলব ছুটোবাবু? কিছু বিপদ হইব?
রুদ্ধশ্বাসে বিনু বলল, কী জানি, বুঝতে পারছি না।
আমরা শ্যাষ। আর বুঝিন ইন্ডিয়ায় যাওন হইল না!
হোটেলের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল বিনুরা। ভেতরে কাঁচা মেঝেতে কাঠের পিঁড়িতে বসে অনেকে খাচ্ছে। একধারে নিচু তক্তপোষে টিনের ক্যাশবাক্স কোলের কাছে নিয়ে বসে আছে মাঝবয়সী থলথলে চেহারার একটা লোক। খুব সম্ভব হোটেলের মালিক। বিনুদের কথাগুলো তার কানে গিয়েছিল। সে বলল, ডরের কিছু নাই। গরমেন (গভর্নমেন্ট) ইস্টিমারঘাটায় ঝঞ্ঝাট করতে দিব না। পুলিশ আছে।
হরিন্দ বলল, মেলা (অনেক) মানুষ লাঠি সড়কি লইয়া এই দিকে আইতে আছে।
হোটেলের মালিক বাইরে বেরিয়ে আসে। দূরের সশস্ত্র লোকগুলোকে দেখতে দেখতে তার কপালে ভাঁজ পড়ে। বলে, দ্যাশভাগের আগে বড় দাঙ্গার সোময় এইখানে কিছু হয় নাই, পরেও না। অরা সড়কি উড়কি লইয়া আইতে আছে ক্যান, গতিক বুইঝা লই। একদৃষ্টে সে তাকিয়ে থাকে।
ডান ধারের যে সড়কটা ধরে বাহিনীটা আসছে, তার দু’ধারেও ভিটেমাটি খোয়ানো প্রচুর মানুষ স্টিমার ধরার জন্য অপেক্ষা করে আছে। সড়কের অনেকটা নিচে এখানে ধানখেত। অস্ত্রধারীদের দেখে ভয়ে আতঙ্কে তাদের অনেকে উধ্বশ্বাসে ধানখেতের দিকে দৌড়ে যায়। কেউ কেউ দিশেহারার মতো এধারে ওধারে ছোটাছুটি করতে থাকে।
সশস্ত্র দলটা অনেক কাছাকাছি এসে পড়েছে। এখন তাদের আরও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। সড়কের এক পাশে দশ বারটি মুসলমান যুবকের একটা সারি, আরেক পাশেও তা-ই। এদের তিন চারজনের হাতে অস্ত্র তো আছেই, তা ছাড়া কাঁধে এবং মাথায় রয়েছে প্রচুর লটবহর।
যুবকদের দুই সারির মাঝখানে সত্তর বাহাত্তর বছরের একজন বৃদ্ধ। পরনে ধুতি আর পাঞ্জাবি। তার সঙ্গে একজন বৃদ্ধা। মহিলার একটা চুলও কাঁচা নেই, সিঁথিতে চওড়া করে সিঁদুর লেপা, হাতে শাঁখা এবং রুপো-বাঁধানো লোহা। এঁরা ছাড়াও রয়েছে একটি মাঝবয়সী থান-পরা বিধবা এবং দুটি অবিবাহিত তরুণী। সবারই হাতে-পায়ে-মুখে-মাথায় পুরু ধুলোর স্তর। বোঝা যায়, বহু দূর থেকে তারা হেঁটে আসছে।
এত বড় দলটার একেবারে সামনে একজন প্রৌঢ় মুসলমান। তার দিকে তাকালে রীতিমতো সম্ভ্রম হয়। টকটকে ফর্সা রং, ধারাল নাক, একজোড়া উজ্জ্বল চোখ, চওড়া কপাল, মুখে কাঁচাপাকা দাড়ি। অভয় দেবার ভঙ্গিতে হাত তুলে যে সন্ত্রস্ত মানুষগুলো এদিকে সেদিকে ছোটাছুটি করছিল তাদের উদ্দেশে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে সমানে বলে যাচ্ছেন, ডরাইয়েন না, ডরাইয়েন না। আমরা খুনখারাপি লুটপাট করতে আসি নাই। যে যেইখানে আছিলেন সেইখানে ফিরা আসেন। পলাইয়েন না।
যারা পালাচ্ছিল তারা থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে। কিছুক্ষণ প্রৌঢ় মুসলমান এবং তার সঙ্গীদের লক্ষ করে যখন বুঝতে পারে ওঁদের দিক থেকে ক্ষতির সম্ভাবনা নেই, পায়ে পায়ে ফিরে আসতে থাকে।
সশস্ত্র দলটাকে দেখে বিনুর চোখেমুখে যে আতঙ্ক ফুটে বেরিয়েছিল, এখন সেটা বদলে গিয়ে শুধুই অপার বিস্ময়। সে আন্দাজ করে নিল, প্রৌঢ়টি কয়েকজন যুবককে নিয়ে পাহারা দিয়ে দিয়ে একটি হিন্দু পরিবারকে তারপশায় নিয়ে এসেছে।
পাশ থেকে হোটেলের মালিক বলে ওঠে, কইছিলাম না, তরাসের কিছু নাই। আমাগো তারপাশায় কুনো গণ্ডগোল হয় না। বলে ব্যস্তভাবে হোটলের ভেতর ঢুকে গেল। লোকজন খেতে বসে গেছে। এখন তার দাঁড়িয়ে থাকার সময় নেই।
প্রৌঢ় মুসলমানটি চারদিক লক্ষ করতে লাগলেন। কোথাও এতটুকু কাঁক নেই। সর্বত্র ঠাসা মানুষ। তিনি সঙ্গীদের নিয়ে বাঁ পাশে ঘুরে নৌকোঘাটের দিকে চলে গেলেন।
হরিন্দও কম অবাক হয়নি। সে কানের কাছে মুখ এনে ফিস ফিস করল, আমরা ডরে মরতে আছিলাম। কী ভাবছিলাম, আর কী দেখলাম! হগল মানুষ মোন্দ হইয়া যায় নাই।
বিনু উত্তর দিল না। হোটেলে ঢুকে ভাত ডাল তরকারি মাছের পাতুরি কিনে হরিন্দ আর সে নৌকোঘাটের কাছাকাছি তাদের সেই জায়গাটায় ফিরে এল। হোটেলের লোকেরা সিলভারের নানা পাত্রে খাদ্যবস্তুগুলো গুছিয়ে গাছিয়ে দিয়েছে। সঙ্গে দিয়েছে কলাপাতা আর মাটির গেলাস, একটা খাবার জলের কলসিও। খাওয়াদাওয়া চুকলে পাত্রগুলো নদীর জলে ধুয়ে পাখলে হোটেলে ফেরত দিয়ে যেতে হবে।
