কিন্তু কিছুদিন হল, হরিদাসদের এলাকাটা হঠাৎ তেতে উঠতে শুরু করেছে। উস্কানিটা কারা দিচ্ছিল, টের পাওয়া যায়নি। তবে স্থানীয় মানুষজনের একটা অংশের মুখচোখের চেহারা যাচ্ছিল বদলে। কুমোরদের কামারদের যুগীদের বামুনদের কায়েতদের জমিজেরাত, হালহালুটি, বাড়িঘর, বাগানপুকুরের দিকে তাদের নজর এসে পড়তে লাগল। আরম্ভ হল শাসানি- দেশ ছেড়ে চলে যাও।
হরিদাস সাহা হরিন্দর মতোই ইন্ডিয়ায় কখনও যায়নি। সেখানে গিয়ে কী খাবে, কিভাবে তাদের দিন চলবে, ভেবে পাচ্ছিল না। হুমকি সত্ত্বেও ঘাড় গুঁজে তারা গ্রামে পড়ে ছিল। কিন্তু পরশু মাঝরাতে মারাত্মক ঘটনা ঘটে যায়। মুখে কাপড় বেঁধে পাঁচ সাতজনের একটা দল ঘরের দরজা ভেঙে হরিদাসের যুবতী মেয়েকে তুলে নিয়ে যায়। সশস্ত্র হানাদারদের ঠেকাতে পারেনি সে। তারপর ভোর হতে না হতে গ্রামের মাতব্বরদের বাড়ি গিয়ে সবার হাতে পায়ে ধরেছে। কিন্তু সুরাহা হয়নি। মাতব্বরদের অনেকেই তাকে সহানুভূতি জানিয়েছে, কেউ কেউ যথেষ্ট ঝুঁকি নিয়ে আন্তরিকভাবে মেয়েটাকে খুঁজে বার করতে চেষ্টা করেছে। কিন্তু তাকে উদ্ধার করা যায়নি।
ভেতরে ভেতরে ভেঙে চুরমার হয়ে গিয়েছিল হরিদাস। সেই অবস্থাতেই স্থির করে ফেলেছে, এদেশে আর নয়। যা হবার হবে, সীমান্তের ওপারেই চলে যাবে তারা। বাক্সপেটরা, হাঁড়িকুড়ি, জামাকাপড়, যেটুকু পেরেছে কাঁখে আর মাথায় করে ছেলেমেয়ে বউয়ের হাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে তারপাশায় চলে এসেছে।
বুকের মধ্যে চাপা কষ্ট অনুভব করছিল বিনু। মনে হচ্ছিল, হৃৎপিণ্ড ফেটে চৌচির হয়ে যাবে।
ফের চারপাশ দেখে নিয়ে শ্বাস-চাপা গলায় হরিন্দ বলে, ছুটোবাবু, ইস্টিমারঘাটায় এত মানুষ যে দেখতে আছেন, তাগো কেওর কেওর (কারোর কারোর) যুবতী বউ কি মাইয়া উঠাইয়া লইয়া গ্যাছে। হরিদাস সাহার বউয়ের লাখান দুই চাইরজন মুখে আচল গুইজা কান্দে, বাদবাকি হগলে এক্কেরে পাথর। বউ-মাইয়া খুয়াইয়া কী যন্তণা নিয়া যে দ্যাশ ছাইড়া যাইতে আছে! মরণকাল তরি (পর্যন্ত) এই দুঃখু অগো ঘুচব না।
কী উত্তর দেবে বিনু? সে চুপ করে থাকে।
হরিন্দ কিছু ভেবে আবার শুরু করে, ছুটোবাবু, আর কয়দিন যদিন গেরামে থাকতাম, আমার কপালেও অ্যামনটা যে ঘটত না, ক্যাঠা (কে) জানে। ঠিক সোময়ে রাধাগোবিন্দ আমারে দ্যাশ ছাড়নের সুবুদ্ধি দিছে।
বেলা ক্রমশ চড়ছিল। সকালে হাওয়ায় যে ভেজা, ঠাণ্ডা ভাবটা ছিল, এখন আর তা নেই। রোদের তাপ বাড়ায় বাতাস বেশ শুকনো, ঝরঝরে।
নৌকোঘাটে ভিটেছাড়া মানুষ বোঝাই করে একের পর এক নৌকো আসছিলই। বেলা চড়ার সঙ্গে সঙ্গে নৌকোর সংখ্যা ক্রমশ বেড়ে চলেছে। নদীর মাঝখান দিয়ে রংবেরঙের পাল তুলে বড় বড় মহাজনী ভড় মন্থর গতিতে ভেসে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে দু’একটা লঞ্চ কি গয়নার নাও’ হেমন্তের শান্ত জলস্রোতে তুফান তুলে কোথায় চলেছে, কে জানে।
নদীতে সেই একই একঘেয়ে ছবি। অফুরান জলরাশি, নৌকো, দু’চারটে লঞ্চ। মাথার ওপর পাখির ঋক, স্বচ্ছ নীলাকাশ, কয়েক টুকরো ধবধবে ভবঘুরে মেঘ।
ডাঙাতেও সেই একই দৃশ্য, সকালে তারপশায় এসে ঠিক যেমনটি দেখেছিল। উঁচু মাটির রাস্তা ধরে মানুষ আসছেই, আসছেই। বিরামহীন।
কিন্তু কাল নারায়ণগঞ্জ থেকে যে স্টিমার ছাড়ার কথা ছিল, আজ এখনও সেটার দেখা নেই। কখন আসবে, কবে আসবে, কেউ জানে না।
সূর্য যখন সোজাসুজি মাথার ওপর চলে এসেছে, বিনু উঠে পড়ল। ডান পাশে খানিক দূরে, কাতার দিয়ে ভাতের হোটেল। আফজল হোসেন সকালে দই চিড়ে টিড়ে খাইয়ে গিয়েছিল। তারপরও অনেকটা সময় কেটে গেছে। এ অঞ্চলের মানুষের ভাতের নাড়ি। দুপুরে পেটে দুটি ভাত না পড়লেই নয়। আফজল হোসেন ঠিকই বলেছিল, ভরপেট ভাত না খেলে রাস্তার ধকল সইবার মতো শক্তি থাকবে না।
হরিন্দর পেতে-দেওয়া সুজনির ওপর কখন ঝিনুক ঘুমিয়ে পড়েছিল, বিনু লক্ষ করেনি। সে হরিন্দকে বলল, তুমি এর দিকে নজর রেখো। আমি একটু ঘুরে আসছি। বলে ঝিনুককে দেখিয়ে দিল।
হরিন্দ বলে, আপনে নিচ্চিন্ত মনে যান ছুটোবাবু। বৌঠাইনরে আমি দেখুম।
ঢালু ঘাসের জমি থেকে উঁচু রাস্তায় উঠেই ফের নিচে নেমে আসে বিনু। হরিন্দদের খাওয়ার কী ব্যবস্থা হয়েছে তার জানা নেই। তারা পাশে বসে হোটেলের ভাত-তরকারি খাবে, আর ওরা খালি পেটে মুখ শুকনো করে থাকবে, তা হয় না।
বিনু জিজ্ঞেস করে, দুপুরে তোমরা কী খাবে?
হরিন্দ জানায়, আমাগো লগে দুই দিনের মতো চিড়ামুড়ি, মুছি গুড় আর কদমা আছে। হেয়াই খামু।
চিঁড়ে গুড় থাক। আমি হোটেলে ভাত আনতে যাচ্ছি। তোমরা আমাদের সঙ্গে ভাত খাবে।
আমাগো লেইগা আবার এতগুলা পয়সা খরচা করবেন!
বিনু একটু হাসল।
হরিন্দ কী ভেবে এবার বলে, আইচ্ছা, খাওয়াইতে যহন মন অইছে তহন খাওয়ান। কবে আবার প্যাটে দু’গা ভাত পড়ব হের (তার) তো দিশা নাই। আপনে অ্যাত মাইনষের ভাত ক্যামনে আনবেন? লন (চলুন), আমিও লগে যাই–
ঝিনুকের দেখাশোনার দায়িত্ব নিজের স্ত্রী আর ছেলেমেয়েদের ওপর দিয়ে বিনুর সঙ্গে রাস্তায় উঠে আসে হরিন্দ।
চারপাশে ভয়কাতর মানুষের জটলা। তার ভেতর দিয়ে দু’জনে এগিয়ে চলে। যেখানে হোটেলগুলো সারিবদ্ধ দাঁড়িয়ে আছে, কঁচা সড়কটা সেই জায়গায় বাঁক নিয়ে ডান পাশে ঘুরে অনেক দূর চলে গেছে।
