বিনু জিজ্ঞেস করল, কলকাতায় তো যাচ্ছ। সেখানে তোমাদের আত্মীয়স্বজন কেউ আছে?
কাগা বগার ভয়াবহ মৃত্যুর খবর দিতে গিয়ে শোকাতুর হয়ে পড়েছিল হরিন্দ। সেই ভাবটা খানিক কাটিয়ে বলল, না, কেও নাই।
সেখানে গিয়ে কোথায় উঠবে ঠিক করেছ?
না। আগে কি কুনোদিন কইলকাতায় গ্যাছি যে হেইখানের হগল জাগা (জায়গা) চিনুম? ফরিদপুর আর ঢাকার জিলার বাইরে দুই চাইর বার খালি ঢেড়া দেওন আর পূজার ঢাক বাজানের বায়না লইয়া কুমিল্লা আর শিলটে গেছিলাম।
ফরিদপুর জেলার চৌহদ্দি পেরিয়ে কচিৎ কখনও যার দৌড় জল-বাংলার কয়েকটা জেলা পর্যন্ত, সে ছেলেমেয়ে বউ নিয়ে কলকাতায় কোথায় গিয়ে মাথা গুঁজবে, কী করে পেটের ভাত জোটাবে, ভাবতেও দিশেহারা বোধ করল বিনু।
হরিন্দ ফের বলে, লাখে লাখে মানুষ দ্যাশ ছাইড়া ইন্ডিয়ায় যাইতে আছে গিয়া। হেগো (তাদের) হগলের কি বডারের উই পারে ভাই বন্দু আত্মজন আছে? খবর লইয়া দ্যাখেন, লাখে দশজনেরও নাই।
হরিন্দ ঠিক কী বোঝাতে চাইছে, বিনু ধরতে পারে না। সে তাকিয়ে থাকে।
হরিন্দ বলে, উই মানুষগুলানের যা হইব, আমাগোও হেয়াই (তাই) হইব। ভিটা ছাইড়া যহন আসছি, পিছের দিকে আর তাকামু না। দ্যাশের লগে সম্পক্ক চুইকা (চুকে) গ্যাছে ছুটোবাবু। একটু থেমে ফের বলল, ইন্ডিয়ায় একবার যাইতে পারলে বাইচা থাকনের এট্টা না এট্টা বন্দবস্ত ঠিক হইয়া যাইব।
লোকটা চূড়ান্ত আশাবাদী। তার ধারণা, সীমান্তের ওপারে একবার পৌঁছতে পারলে সব সমস্যার যাবতীয় সুরাহা হয়ে যাবে। সেখানে রোজগারের একটা ফিকির, মাথা গোঁজার একটুকরো জায়গা নিশ্চয়ই মিলবে। কিন্তু লোকটা পালা-পার্বণে ঢাক বাজানো আর হাটেগঞ্জে ঢেঁড়া দেওয়া ছাড়া অন্য কোনও কাজ শিখেছে বলে জানা নেই বিনুর। অবশ্য তার কয়েক কানি ধানী জমি ছিল।
ভারত এক বিশাল দেশ। দু’চার শ’ কি পাঁচ দশ হাজার মানুষ যদি পাকিস্তান থেকে সেখানে চলে যায় তাদের কোনও রকম একটা ব্যবস্থা হয়ে যেতে পারে। কিন্তু লক্ষ লক্ষ মানুষের ঢল যেখানে নেমেছে তাদের সবার জন্য কিছু করা, ভারতের মতো একটা বড় দেশের পক্ষেও কতটা সম্ভব, সে সম্বন্ধে বিনু যথেষ্ট সন্দিহান। বিশেষ করে হরিন্দর মতো লেখাপড়া না-জানা মানুষ, পুরুষানুক্রমে যে শুধু ঢাক বাজিয়ে আসছে, ইন্ডিয়ায় গিয়ে সে কী করবে, ছেলেমেয়ে বউ নিয়ে কোথায় থাকবে, কী খাবে, কে জানে। অবশ্য একটা কথা সে ঠিকই বলেছে, সীমান্তের ওপারে গিয়ে অগুনতি ছিন্নমূল মানুষের যা হবে, সেটাই মেনে নেবে সে।
হরিন্দ এবার বলে, ইন্ডিয়ায় গিয়া যদিন মরতেও হয়, তাও সই। দিন রাইত বুকের ভিতরে ডর লইয়া এইখানে থাকন যায় না।
বিনু উত্তর দেয় না।
হরিন্দ কী ভেবে এবার বলে, কইলকাতায় গিয়া আপনেরা কই উঠবেন ছুটোবাবু? কিছু ঠিক করছেন?
বিনু জানায়, ওই শহরে তার বাবা এবং দিদিরা আছে। ওদের সবাইকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। জবাব অবশ্য পাওয়া যায়নি। এমনও হতে পারে, চিঠিগুলো ওদের কাছে পৌঁছয়নি। না-ও যদি পৌঁছয়, ঠিকানা জানা আছে। শিয়ালদায় নেমে ঠিক চলে যেতে পারবে।
হরিন্দ বলে, আপনের তাইলে কুনো চিন্তা নাই। খালি বডারখান পার হইলেই নিচ্চিন্তি। .
তারপাশা পর্যন্ত আসা গেছে। তার মধ্যে কত কী-ই তো ঘটে গেল। তারপাশা থেকে ইন্ডিয়ার বর্ডার পর্যন্ত কতখানি নিরাপদ, জানা নেই। হয়তো নির্বিঘ্নেই তারা সীমান্তে পৌঁছে যাবে, কিংবা অঘটনও কিছু ঘটতে পারে। যতক্ষণ না বর্ডার পেরিয়ে ওপারে পা রাখছে, উৎকণ্ঠা কাটবে না। তবে একটা আশার কথা, আফজল হোসেনদের মতো মানুষ এখনও রয়েছে। যদি খারাপ কিছু ঘটে, ত্রাণকর্তা হিসেবে তেমন কাউকে কি পাওয়া যাবে না?
অনেকক্ষণ ধরে একটা চাপা কান্নার আওয়াজ কানে আসছিল। একটানা খানিকটা চলার পর সেটা থামে, আবার নতুন করে শুরু হয়।
হরিন্দর সঙ্গে কথা বলতে বলতে আগে ততটা খেয়াল করেনি বিনু। এবার শব্দের উৎসটা খুঁজতে লাগল সে। নদীপাড়ের নাবাল জমিতে, খানিকটা দূরে, মধ্যবয়সী একটা লোক স্ত্রী এবং চার পাঁচটি ছেলেমেয়ে নিয়ে বসে আছে। শুষ্ক, দড়ি-পাকানো চেহারা লোকটার। পরনে খাটো ময়লা ধুতি আর আধছেঁড়া নিমা। মেয়েগুলোর গায়ে শস্তা, রং-জুলা নোংরা ফ্রক বা শাড়ি। ছেলেরা পরেছে পুরনো ইজের আর জামা। এই স্টিমারঘাটে দেশ ছেড়ে চলে যাওয়া মানুষগুলোর সকলেই ভয়ার্ত, উৎকণ্ঠিত। কিন্তু ওই পরিবারটার আতঙ্কের যেন সীমাপরিসীমা নেই।
আধবুড়ো লোকটার স্ত্রীর কপাল পর্যন্ত ঘোমটায় ঢাকা। মুখে শাড়ির আঁচল গোঁজা, শীর্ণ গাল বেয়ে অবিরল জল ঝরছে। সমানে কাঁদছে সে। মুখে কাপড় ঠেসে ধরে রাখায় শব্দটা ক্ষীণ হয়ে বেরিয়ে আসছে।
বিনু একদৃষ্টে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে। তারপর হরিন্দর দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করে, কী হয়েছে? অত কাঁদছে কেন?
হরিন্দ বিনুর কানের কাছে মুখ এনে বিমর্ষ সুরে বলে, অগো (ওদের) সব্বনাশ হইয়া গ্যাছে।
বিনু চমকে ওঠে, কিরকম?
আমরা ইস্টিমারঘাটায় আসনের আগে অরা এইখানে আসছে। তহন থিকাই মাইয়ামানুষটা কাতে আছে (কাঁদছে)।
তুমি ওদের চেনো নাকি?
না। এইখানেই পেরথম দেখলাম। শুনাশুন যা কানে আইছে, আপনেরে কই।
খুব নিচু গলায় হরিন্দ বলে যায়। যে মেয়েমানুষটি কাঁদছে তার স্বামীর নাম হরিদাস সাহা। ওদের বাড়ি নয়া চিকন্দি গ্রামে। দেশভাগের আগে এবং পরেও ওদের ওই এলাকাটা ছিল বেশ শান্ত। আবহমান কাল যেভাবে চলছিল, হুবহু সেইভাবেই দিন কেটে যাচ্ছিল। কোনও রকম বিঘ্ন দেখা দেয়নি। পাকিস্তানের আর যেখানে যাই ঘটুক, নয়া চিকন্দি ছিল শান্তির দ্বীপ। বাইরের আঁচ সেখানে এসে লাগেনি।
