বিনু আস্তে আস্তে মাথা নাড়ে, অস্পষ্টভাবে কিছু বলে। এতে যা বোঝার বুঝে নিক হরিন্দ। হরিন্দ আর কিছু জিজ্ঞেস করে না। বলে, খাড়ইয়া ক্যান? আপনেরা এইখানে আইসা বসেন। তারপর কী খেয়াল হতে জিজ্ঞেস করে, লগে মালপত্তর কই?
তাদের সমস্ত কিছু যে খোয়া গেছে, তা জানালে হাজারটা প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। বিনু বলল, কিছু আনিনি।
হরিন্দ তাদের পাটির মোড়ক খুলে একটা পুরনো রং-জ্বলা সুজনি পেতে দিল। সঙ্গে সঙ্গে বিনু আর ঝিনুক বসে পড়ে। সমস্ত রাত না ঘুমিয়ে চোখ জ্বালা করছিল ঝিনুকের। সে বলে, আমি বসে থাকতে পারব না। মাথায় ভীষণ যন্ত্রণা হচ্ছে।
বিনু বলল, শুয়ে পড়।
তক্ষুনি সুজনির ওপর শরীর ছেড়ে দেয় ঝিনুক। সঙ্গে সঙ্গে তার চোখ বুজে আসে।
কিছুক্ষণ কৃশ, রুণ সঙ্গিনীর দিকে তাকিয়ে থাকে বিনু। বুকের ভেতরটা আবেগে মায়ায় উদ্বেল হয়ে ওঠে। পলকা, দুর্বল শরীর ঝিনুকের। পথের যাবতীয় ক্লেশ সয়ে শেষ পর্যন্ত কলকাতায় পৌঁছতে পারবে কি সে?
একসময় মুখ ফিরিয়ে হরিন্দর দিকে তাকায় বিনু। হরিন্দ জিজ্ঞেস করে, তারপাশায় কবে আসছেন ছুটোবাবু?
বিনু বলে, এই খানিকক্ষণ আগে। তোমরা কবে এসেছ?
দুই দিন পার হইয়া গ্যাছে–
দু’দিনে স্টিমারে উঠতে পার নি?
ক্যামনে উঠুম! এক ইস্টিমারে চাইর পাঁচ শ’ মানুষ ধরে। সুমখের দিকে তাকাইয়া দ্যাখেন, হাজারে হাজারে বইসা রইছে। তাগো ঠেইলা ইস্টিমারে ওঠন যায়!
আস্তে আস্তে মাথা নাড়ে বিনু। তারপাশায় পা রাখার পর থেকে এই চিন্তাটাই তার মাথাতেও ভর করে আছে।
হঠাৎ বিনুর মনে পড়ল, হরিন্দদের বাড়ি ফরিদপুরে। সে এতদুরে তারপাশায় এল কী করে? তার তো অন্য দিক দিয়ে কলকাতায় চলে যাবার কথা। এসব জিজ্ঞেস করায় হরি বলল, তাদের ফরিদপুরে ভীষণ রায়ট চলছে। ভয়ে কদিন আগে রাজদিয়ার কাছাকাছি সিরাজদীঘায় এক দূর সম্পর্কের আত্মীয়র বাড়ি চলে এসেছিল। সেখানেও থাকা গেল না।
একটু চুপচাপ।
তারপর হরিন্দ ফের বলে, আপনেরা দুইজনে যাইতে আছেন। হ্যামকত্তা কইলকাতায় যাইব না?
বিনু বলে, না। দেশ ছেড়ে দাদু কোথাও যাবেন না।
হরিন্দ বলে, আইজ কইতে আছে দ্যাশ ছাড়ব না। তয় একখান কথা কই, পাকিস্থানে কেও থাকতে পারব না। বেবাকরে আসামে, নাইলে কইলকাতায় চইলা যাইতে হইব। একটু থেমে বিষণ্ণ মুখে ফের বলে, আমাগোও কি বাপ-ঠাউরদার ভিটা ছাইড়া যাওনের ইচ্ছা আছিল? ফরিদপুরে, আমাগো উইখানে কী যে চলতে আছে, ভাবতে পারবেন না। আমার কথাই ধরেন, সাত কানি ধানী জমিন আছিল। দুই বচ্ছর ধইরা ধান পাকলে কাইটা লইয়া যাইতে আছে। নিজেগো গাছের ফলপাকড়ে হাত ঠেকানের উপায় নাই। চৌখের সুমুখ দিয়া পাইড়া লইয়া যায়। ঘরে একদানা ধান নাই, তভু ভিটার টানে মুখ গুইজা পইড়া আছিলাম। গলার স্বর নামিয়ে, অদূরে বসে থাকা যুবতীটিকে দেখিয়ে ভয়ার্ত সুরে বলে যায়, কয়দিন আগে দুফার বেইলে আমার উই মাইয়াটার হাত ধইরা যহন টান দিল, ঠিক কইরা ফেলাইলাম, আর এই দ্যাশে না। কপালে যা হয় হউক, দ্যাশ ছাড়ুম। নাইলে মাইয়াটারে কুন দিন কাইড়া লইয়া যাইব। হেরপর আইলাম সিরাজদীঘায়। অহন কইলকাতায় পাড়ি দিমু।
বিনু লক্ষ করল, ভাঙাচোরা বিধ্বস্ত দেখাচ্ছে হরিন্দকে। মনে হয়, দুঃস্বপ্নের ঘোরে রয়েছে লোকটা। তাকে কী বলবে, ভেবে পায় না সে।
হরিন্দ ফের বলে, আমাগো উইদিকে কত মানুষ যে খুন হইছে, কত যুবুতী মাইয়ারে যে জোর কইরা টাইনা লাইয়া গ্যাছে হের ল্যাখাজোখা নাই। এই অবোস্তায় কি থাকন যায়? কাগা বগারে মনে আছে ছুটোবাবু?
হরিন্দর সঙ্গে হাটে হাটে ঢেঁড়া দিয়ে বেড়াত তার দুই সঙ্গী, অর্থাৎ কাগা আর বগা। কত বার তাদের দেখেছে বিনু। রাজদিয়ায় হেমনাথের বাড়িতে হরিন্দর সঙ্গে দু’একবার ওরাও এসেছে। এই তো সেদিনের কথা। বিনুর স্মৃতিশক্তি এত দুর্বল নয় যে ওদের ভুলে যাবে। বলল, নিশ্চয়ই আছে। কী হয়েছে তাদের?
হরি জানায়, কাগা বাগা আপন মায়ের পেটের ভাই। ফরিদপুরে হরিন্দর বাড়ির প্রায় লাগোয়া ওদের বাড়ি। দুই ভাইয়ের কিছু জমিজমা ছিল। হরিন্দর মতো ওদেরও পাকা ধান জোর করে কেটে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে দু’বছর ধরে। এবার ওরা রুখে দাঁড়িয়েছিল। কোনও মতেই ধান দেবে না। তার ফলে ওদের কুপিয়ে মারা হয়।
বলতে বলতে অবরুদ্ধ কান্না বুকের ভেতর থেকে ঠেলে বেরিয়ে আসতে থাকে হরিন্দর। ঝাঁপসা গলায় সে বলে, কত কাল আমরা একলগে আছিলাম!
হরিন্দর কষ্টটা বিনুর মধ্যেও যেন চারিয়ে যায়। কাগা বগা ছিল সরল, ভালমানুষ, কারোর সাতে পাঁচে থাকত না। এমন দু’জনের শোচনীয় মৃত্যু তাকে আমূল নাড়া দিয়ে যায়। বিনু বলে, ওদের স্ত্রী আর ছেলেমেয়েরা?
হরি বলে হগলে জাওনার (জানোয়ার) হইয়া যায় নাই। আমাগো গেরামের শায়েদ মিঞা এট্টা সত্যকারের মানুষ। হে (সে) পরানের ঝুঁকি লইয়া কাগা বগার বউ আর পোলামাইয়াগো রাইতের আন্ধারে কয়দিন আগে তিপুরার (ত্রিপুরার) বডারে পৌঁছাইয়া দিয়া আইছে।
বেলা আরেকটু চড়েছে। সূর্য আরও খানিকটা ওপরে উঠে এসেছে। যতদূর চোখ যায়, পরিষ্কার নীলাকাশ। একোণে ওকোণে দু’এক টুকরো সাদা মেঘ হেমন্তের বাতাসে দোল খেতে খেতে ভেসে চলেছে–মন্থর, লক্ষ্যহীন। অনেক উঁচুতে আকাশের নীল ছুঁয়ে ডানা মেলে স্থির হয়ে আছে আগুনতি শঙ্খচিল। তাদের কোথাও যাবার যেন তাড়া নেই, এমনই গা-এলানো ভঙ্গি। নিচে নদীর জলে রোদ সোনা ঢেলে দিচ্ছে।
