একটানা পুরো একটি রাত এবং একটি দিনের ধকলে শরীর ভেঙে আসছিল আফজল হোসেনের। রাত জাগার কারণে চোখ টকটকে লাল, কপালের দু’পাশের শিরা দপ দপ করছে। বয়স তো কম হয়নি।
আফজল হোসেন বিনুর দু’হাত জড়িয়ে ধরে বলল, আপনেগো ইস্টিমারে তুইলা দিয়া যাইতে পারলে শান্তি পাইতাম। কিন্তুক–
সে কী বলতে চায়, বুঝতে পারছিল বিনু। তাদের স্টিমার ধরাতে হলে দু’চারদিন হয়তো তারপাশায় থেকে যেতে হবে আফজল হোসেনকে। কিন্তু সেটা তো সম্ভব নয়।
বিনু বলল, চিন্তা করবেন না, আমরা ঠিক স্টিমার ধরতে পারব। আপনি বাড়ি গিয়ে ভাল করে বিশ্রাম করুন।
বিমর্ষ মুখে আফজল হোসেন বলল, কী আর করন, যাই তাইলে (তা হলে)। ধীরে ধীরে মুঠো খুলে বিনুর হাত ছেড়ে দেয় সে। বলতে থাকে, যদিন পারেন কইলকাতায় গিয়া চিঠি লেইখা পৌঁছ সম্বাদটা দিয়েন। তাইলে নিচ্চিন্ত হমু। আমাগো গেরামের নাম তো জানেনই। মামুদপুর, বিক্রমপুর। জিলা ঢাকা। এই লেইখা দিলেই হইব। একটু ভেবে ফের বলে, জানি না, বডারের (বর্ডারের) উই পার থিকা চিঠিপত্তর এই ধারে আসে কিনা–
কে বলবে, আফজল হোসেন নামে এই লোকটার সঙ্গে মাত্র চব্বিশ ঘন্টা আগে এক সংকটের মুহূর্তে তার আলাপ। আপ্লুত, অভিভূত বিনু বলে, নিশ্চয়ই লিখব।
আফজল হোসেন আর দাঁড়ায় না, ভিড়ের ভেতর দিয়ে নৌকোঘাটের ওধারে যেখানে হামিদদের নৌকোটা বাঁধা আছে, ক্লান্ত পা ফেলে ফেলে সেদিকে চলে যায়।
আমরাও যাই ছুটোবাবু–রাজেক আর তমিজও চলে যায়। তারা ‘গয়নার নাও’ ধরে রাজদিয়া ফিরে যাবে। কিন্তু কয়েক পা গিয়ে ফিরে আসে রাজেক। বলে, মামুদপুরের এই মিঞাছাবের লাখান মানুষ আমি আর দেখি নাই ছুটোবাবু। ফেরেশতা (দেবদূত), ফেরশতা– বলেই ভিড়ের মধ্যে মিশে যায়।
ঠিক একই কথা ভাবছিল বিনু। রাজদিয়ার লারমোর সাহেবকে বাদ দিলে আফজল হোসেনের মতো আর কাউকে কখনও দেখেনি। আমৃত্যু এই মানুষটাকে মনে করে রাখবে সে।
জনসমুদ্রে যতক্ষণ না আফজল হোসেন বিলীন হয়ে যায়, তার দিকে তাকিয়ে থাকে বিনু।
.
৩.০৮
পাশেই ছিল ঝিনুক। বলল, আমি আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছি না। কোমর থেকে পা পর্যন্ত ছিঁড়ে পড়ছে।
দুর্বল শরীরে এতক্ষণ যে দাঁড়িয়ে আছে, সেটা ঝিনুকের পক্ষে ভীষণ কষ্টকর। ব্যস্তভাবে এধারে ওধারে তাকায় বিনু। একটু ফাঁকা জায়গা পেলে ঝিনুককে বসাবে, নিজেও বসবে।
হঠাৎ একটা গলা কানে এল, ছুটোবাবু না?
কণ্ঠস্বর চেনা চেনা, কিন্তু কোথায় শুনেছে মনে করতে পারল না বিনু।
ফের শোনা গেল, এই যে, এইখানে–
এবার চোখে পড়ল। সড়কের ডান পাশে ঘাসে-ভরা নাবাল জায়গায় আরও অনেকের সঙ্গে বসে আছে হরিন্দ। তার গা ঘেঁষে একটি পনের ষোল বছরের সদ্য যুবতী এবং দু’টো ছেলে। এক ছেলের বয়স এগার বার, অন্যটার সাত আট। আর রয়েছে কপাল পর্যন্ত ঘোমটা টানা আধবয়সী সধবা একটি মেয়েমানুষ–খুব সম্ভব হরিন্দর স্ত্রী। ওদের সঙ্গে কিছু লটবহরও রয়েছে। একটা ঢাক, পুরনো টিনের। বাক্স, আধছেঁড়া পাটি দিয়ে জড়ানো বালিশ, কাঁথা, বিছানার চাদর আর ছোটখাটো দু’চারটে পুঁটলি।
হরিন্দকে বিনু প্রথম দেখেছিল সুজনগঞ্জের হাটে। কোন এক জমিদার সম্বন্ধে নাকি রটে গিয়েছিল, সে আপাদমস্তক স্ত্রৈণ, স্ত্রীর এমনই বশীভূত যে স্ত্রী যদি বলে সুর্য পশ্চিম দিকে উঠে পুবে অস্ত যায়, লোকটা নাকি ঘাড় কাত করে তক্ষুনি তাতে সায় দেয়। রটনাটা যে আগাগোড়া মিথ্যে, তা প্রমাণ করার জন্য জমিদার হরিন্দকে সুজনগঞ্জে পাঠিয়েছিল। হরিন্দ ওখানকার বিষহরিতলার পাশের মাঠে ঢেঁড়া পিটিয়ে হাটের লোকজন জড়ো করে জানিয়ে দিয়েছিল, সেই জমিদারবাবুটি স্ত্রৈণ নয়।
এতদিন পর, অসীম উৎকণ্ঠায় যখন তার মন ভরে আছে, সুজনগঞ্জের হাটের সেই দৃশ্যটা চোখের সামনে ভেসে উঠতে হাসি পেল।
দ্বিতীয় বার হরিন্দকে ওই সুজনগঞ্জের হাটেই দেখা গিয়েছিল। তখন যুদ্ধ চলছে। কয়েকজন হোমরা চোমরা অফিসারকে নিয়ে এস ডি ও সাহেব, ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব ওয়ারের জন্য সোলজার রিক্রুট করতে এসেছিলেন। সেবারও তোক জোটাবার কাজে হরিন্দকে লাগানো হয়েছিল। ঢেঁড়া পিটিয়ে সারা হাটটা বিষহরিতলার পাশের মাঠে টেনে এনেছিল সে।
এরপর বারকয়েক হরিন্দর সঙ্গে দেখা হয়েছে। দু’চারবার তাদের রাজদিয়ার বাড়িতেও এসেছে সে। ভাটির দেশে না কোথায় তার বাড়ি, মনে পড়ছে না বিনুর। পালা পার্বণে ঢাক বাজানো ছাড়া, হাটে হাটে ঘুরে চেঁড়া দিয়ে বেড়াত সে।
বিনু লক্ষ করল, হরিন্দর চোখের নিচে কালি, গাল ভাঙা, একমুখ খাড়া খাড়া দাড়ি, কণ্ঠার হাড় চামড়া কুঁড়ে বেরিয়ে এসেছে। ছেলেমেয়েগুলোর চেহারা শীর্ণ, চাউনি ভয়কাতর। একটা অদৃশ্য আতঙ্ক যেন তাদের তাড়া করছে।
চেনা লোক দেখে একটু ভরসা পায় বিনু। ঝিনুককে সঙ্গে করে হরিন্দদের কাছে চলে আসে।
হরি বলে, কইলকাতায় চলছেন?
হ্যাঁ। আস্তে মাথা নাড়ে বিনু। প্রশ্নটা অনাব্যশক, তবু জিজ্ঞেস করে, তোমরাও যাচ্ছ?
হ– বুক তোলপাড় করে দীর্ঘশ্বাস পড়ে হরিন্দর। সে বলে, দ্যাশের আর আশা নাই ছুটোবাবু। কইলকাতায় গ্যালে পরানটা যদিন বাঁচান যায়– ঝিনুকের দিকে তাকিয়ে জানতে চায়, লগে কেঠা (কে)? বৌঠাইন নিকি?
আফজল হোসেনও ঝিনুককে তার স্ত্রী ভেবেছিল। ঝিনুক তার জীবনের সর্বস্ব, শ্বাসবায়ুর মতো অপরিহার্য। কিন্তু এটা তো ঠিক, তাদের বিয়ে হয়নি। একটি অনাত্মীয়, অবিবাহিত তরুণীকে এক যুবক সঙ্গে নিয়ে চলেছে, দেশজোড়া সন্ত্রাসের আবাহাওয়াতেও তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে, এসব আগে মাথায় আসে নি বিনুর।
