এই ঘরেই খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা হল। হাসেম আলি, মজিদ মিঞা এবং মাঝি দু’জনের জন্য আসন পাতা হয়েছে। হেমনাথ হঠাৎ বললেন, আমাকেও এখানে ওদের সঙ্গে দিয়ে দাও, বড্ড খিদে পেয়ে গেছে।
অবনীমোহন বিস্মিত, চমকৃত। উনিশ শ’ চল্লিশে ব্রাহ্মণ-শূদ্র-বৈশ্য-হিন্দু-মুসলমান ইত্যাদি ইত্যাদি নানা ভাগে, অগণিত ছোট ছোট স্পর্শকাতর কুঠুরিতে বসুন্ধরা যখন খণ্ড খণ্ড হয়ে আছে তখন মজিদ মিঞা হাসেম আলির গা ঘেঁষে খেতে বসা দুঃসাহস বৈকি।
হেমনাথ বললেন, অবনীমোহনও বসে যাও না। মিতাই তো হলে মজিদের, একসঙ্গে খেতে বসে বন্ধুত্বতা পাকা করে নাও।
ঘোরের ভেতর থেকে অবনীমোহন বললেন, বেশ তো–
অতএব আরও তিনখানা আসন এল। হেমনাথ বসলেন, অবনীমোহন বসলেন, বিনুও বসল। মেয়েরা অবশ্য কেউ বসল না।
খাওয়াদাওয়ার পর মাঝরাত্তিরে পুকুর পেরিয়ে ধানখেতের ওপর দিয়ে কেতুগঞ্জ চলে গেল মজিদ মিঞা।
বিকেলবেলা ভবতোষ গাঢ় বিষাদের ছায়া নিয়ে এসেছিলেন। মেঘের পর রৌদ্রঝলকের মতো মজিদ মিঞা এ বাড়িটাকে আবার আলোকিত করে গেছে।
১.০৭ ঘুমটা ভাঙে নি
ভোরবেলা, তখনও ভাল করে ঘুমটা ভাঙে নি, আধো তরল তন্দ্রার ভেতর আছন্ন হয়ে আছে বিনু। সেই সময় স্তবপাঠের মতো একটানা সুরেলা আওয়াজ ভেসে এল।
কণ্ঠস্বরটা খুবই চেনা, কিন্তু কোথায় শুনেছে এই মুহূর্তে মনে করতে পারল না বিনু। সুরটা খুব ভাল লাগছে। আস্তে আস্তে চোখ মেলল সে।
এখনও রোদ ওঠে নি। চারদিক আবছা আবছা অন্ধকার আলতোভাবে সব কিছুকে ছুঁয়ে আছে।
সময়টা দিনের কোন অংশ–ভোর না সন্ধে, ঠিক বুঝতে পারল না বিনু। পাশ ফিরতেই বড় একটা জানালা চোখে পড়ল। তার ভেতর দিয়ে উঠোন দেখতে পেল বিনু। উঠোন পেরিয়ে বাগান, বাগানের পর যা কিছু এই মুহূর্তে সমস্ত ঝাঁপসা, নিরবয়ব। উত্তর থেকে দক্ষিণ থেকে জোর বাতাস দিচ্ছে, উলটোপালটা হাওয়ায় বাগানের বড় বড় ঝুপসি গাছগুলো বিজ্ঞের মতো মাথা নাড়াচ্ছে। আকাশের এ প্রান্তে সে প্রান্তে থোকা থোকা সাদা মেঘ রাজহাঁসের মত ধীর মন্থর গতিতে ভেসে চলেছে।
প্রথমটা বিনু বুঝেই উঠতে পারল না, সে এখন কোথায়। কলকাতায় যে বাড়িতে তারা থাকত তার পাশেই ছিল বড় বড় বাড়ি আর কিছু ঘিঞ্জি বস্তি। বস্তিগুলোর মাথায় টালি আর খাপরার ছাউনি। সকালবেলা চোখ মেললেই বিনুরা দেখতে পেত, বস্তিগুলো নিশ্চল ঢেউয়ের মতো দিগ্বিদিকে ছড়িয়ে আছে। আর কানে আসত কদর্য চিৎকার। ভোর হতে না হতেই কুৎসিত কলহ শুরু হয়ে যেত, তার মেয়াদ মাঝরাত পর্যন্ত।
কিন্তু এখানে? স্তবপাঠের সেই মনোরম সুরেলা শব্দটা এখনও কানে আসছে। বিনুর মনে হল, এসব সত্যি নয়। কেউ যেন ঘুমঘোরে তাকে সুদুর মেঘময় আকাশের নিচে বাগান, গাছপালা, আবছা অন্ধকার আর স্তব উচ্চারণে গম্ভীর মধুর সুরের ভেতর ফেলে দিয়ে গেছে।
চিরদিন মা-বাবার কাছে শোবার অভ্যাস বিনুর। হঠাৎ তার খেয়াল হল, বিছানায় মাও নেই, বাবাও নেই। ধড়মড় করে উঠে বসল বিনু। তক্ষুনি চোখে পড়ে গেল, উঠোনের পুব দিকটা একেবারে খোলা, সেখানে যুক্তকরে দাঁড়িয়ে তন্ময় হয়ে স্তব পাঠ করছেন হেমনাথ। ‘জবাসকুসুম সঙ্কাশ’ ‘মহাদ্যুতিম’, দিবাকরম’ ইত্যাদি দু’চারটে শব্দ ছাড়া আর কিছুই বোঝা যাচ্ছে না।
হেমনাথকে দেখামাত্র বিদ্যুৎচমকের মতো সব মনে পড়ে গেল। কাল তারা রাজদিয়া এসেছে। স্নেহলতা-শিবানী যুগল-হিরণ-মজিদ মিঞা-পর পর অনেকগুলো মুখ ছবির মতো চোখের সামনে দিয়ে ভেসে গেল। আর মনে পড়ল ঝিনুককে। দুঃখী মেয়েটার জন্য এক মুহূর্ত মনটা ভারী হয়ে রইল। এক মুহূর্ত। নদীর জলে উড়ন্ত পাখির ছায়ার মতো ঝিনুকের মুখ মনে পড়েই মিলিয়ে গেল।
আরও একটা কথা মনে পড়ল বিনুর। কাল রাত্রিতে সে দাদুর কাছে শুয়েছিল। যাই হোক, এখন কী করবে ভেবে উঠতে পারল না। একবার ইচ্ছে হল, হেমনাথের কাছে যায়। পরক্ষণেই মনে হল, এ সময় তাকে বিরক্ত করা ঠিক হবে না।
শরতের এই ভোরের হাওয়া বেশ ঠান্ডা, গায়ে কাঁটা দিচ্ছে। পায়ের দিকে পাট করা একটা পাতলা চাদর ছিল, সেটা তুলে এনে সর্বাঙ্গে জড়িয়ে বসে রইল বিনু।
একটু পর স্তবপাঠ শেষ হল। পুব দিকে তাকিয়ে আসন্ন সূর্যোদয়ের উদ্দেশে প্রণাম করে ফিরে এলেন হেমনাথ। বিনুকে বসে থাকতে দেখে ভারি খুশি। উচ্ছ্বসিত সুরে বললেন, দাদাভাই উঠে পড়েছ?
বিনু মাথা নাড়ল।
তুমি তো বেশ তাড়াতাড়ি ওঠো।
এত ভোরে অবশ্য কোনওদিনই ওঠে না বিনু। যেহেতু তাড়াতাড়ি ওঠাটা রীতিমতো গৌরবের ব্যাপার, আর হেমনাথ যখন উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠেছেন, তখন এটা মেনে নেওয়া ভাল। বিনু এবারও মাথা নাড়ল। তারপর বলল, তুমি গানের মতো করে কী বলছিলে?
সূর্যস্তব করছিলাম।
ভারি সুন্দর তো।
সাগ্রহে হেমনাথ বললেন, তুমি শিখবে?
বিনু বলল, শিখব।
কাল থেকে এইরকম ভোরে উঠো, দু’জনে উঠোনের ওই কোণটায় গিয়ে দাঁড়াব। তুমি আমার সঙ্গে সঙ্গে বলে যাবে। দু’দিনেই শিখে ফেলতে পারবে।
আচ্ছা– বলেই যেন জিভে কামড় খেল বিনু। আজকের মতো দু’একদিন নয়, কাল থেকে আবার রোজ নিয়মিত ভোরবেলায় উঠতে হবে। ঝোঁকের মাথায় রাজি হয়ে কী বিপদেই না পড়া গেল!
হেমনাথ বললেন, যাও দাদা, মুখ টুখ ধুয়ে নাও।
চাদর গায়ে বেরিয়ে এল বিনু। এর মধ্যে আলো ফুটে গেছে। ধানখেত আর বনানীর ওপারে দূর দিগন্তে সূর্যের ঝিকিমিকি টোপরটি আস্তে আস্তে দেখা দিতে শুরু করেছে।
