মিঠাই আর চিড়ে মুড়ির দোকানগুলো হিন্দুদের। তারা এখনও দেশ ছেড়ে চলে যায় নি।
চিড়ে আর কলা কিনে সবাইকে নিয়ে একটা মিঠাইয়ের দোকানে ঢুকল আফজল হোসেন। দোকানদারের কাছ থেকে সবার জন্য একটা করে কঁধা-উঁচু কাঁসার বগি থালা চেয়ে নিল সে। তারপর দই চিড়ে মেখে খাওয়া শুরু করল। চিড়ে দুই কলার পর দু’টো করে ক্ষীরমোহন।
চিড়ে এবং কলার দাম দিতে চেয়েছিল বিনু। আফজল হোসেনের প্রবল আপত্তিতে দিতে পারেনি। লোকটা দই মিষ্টির দামও দিতে দিল না। বলল, দামের কথা মুখে আইনেন না। নিজের বাড়ি নিয়া ভাল কইরা দু’গা (দুটি) খাওয়াইতে পারি নাই। বড় আপসোস। দিনকাল যে কী খারাপ হইয়া গ্যাছে!
মামুদপুর গ্রামে নিয়ে যাবার পর বিনুদের লুকিয়ে রাখতে হয়েছে, অত কাছে গিয়েও নিজেদের বাড়িতে নিয়ে যত্ন করতে পারে নি, এই কথা আরও কয়েক বার শুনিয়েছে আফজল হোসেন। তারপাশায় দই চিড়ের ফলার খাইয়ে তার আক্ষেপ হয়তো কিছুটা মেটাতে চাইছে।
একটু নীরবতা।
তারপর আফজল হোসেন হামিদদের বলল, তোমরা নাওয়ে গিয়া বসো, আমি এনাগো (এঁদের) জেটিঘাটায় পৌঁছাইয়া দিয়া আসি। তোমাগো লগেই আমি গেরামে ফিরুম। বলে বিনুদের দেখিয়ে দিল।
হামিদরা চলে গেল।
বিনু ব্যস্তভাবে বলল, ওদের নৌকো ভাড়াটা কিন্তু আমি দেব।
আফজল হোসেন হাসল। বলল, ঠিক আছে, দিবেন।
কত দিতে হবে?
তিরিশ ট্যাকা–
কোমরের থলি থেকে টাকা বার করে আফজল হোসেনকে দিল বিনু, ওদের দিয়ে দেবেন। তারপর রাজেককে পঁচিশটা টাকা দিয়ে বলল, তোমাদের তো রাজদিয়া ফিরে যেতে হবে। কিভাবে যাবে?
রাজেক বলল, এখান থিকা গয়নার নাও পামু। হেই ধইরা চইলা যামু।
বিনু বলল, রাজদিয়ায় গিয়েই দাদুর সঙ্গে দেখা করে সব বলো।
হে তো কমুই।
আফজল হোসেন বিনুকে বলল, চলেন—
বিনুরা জেটিঘাটের দিকে এগিয়ে গেল। তাদের সঙ্গে রাজেক আর তমিজও চলেছে। সামনে পেছনে এবং পাশে চলেছে শিকড় উপড়ে আসা মানুষের স্রোত। ম্রিয়মাণ, ভীত, সন্ত্রস্ত অসংখ্য মুখের মিছিল।
বিনু রাজেককে বলল, তোমরা আবার কষ্ট করে আসছ কেন? আফজল সাহেবই তো যাচ্ছেন।
রাজেক জানায়, বিনুদের স্টিমারে ওঠার কী বন্দোবস্ত হয় তা না জেনে তারা ফিরবে না। রাজদিয়ায় গিয়ে হেমনাথকে সব জানাতে তো হবে।
এরপর আর বলার কিছু থাকে না। নিঃশব্দে হাঁটতে লাগল বিনু।
.
৩.০৭
জেটির সামনে অনেকটা জায়গা জুড়ে আগুনতি মানুষ। ছেলেমেয়ে, বউ, বুড়ো মা-বাপ নিয়ে তারা বসে আছে। পাশে নানা লটবহর। টিনের বাক্স, পোঁটলাপুঁটলি, বেতের সাজি বা ধামা। পার্থিব সম্পত্তি বলতে যে যেটুকু পেরেছে নিয়ে এসেছে। নৌকোয় করে বা সড়ক ধরে হেঁটে, ধুকতে ধুকতে যারা আসছে তারাও আগে আসা লোকগুলোর পাশে বসে পড়ছে।
জেটির ভেতর ঢোকা প্রায় অসম্ভব। সেখানে এমন ঠাসা ভিড় যে পা ফেলার মতো ফাঁক নেই। আন্দাজ করা যায়, অনেক আগে থেকেই তোকজন এসে স্টিমার ধরার জন্য জেটিতে বসে আছে। এধারে ওধারে আট দশটা কনস্টেবলকে ঘোরাঘুরি করতে দেখা যাচ্ছে। তাদের হাতে বন্দুক।
একসঙ্গে বহু মানুষ জড়ো হলে যা হয়, চারদিকে হইচই চলছে।
আফজল হোসেন এধারে ওধারে তাকিয়ে কিছু বোঝার চেষ্টা করল। তারপর বিনুকে বলল, আপনেরা এখানে ইট্র খাড়ন। আমি ইস্টিমারের খবর লইয়া আসি। মুহূর্তে জনারণ্যে মিশে গেল সে।
তারপাশায় মোটামুটি নিরাপদে পৌঁছনো গেছে। সেদিক থেকে একটা মারাত্মক চিন্তা কেটেছে। কিন্তু জেটিঘাটের জনসমুদ্র দেখে নতুন একটা দুর্ভাবনা বিনুকে হতচকিত করে তোলে। যত মানুষ আগেই জমা হয়েছে এবং স্রোতের মতো আরও যারা আসছে, দিনে দশটা স্টিমার দিলেও তাদের জায়গা হবে না। রুণ, দুর্বল ঝিনুককে নিয়ে ভিড় ঠেলে কবে সে গোয়ালন্দের স্টিমারে উঠতে পারবে, কে জানে।
একই সমস্যার কথা ভাবছিল ঝিনুক। পাশ থেকে সে বলল, এত মানুষ! আমরা কী করে কলকাতায় যাব?
বিনু ঝিনুকের দিকে ফিরে ভরসা দেবার সুরে বলে, একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে। তারপশায় যখন আসতে পেরেছি, কলকাতাতেও ঠিক চলে যাব।
বেশ কিছুক্ষণ বাদে ফিরে আসে আফজল হোসেন। বলে, গতিক ভালা না তাকে বেশ চিন্তিত দেখাচ্ছে।
বিনুর বুকের ভেতরটা ধক করে ওঠে, কী হয়েছে মিঞাসাহেব?
কাইল তরি (পর্যন্ত) রোজ দুইখান ইস্টিমার দিত। আইজ থিকা একখান কইরা দিছে। ক্যামনে যে অ্যাত মানুষ গাঙ পারাইয়া (পার হয়ে) গোয়ালন্দ যাইব, খোদা জানে।
বিনুর কাছে এটা পরিষ্কার, আজ আর ঝিনুককে নিয়ে স্টিমারে ওঠা হচ্ছে না। কবে যে উঠতে পারবে, তার ঠিক নেই। হয়তো দু’দিন, চারদিন, কি তারও বেশি তারপাশার স্টিমারঘাটে অপেক্ষা করতে হবে।
আফজল হোসেন এবার বলল, জেটিঘাটার ভিতরে একখান সুই (উঁচ) ফালানের জাগা (জায়গা) নাই–অ্যাত মানুষ। বিবিসাবরে লইয়া আপনেরে বাইরে খুলা (খোলা) আশমানের তলে থাকতে হইব। একটু থেমে ফেরে বলে, জবর কষ্ট হইব আপনেগো।
স্টিমারের সমস্যা তো আছেই, অদূর ভবিষ্যতের আরও একটা দুশ্চিন্তা বিনুকে ভেতরে ভেতরে চঞ্চল করে তোলে। দু’চারদিন পর না হয় তারা গোয়ালন্দ পৌঁছল, কিন্তু সেখানে গিয়েই যে শিয়ালদার ট্রেন ধরতে পারবে, তার কি কোনও নিশ্চয়তা আছে? সেখানেও কি হাজার হাজার মানুষ আকণ্ঠ উদ্বেগ নিয়ে অপেক্ষা করছে না। গোয়ালন্দ থেকে দিনে শিয়ালদার কটা ট্রেন ছাড়ে, বিনুর জানা নেই। হয়তো ওখানেও দিনকয়েক ট্রেনের আশায় বসে থাকতে হবে। দুশ্চিন্তাটা ঝাঁকি মেরে মাথা থেকে তাড়াতে চাইল বিনু। যতক্ষণ শ্বাসপ্রশ্বাস চলছে, আশা তো রাখতেই হয়। সে বলল, এত মানুষ। কলকাতায় চলেছে। তাদের যা হবে, আমাদেরও তাই হবে। সারারাত ঘুমোতে পারেননি, নৌকোর পাটাতনে বসে হিমে ভিজেছেন। আমাদের জন্যে আপনি আর কষ্ট করে এখানে থাকেবন না। মামুদপুরে ফিরে যান।
