নদীর কিনার ঘেঁষে স্টিমারঘাট। সেখানে মস্ত জেটি। গোয়ালন্দ কি নারায়ণগঞ্জের দিক থেকে যত স্টিমার আসে, সব জেটিটার গায়ে ভেড়ে। স্টিমারঘাট থেকে কিছুটা তফাতে নৌকোঘাট। একমাল্লাই, দুমাল্লাই, চারমাল্লাই, ছইওলা, ছইছাড়া কত যে নৌকো কাতার দিয়ে লগি গেঁথে দাঁড়িয়ে রয়েছে তার হিসেব নেই। তা ছাড়া আছে অগুনতি কোষ, ভাউলে, মহাজনী ভড়।
যেমন নৌকোর ভিড়, তেমনি মানুষের। হামিদরা নৌকোঘাটের গায়ে ফাঁকামতো একটু জায়গায় নৌকো ভিড়িয়ে, লগি পুঁতে, কাছি দিয়ে বেঁধে ফেলল।
দূর থেকে নৌকোঘাটের কলরব শোনা গিয়েছিল। এখানে আসার পর তুমুল হইচই কানের পর্দা যেন ফাটিয়ে দিচ্ছে। সারা রাত চার মাঝি সমানে বৈঠা টেনেছে। ঘুম তো দূরের কথা, কেউ এতটুকু জিরোবারও ফুরসত পায়নি। পরিশ্রমে হাত-পায়ের জোড় যেন আলগা হয়ে যাচ্ছে। ক্লান্তিতে ঘুমে শরীর ভেঙে পড়ছে। চোখ আপনা থেকে বুজে আর্সছে। বৈঠা না টানলেও বাকি সকলের একইভাবে। রাত কেটেছে। বিনিদ্র। আতঙ্কিত।
বিনুরা তারপাশায় পৌঁছবার পর একের পর এক নৌকো নদী পাড়ি দিয়ে নৌকোঘাটে এসে ভিড়তে লাগল। সেগুলো থেকে যারা নামছে তাদের শঙ্কাতুর মুখচোখ দেখে বোঝা যায়, দেশের ভিটেমাটি ফেলে চিরকালের মতো সীমান্তের ওপারে চলে যাবার জন্য ওরা স্টিমার ধরতে এসেছে।
আফজল হোসেন বলল, যাউক, উপুরআলার দোয়ায় শ্যাষ তরি (পর্যন্ত) তারপাশায় পৌঁছান গেল।
কাল হানাদারদের নৌকোটা চলে যাবার পর তেমন আর কিছু ঘটেনি। নির্বিঘ্নে বাকি নদীটুকু পেরিয়ে তারা এখানে আসতে পেরেছে।
আস্তে মাথা নাড়ে বিনু। ঈশ্বরের অপার করুণা ছাড়া যে তারপাশায় পৌঁছনো যেত না, সে ব্যাপারে আফজল হোসেনের সঙ্গে সে একমত।
আফজল বলল, এহানে কুনো ডর নাই। পুলিশ আছে। একটু থেমে জানালো, দ্যাশ ছইড়া যারা যাইতে আছে তাগো উপুর পাকিস্থানে জুলুম হইতে আছে, এই লইয়া ইন্ডিয়ায় জবর শোরগোল উঠছে। হের (তার) লেইগা এখানকার গরমেন (গভর্নমেন্ট) কুমো কুনো জাগায় (জায়গায়) পুলিশ বসাইছে।
এই খবরটা আগেও কানে এসেছে বিনুর। যারা জন্মভূমি থেকে উৎখাত হয়ে ওপারে যাচ্ছে, রাস্তায় তাদের ওপর যে হামলা চালানো হচ্ছে, সেটা আর চাপা নেই। যারা বর্ডারের ওপারে যেতে পেরেছে, এ ধারের খুনখারাপি, লুটপাট, আগুন লাগানোর খবর সবিস্তার সেখানে পৌঁছে দিচ্ছে। ইন্ডিয়ায় সেই কারণে তীব্র উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। ভারতের মানুষজন এটা ভাল চোখে দেখছে না। তাই পাকিস্তান সরকার মুখরক্ষা করতে রেল স্টেশন আর স্টিমারঘাটগুলোতে উদ্বাস্তুদের পাহারাদারির জন্য পুলিশ মোতায়েন করেছে। এই জায়গাগুলো মোটামুটি সুরক্ষিত।
আফজল হোসেন ফের বলল, বিবিসাবরে কন, অহন আর বুরখা পইরা থাকনের দরকার নাই। আপনেও লুঙ্গি ছাইড়া ধুতিখান পইরা লন (নিন)। হের পর নাও থিকা লাইমা (নেমে) উপুরে চলেন। তমস্ত রাইত কেওর প্যাটে ভাত-পানি পড়ে নাই। আগে খাইয়া শরীলে জোর-বল আনেন। পরে আপনেগো ইস্টিমারঘাটায় পৌঁছাইয়া দিমু।
লোকটার সব দিকে নজর। সময় যখন বেজায় উত্তপ্ত, বিষবাষ্পে আবহাওয়া আচ্ছন্ন, তখন আফজল হোসেন কিন্তু সম্পূর্ণ অবিচলিত। ক’বছর ধরে অবিশ্বাস, ঘৃণা আর বর্বরতায় বহুকালের স্থিতি, শান্তি ভেঙেচুরে শতখান হয়ে গেছে। কিন্তু মামুদপুর গ্রামের এই অখ্যাত মানুষটিকে সে সব কোনও ভাবেই টলাতে পারেনি। বুকের ভেতর ভালবাসা, মমতার এমন এক চেরাগ সে জ্বেলে রেখেছে যা কখনও, কোনও কারণেই নেবে না।
পোশাক পালটে বোরখা লুঙ্গি ভাজ করে ছইয়ের ভেতর একধারে রেখে দিল বিনু। তারপর ঝিনুককে নিয়ে আফজল হোসেনের সঙ্গে পাড়ের মাটিতে নামল। তাদের পিছু পিছু নৌকোর চার মাঝি এবং রাজেক আর তমিজও নেমে এসেছে।
সবাই নদীর জলে মুখ ধুয়ে নিল। ঢালু পাড় বেয়ে কয়েক হাত ওপরে উঠলে চওড়া মেটে সড়ক। সেটা একদিকে স্টিমারঘাটে গিয়ে ঠেকেছে। আরেক দিকে বাঁক ঘুরে ঘুরে দূরের গ্রামগুলোতে চলে গেছে।
একটু পর সড়কে উঠে আসতেই চোখে পড়ল, গ্রামের দিক থেকে কাতারে কাতারে মানুষ আসছে। পুরুষদের মাথায় টিনের বাক্স, পাটি কি শতরঞ্চি-জড়ানো বিছানা, হাতে গাঁটরি বোঁচকা। সধবা বৌদের এক কাকালে বাচ্চা, কাঁধে পোঁটলা পুঁটলি। যে বাচ্চাগুলো একটু বড়, তারাও ছোটখাট কিছু না কিছু হাতে ঝুলিয়ে আসছে।
মানুষের যে মহাযাত্রা স্টিমারঘাটের দিকে চলেছে তারা কারা, কী তাদের পরিচয়, বুঝতে অসুবিধা হয় না। এই সব নানা বয়সের মানুষ-বুড়ো আধবুড়ো কিশোর কিশোরী যুবক যুবতী বাচ্চাকাচ্চাদের চোখেমুখে অসীম ক্লান্তি আর আতঙ্কের ছাপ। মনে হয়, অনেক দূর থেকে হাঁটতে হাঁটতে তারা আসছে।
আফজল হোসেন আক্ষেপের সুরে বলল, দ্যাশ ছাইড়া যাইতে আছে গিয়া। আমাগো ঢাকার জিলা পেরায় শূইন্য হইয়া গেল।
পাশাপাশি হাঁটছিল বিনু আর ঝিনুক। বিনু জানে শুধু ঢাকা জেলাই নয়, সারা পূর্ব বাংলাই ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। সে উত্তর দিল না।
রাস্তার একধারে টিনের চাল এবং কাঁচা বাঁশের বেড়ায় সারিবদ্ধ দোকান। তার অনেকগুলোই মিঠাইয়ের। বড় বড় পেতলের গামলায় রসগোল্লা, ক্ষীরমোহন, পান্তুয়া, কাঠের পরাতে মাখা সন্দেশ, পাতক্ষীর। এ ছাড়া রয়েছে বেশ ক’টা চিড়ে মুড়ি বাতাসা তিলা কদমা এবং চিনির মঠের দোকান। চার পাঁচটা কলার দোকানও চোখে পড়ছে। কত রকমের কলা–সবরি, মোহনবাঁশি, চাপা, কবরি, অমর্তসাগর। এ ছাড়া আছে কাপড়ের দোকান, মনিহারি দোকান, বাসনকোসনের দোকান, চাল ডাল তেল নুন মশলাপাতির দোকান। দোকানের লেখাজোখা নেই। কয়েকটা ভাতের হোটেলও আছে।
