বিনুরা অনেক দূর চলে এসেছিল। খুব সম্ভব মাঝনদীতে। মামুদপুরের নৌকোঘাটের আলোগুলো এখন আর দেখা যাচ্ছে না। আঁধারে কুয়াশায় নদীর ওপারটা বিলীন হয়ে গেছে।
হঠাৎ একটা কথা ভেবে নিজের কাছেই নিজে ভীষণ ছোট হয়ে গেল বিনু। শুধু ছোটই নয়, মনে হল, সে বড় বেশি স্বার্থপর, আত্মকেন্দ্রিক। ঝিনুকের আর নিজের নিরাপত্তা ছাড়া অন্য কোনও দিকে তার নজর নেই। মাত্র সাত হাত দূরে বসে হিমে ভিজে যাচ্ছে আফজল হোসেন। হেমন্তের ঠাণ্ডা হাওয়া তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে। আকাশের নিচে ভোলা পাটাতনে সারা রাত এভাবে বসে থাকলে লোকটা শক্ত অসুখে পড়ে যাবে। ছইয়ের ভেতর তাকে এসে বসার কথা বলতে গিয়েও থেমে যায় বিনু। সে জানে, তারপাশা অব্দি লোকটা ঠায় ওখানে বসে থাকবে। কারণটাও তার অজানা নয়।
আফজল হোসেন হামিদকে জিজ্ঞেস করে, কি মাঝি, নাওয়ে বাদাম খাটাইবা? হামিদ বলল, না বড় মিঞাছাব, হাউরা (ঝড়ো) বাতাস ছাড়ছে। একবার এই মুখী লৌড়ায়, আবার উই মুখী। গাঙও উথালপাথাল। বাদাম খাটাইলে নাও সামাল দিতে পারুম না। হেইর থিকা বৈঠাই বাই।
যা ভালা মনে লয় হেই কর।
অন্ধকারেও বোঝা যাচ্ছিল, আশপাশ দিয়ে বেশ কিছু নৌকো চলে যাচ্ছে। কোনওটায় আলো জ্বলে, কোনওটায় জ্বলে না। সবগুলো নৌকোর যাত্রীই যে সাতপুরুষের ভিটেমাটি ছেড়ে তারপাশায় স্টিমার ধরতে যাচ্ছে তা কিন্তু নয়। কত মানুষকে কত দরকারে রাত বিরেতে নদী পাড়ি দিতে হয় তার কি কিছু ঠিক আছে? যে. নৌকোগুলো পাশ দিয়ে গেছে তাদের দিক থেকে বিপদের কারণ ঘটেনি।
মাঝরাতে বাতাস আর জলস্রোতের দাপট অনেকটা কমে যায়। বিনুর চোখে চুল লাগে। সেই সময় হঠাৎ জোরাল টর্চবাতির আলো এসে পড়ে তাদের নৌকোয়। একটা ভারী, কর্কশ গলা কানে আসে, কাগো নাও? যায় কই?
কখন যে তাদের গা ঘেঁষে একটা লম্বা ধাঁচের নৌকো পাশাপাশি চলতে শুরু করেছে, খেয়াল করেনি বিনু। তার হৃৎপিণ্ডের ধকধকানি স্তব্ধ হয়ে যায় যেন। ঝাঁপসা অন্ধকারেও পাশের নৌকোয় কারা বসে আছে, তাদের কী অভিসন্ধি, বুঝতে অসুবিধা হয় না। মধ্যরাতেও ঘাতক বাহিনীর কী অফুরন্ত উদ্যম।
আফজল হোসেনও খুব সম্ভব বসে বসে ঢুলছিল। টর্চের তীব্র আলো চোখে লাগতে ধড়মড় করে ওঠে। ভুরুর ওপর হাতের আড়াল দিয়ে প্রবল ধমকানির সুরে বলে, দেখতে পাও না কাগো নাও? বাত্তি সরাও–
টর্চের মুখ অন্য দিকে সামান্য সরে যায়। সেই লোকটা ফের জিজ্ঞেস করে, কুনখানে চললেন মিঞাছাব?
হেয়া (তা) দিয়া তোমার কুন কাম? আফজল হোসেন রুখে ওঠে।
তার চোটপাট শুনে পাশের নৌকোর লোকটা সামান্য দমে যায়। বলে, ওসের (হিমের) মইদ্যে খুলা পাটাতনে বইসা আছেন ক্যান?
আফজল হোসেন বলে, ওসের মইদ্যে বইসা যামু, না গাঙ হাতইরা (সাঁতরে) যামু, হেইটা আমার ইচ্ছা। ঝট না কইরা তোমরা অহন যাও–
টর্চের আলো বিনুদের নৌকোর ওপর আগাপাশতলা পাক খেয়ে চলেছে। ঝপহীন ছইয়ের তলায় আলোটা হঠাৎ স্থির হয়ে যায়।
লোকটা জিজ্ঞেস করে, হেরা (রা) কারা?
তার মনে কি কোনও রকম খটকা দেখা দিয়েছে? দমে গিয়ে মিন মিন করে জবাব দিলে লোকটা পেয়ে বসবে। তার সন্দেহ বহুগুণ বেড়ে যাবে। গলার স্বর অনেক উঁচুতে তুলে চড়া মেজাজে আফজল হোসেন বলে, হেই খবরে কী হইব?
লোকটা শাসানির সুরে বলে, যা জিগাই তার জবাব দ্যান। বেশি তেড়িমড়ি কইরেন না।
বিনু কাঠ হয়ে বসে আছে। আফজল হোসেন কী উত্তর দেবে, কিভাবে এই নতুন সমস্যাটা সামাল দেবে, বোঝা যাচ্ছে না। তার সামান্য ভুলচুক হয়ে গেলে, পরিণতি কী হবে ভাবতে সাহস হয় না।
আফজল হোসেন গলার স্বর আগের জায়গাতেই রেখে বলে, তেড়িমমড়ি! জবানের লাগাম নাই দেখি। কার লগে ক্যামন কইরা কথা কইতে হয়, শিখ নাই! আমি মামুদপুরের ইউনান বোডের প্রেছিডাং (প্রেসিডেন্ট)। ছইয়ের তলে আমার পোলা আর হের (তার) বিবি রইছে। শুনলা তো? এইবার আমাগো ছইড়া অন্যখানে যাও–
লোকটা এবার অনেক নরম হয়। বলে, মিঞাছাব, আপনে কি জানেন, মেলা (বহু) হুমুন্দির পুতে রাইতের আন্ধারে হিন্দুগগা লইয়া গিয়া গোয়ালন্দর ইস্টিমারে তুইলা দিতে আছে। পাছে কেও দেইখা ফালায়, হেইর লেইগা বাত্তি জ্বালে না।
কে কী করতে আছে, আমার জাননের কাম নাই।
একখান পরামশ্য দেই–
কী?
কুপি কি হেরিক্যান আঙ্গাইয়া (জ্বালিয়ে) রাখেন। আমাগো লাখান আরও মেলা নাও গাঙ্গে ঘুরতে আছে। বাত্তি দেখলে হেরা (তারা) সন্দ করব না।
তুমার পরামশ্যখান মনে রাখুম। অহন মেহেরবানি কইরা যাও—
লম্বা নৌকোটা পাশ থেকে দূর কুয়াশায় আর অন্ধকারে মিলিয়ে যায়।
দাঁতে দাঁত ঘষে গজরাতে থাকে আফজল হোসেন, ইবলিশের ছাওরা–
৩.০৬-১০ ভোরে সূর্যোদয়ের আগে
৩.০৬
মোটামুটি ভাবা গিয়েছিল, ভোরে সূর্যোদয়ের আগে আগে তারপাশা পৌঁছনো যাবে। কিন্তু মামুদপুর থেকে নৌকো ছাড়ার পর খ্যাপা বাতাস আর নদীর উদ্দাম ঢেউয়ের বাধায় প্রথম দিকে গতি বাড়ানো যাচ্ছিল না। পরে অবশ্য হাওয়া এবং নদীর দাপট কমলে হামিদরা নৌকোটাকে নদীর ওপর দিয়ে প্রায় উড়িয়েই নিয়ে এসেছে। তবু তারপাশায় পৌঁছতে একটু বেলাই হয়ে গেল।
দিগন্তের তলা থেকে সূর্য এখন অনেকটা ওপরে উঠে এসেছে। হেমন্তের এই সকালে কুয়াশার লেশমাত্র নেই। মাথার ওপর মস্ত বড় নীলাকাশ। স্বচ্ছ। পরিষ্কার। কেউ যেন কাল রাতের সব কুয়াশা আর অন্ধকার ধুয়ে মুছে তকতকে করে রেখেছে। যতদূর চোখ যায়, নদীর জলে সোনালি রোদ টলমল করছে। মনে হয়, দিগন্ত জুড়ে অপার্থিব কোনও কলসি উপুড় করে স্বর্ণরেণু ঢেলে দেওয়া হয়েছে। কাল রাতের মতো না হলেও এই সকালবেলায় বাতাস বেশ ঠাণ্ডা; অদৃশ্য হালকা ঢেউ তুলে তুলে সামনের অন্তহীন জলধারার ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে। নদী থেকে পঞ্চাশ ষাট হাত উঁচুতে ঝাকে ঝাকে চিল উড়ছে। ওদের পেটে রাহুর খিদে, সারাক্ষণ শুধু খাই খাই। পাখিগুলোর ধ্যানজ্ঞান জলের দিকে। মাছ নজরে পড়লেই নদীতে ছোঁ দিয়ে পড়ছে। ধারাল ঠোঁটে টাটকিনি কি গোলসা ট্যাংরা বা টাকি মাছ গেঁথে নিয়ে বাতাসে ডানার ঝাঁপটা মেরে ফের উঁচুতে উঠে যাচ্ছে।
