অর্থাৎ এ নৌকোয় মুসলমান যাত্রী ছাড়া আর কেউ আছে, নদীর হানাদারেরা ঘুণাক্ষরেও টের পাবে না। এখন আকাশে বিষ, বায়ুস্তরে বিষ, চারদিকে মৃত্যুভয়ের পাশাপাশি ঘৃণা আর আক্রোশ। বিনু জানে, আফজল হোসেন এই যে তাদের তারপাশায় পৌঁছে দেবার ঝুঁকি নিয়েছে সেটা কতখানি বিপজ্জনক। ছইয়ের তলায় কারা লুকিয়ে আছে, জানাজানি হলে কী ঘটবে, সেটা খুবই স্পষ্ট। বিনুদের চাইতেও অনেক বেশি সঙ্কটে পড়বে আফজল হোসেন। এই দুঃসাহসী মানুষটি তাদের শেষ অবলম্বন। সে সঙ্গে থাকলে অনেকখানি ভরসা পাবে বিনুরা। সেই সকাল থেকে তাদের বাঁচাবার জন্য কতভাবেই না আগলে আগলে রেখেছে আফজল। তারপরও তাকে নতুন করে বিপন্ন করতে মন সায় দিচ্ছে না। কিন্তু মুখ ফুটে তা বলতে গিয়েও থেমে গেল বিনু। মানুষ বড় স্বার্থপর জীব। তার যা কিছু, সবই নিজেকে বাঁচিয়ে। রাতের অন্ধকারে নদী পাড়ি দিয়ে তারপাশায় যাবার সময় এই মানুষটা যদি ঢালের মতো সামনে থাকে, মনের জোর যথেষ্ট বেড়ে যাবে। আজ সকাল থেকে সন্ধে, মাত্র দশ এগার ঘন্টার মতো আফজল হোসেনকে দেখছে বিনু। তার সাহস, বুদ্ধি, বিচক্ষণতা, বিপদ এড়াবার জন্য দ্রুত কৌশল সৃষ্টির ক্ষমতা, সব মিলিয়ে এমন একজন লোককে যাত্রাসঙ্গী হিসেবে যখন অযাচিতভাবেই পাওয়া যাচ্ছে, তখন তাকে ছাড়া ঠিক হবে না।
দিনের বেলা উত্তুরে হাওয়ায় তেমন তেজ ছিল না; ঢিমে চালে সেটা বয়ে যাচ্ছিল। সন্ধে নামার সঙ্গে সঙ্গে তার জোর অনেক বেড়েছে। হিমও পড়ছে নিবিড় হয়ে। সেই বিকেল থেকে আকাশের গায়ে কুয়াশা জমছিল। ক্রমশ তা ঘন হয়ে চারদিক ঢেকে ফেলছিল। কুয়াশার সঙ্গে আঁধার মিশে এখন বিশ হাত দূরেও নজর চলে না। ঠিক কালকের মতোই চোখের সামনের সমস্ত কিছু ঝাঁপসা।
আফজল হোসেন মাঝিদের বলল, নাও ছাইড়া দ্যাও। কেরায়া নাওয়ের ঘাটের সুমুখ দিয়া যাইও না। বলে আঙুল বাড়িয়ে কাছাকাছি নৌকোঘাটটা দেখিয়ে দিল।
হামিদ বেশ চালাকচতুর। নৌকোঘাটের পাশ দিয়ে না যাবার কারণটা চট করে ধরে ফেলে। বলে, হ, উই ধার দিয়া যাওনের কাম নাই। রাইতে আপনেরে নাওয়ে দেখলে হগলে জিগাইব, কই যান, ক্যান যান। মেলা ফৈজত।
আফজল হোসেন এই অঞ্চলের একজন মান্যগণ্য মানুষ। সবাই তাকে চেনে। এত রাতে সে কোথায় চলেছে, পরিচিত লোকজনের তেমন কৌতূহল হওয়া স্বাভাবিক। সে বলল, নাও লইয়া সিধা মইদ্য গাঙে যাইবা। বাতাসের গতিক ভালা বুঝলে বাদাম খাটইয়া দিবা। কাইল সুরুয ওঠনের (ওঠার) আগে আগে তারপাশা পৌঁছাইয়া যামু–
হামিদ বলল, তেমুনডাই ভাইবা রাখছি। বলে বরাবর মাঝনদীর দিকে নৌকার মুখ ঘুরিয়ে দিল। জবর ওস (কুয়াশা)। দেইখো, দিক য্যান ভুল না হইয়া যায়। আফজল হুঁশিয়ার করে দিল। হামিদের আত্মবিশ্বাসে সামান্য খোঁচা লাগে। গলায় ঈষৎ জোর দিয়ে সে বলে, বড় মিঞাছাব, মোচের ব্যাখ (রেখা) যহন উঠে নাই হেই সোময় থিকা পদ্ম-ম্যাঘনা-ধলেশ্বরীতে নাও বাইতে আছি। ওসে তো খুয়া খুয়া (আবছা) দ্যাখন যায়। চৌখে কাপড় বাইন্ধা জাগার (জায়গার) নাম ক’ন। ঠিক পৌঁছাইয়া দিমু।
জানি তুমি উস্তাদ মাঝি, তভু মনে করাইয়া দিলাম।
কালকের তুলনায় আজ বাতাস অনেক জোরালো তো বটেই, সমস্ত নদী জুড়ে উঁচু উঁচু ঢেউও উঠছে। জল থেকে ঠাণ্ডা বাষ্প বেরিয়ে এসে কুয়াশায় আর অন্ধকারে মিশে যাচ্ছে।
নদীর পাড় থেকে নৌকো বেশ খানিকটা দূরে চলে এসেছিল। ওধারের মাঝিঘাট এখন আরও অস্পষ্ট। শুধু পুরু কুয়াশার পর্দার ওধারে ওখানকার নৌকোগুলোর ডিবে কি লণ্ঠনের ক্ষীণ আলো কেমন যেন অলৌকিক মনে হয়।
রাজেকদের নৌকোর ছইয়ের দু’দিকেই কাঁচা বাঁশের ঝাঁপ ছিল। এই নৌকোটার ছইয়ের দুই মুখই খোলা। হু হু করে হেমন্তের বাতাস সারা গায়ে হিম মেখে ভেতরে ঢুকে পড়ছে।
নৌকোয় উঠেই শুয়ে পড়েছিল ঝিনুক। হেরিকেন কি কুপি থাকলেও হামিদরা তা জ্বালিয়ে দেয়নি। রাজেকদের মতো তারাও রাতের আঁধারে আঁধারে হানাদারদের নজর এড়িয়ে নদী পাড়ি দিয়ে তারপাশায় যেতে চায়।
ঝিনুকের পাশে বসে আছে বিনু। স্পষ্ট দেখা না গেলেও বোঝা যায়, বোরখায় সারা শরীর ঢেকে মেয়েটা ঠাণ্ডায় কুঁকড়ে আছে। সে ডাকল, ঝিনুক—
ঝিনুক ঘুমোয়নি। মৃদু গলায় সাড়া দিল, উঁ–
আফজল সাহেব আমাদের সঙ্গে আছে। এবার আর ভয় নেই।
কাল রাজেকদের নৌকোয় ওঠার পর এমন অভয় কত বার যে বিনু দিয়েছে তার ঠিক নেই। ঝিনুক কতটা আশ্বস্ত হল, কে জানে। সে উত্তর দিল না।
বিনুর আর কিছু বলার ছিল না। কী-ই বা বলবে? ছইয়ের ফাঁক দিয়ে দুনিরীক্ষ নদীর দিকে তাকিয়ে থাকে সে। আফজল হোসেন তাদের সঙ্গে আছে। ঠিক। যেটুকু পরিচয় পাওয়া গেছে, তাতে মনে হয় লোকটা বিশ্বাসঘাতকতা করবে না। সেটাও ঠিক। তবু যতক্ষণ না তারপাশায় গিয়ে স্টিমারে উঠছে, দুর্ভাবনা পিছু ছাড়ছে না। কিভাবে, কোন অদৃশ্য ছিদ্র দিয়ে সেটা বার বার মাথায় ঢুকে পড়ে, হদিস পাওয়া যায় না।
নৌকোর এ-মাথায় ও-মাথায় অন্ধকারে জিনের মতো চার মাঝি একটানা বৈঠা টানছে। তার আওয়াজ তো রয়েছেই, সেই সঙ্গে নদীর বড় বড় ঢেউ নৌকোর গায়ে আছড়ে পড়ে অনবরত যে ধ্বনি সৃষ্টি করছে, এছাড়া সারা পৃথিবীতে আর কোনও শব্দ নেই। কালকের মতো আজও আকাশ চাঁদ বা নক্ষত্রের মেলা, কিছুই চোখে পড়ছে না। কুয়াশা আর অন্ধকার মিলে গিয়ে দিগন্তজোড়া ধূসরতায় সে সব পুরোপুরি মুছে গেছে।
