বিনুর শ্বাস আটকে আসছিল। কঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে আফজল সাহেব?
পরে শুইনেন (শুনবেন)। দেরি করলে হগলটির জান চইলা যাইব। বিবিসাবরে আগে জাগান–
আফজল হোসেনের বলার ভঙ্গিতে এমন এক কঠোরতা আর তাড়া ছিল যে এক টানে ঝিনুককে তুলে ফেলল বিনু। আচমকা ঘুম ভাঙানোয় হকচকিয়ে যায় ঝিনুক। ভয়ার্ত গলায় চেঁচিয়ে ওঠে, কী—কী–
আফজল হোসেন বিনুকে বলল, বিবিসাবরে বুরখাখান পরাইয়া বাইরে লইয়া চলেন। আপনে লুঙ্গি পইরাই আসেন।
ঝিনুককে তড়িৎগতিতে বোরখা পরাল বিনু। আফজল হোসেনের লুঙ্গিটা পরেই আছে সে। তার ধুতিটা তক্তপোষের এক ধারে দলা পাকানো হয়ে পড়ে আছে। ধুতি তুলে নিয়ে ঝিনুকের একটা হাত ধরল বিনু। তারপর ঘর থেকে বাইরের উঠোনে। আফজল হোসেন এবং রাজেকও তাদের সঙ্গে বেরিয়ে এসেছে।
দূরে হইচই শোনা গেল। সচকিত বিনুর চোখে পড়ল, মশাল জ্বালিয়ে কারা যেন ডান দিক থেকে হল্লা করতে করতে এধারে ছুটে আসছে।
আফজল হোসেন হঠাৎ কেন ধনা বারুইর বাড়ি এসে তাদের ঘর থেকে বেরিয়ে আসার জন্য তাড়া দিয়েছে, এবার খানিকটা আন্দাজ করা যাচ্ছে।
রাজেক থর থর, নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল, অহন উপায়? অরা এইদিকেই আসতে আছে নিদারুণ সংকটের মধ্যেও আফজল হোসেনের মাথাটা খুব ঠাণ্ডা। দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে সে বলল, ডাইনে যাওন যাইব না। অগো সুমখে পইড়া যামু। বাও (বা) দিকে লৌড়াও (দৌড়ও)–
ডান দিকে গ্রামের রাস্তা। ধনা বারুইর বাড়ির হাতা ছাড়িয়ে বাঁ পাশে খানিকটা গেলে ঝোপঝাড়, জঙ্গল। সে সবের ভেতর দিয়ে উৰ্দ্ধশ্বাস দৌড় শুরু হল। আগে আগে টর্চ জ্বেলে পথ দেখিয়ে ছুটছে। আফজল হোসেন। বাকিরা তার পেছনে। অপরিচিত সেই ছায়ামূর্তিগুলোও সঙ্গে রয়েছে। বিনু সেই যে ঝিনুকের হাত ধরেছিল, আর ছাড়েনি। প্রায় উড়িয়ে নিয়ে চলেছে।
আচমকা ঘুম থেকে তুলে এভাবে অন্ধকারে কুয়াশায় ঝোপ জঙ্গলের ভেতর দিয়ে দৌড় করানো হবে, ভাবতে পারেনি ঝিনুক। সে এতটাই বিহ্বল হয়ে পড়েছে যে মুখ থেকে একটি শব্দও বেরুচ্ছে না।
অনেকক্ষণ ছোটার পর সবাই নদীর পাড়ে এসে থামে। আফজল হোসেন বিনুদের যেখানে নিয়ে এসেছে, নৌকোঘাট সেখান থেকে বেশ খানিকটা দূরে। সমস্ত কিছু ঝাঁপসা, তবু বোঝা যায়, বার চোদ্দটা নৌকো ওখানে গা জড়াজড়ি করে রয়েছে। সেগুলোতে মিট মিট করে হেরিকেন কি কুপি জ্বলছে।
এতটা দৌড়ের ধকলে সবাই ভীষণ হাঁপাচ্ছিল। জোরে জোরে বারকয়েক শ্বাস টেনে আফজল হোসেন বলল, যাউক, আর ডরের কিছু নাই। অহন আমরা নিচ্চিন্ত।
ক্রমে জানা গেল, দুপুরে বিনুদের খাইয়ে যাবার পর আফজল হোসেন মামুদপুরের পাশের গ্রাম সোনাদীঘিতে লোক পাঠিয়ে চারজন মাঝিকে ডাকিয়ে এনে বিনুদের তারপাশায় পৌঁছে দেবার ব্যবস্থা পাকা করে ফেলে। অনেকদিন ধরে এই মাঝিদের চেনে সে। লোকগুলো খুবই বিশ্বাসযোগ্য এবং ইমানদার। ঠিক হয়েছিল, বেলা থাকতে থাকতে ওরা ওদের চারমাল্লাই নৌকো নৌকোঘাট থেকে দূরে মুত্রাবনের আড়ালে লুকিয়ে রেখে আফজল হোসেনের বাড়ি গিয়ে খবর দেবে। সন্ধের পর চরাচর জুড়ে কুয়াশা এবং অন্ধকার নামলে সে মাঝিদের সঙ্গে করে ধনা বারুইয়ের বাড়ি এসে বিনুদের নিয়ে নদীর পাড়ে গিয়ে নৌকোয় উঠবে। নদীর ধারের মুত্রাবনে নৌকো বেঁধে রেখে মাঝিরা আফজলের বাড়ি চলেও গিয়েছিল।
সবই ঠিকমতো চলছিল, কিন্তু সন্ধের মুখে মুখে কিভাবে যেন বিনুদের খবরটা মামুদপুরে ছড়িয়ে পড়ে। সারা গ্রাম মুহূর্তে গরম হয়ে ওঠে। হামলাবাজেরা যখন ধনা বারুইর বাড়িতে চড়াও হবার জন্য তৈরি হচ্ছে, আফজল মাঝিদের নিয়ে বিনুদের বাঁচাতে প্রচণ্ড ঝুঁকি নিয়ে ছুটে আসে।
এক দমে সমস্ত জানিয়ে সেই অচেনা চারটি লোককে দেখিয়ে আফজল হোসেন বিনুকে বলে, এয়ারাই হেই মাঝি। অগো নাওয়েই তারপাশা যাইবেন।
অভিভূত, কৃতজ্ঞ বিনু কী বলবে, কী করবে, ভেবে পায় না। সে শুধু আফজল হোসেনের একটা হাত তুলে দুহাতে জড়িয়ে ধরে।
বিনুর স্পর্শে এমন কিছু রয়েছে যা আফজল হোসেনের বুকের ভেতর আলোড়ন তুলে যায়। গাঢ় গলায় সে বলে, আপনেরে তো কইছিই, মাইনষের লেইগা মাইনষে এইটুক করেই।
বিনু উত্তর দেয় না।
একটা লম্বা, সাই জোয়ান মাঝিকে আফজল হোসেন এবার বলে, হামিদ, তোমার নাও কই?
পাশেই অনেকখানি জায়গা জুড়ে মুত্রা ঝোপ। সেদিকে আঙুল বাড়িয়ে হামিদ বলে, উই ঝোপড়ার আবডালে।
আর সোময় নষ্ট করনের কাম নাই। নাও লইয়া আসো। অহনই ছাড়তে হইব।
নৌকো বার করে নিয়ে এলে আফজল হোসেন সবাইকে নিয়ে ওপরে উঠল। মাঝখানে বড়, উঁচু ছই। সামনে পেছনে গলুইয়ের পর থেকে ছই পর্যন্ত টানা, খোলা ডোেরার ওপর কাঠের পোত্ত পাটাতন। দুই মাঝি বৈঠা নিয়ে পেছনে বসল। তাদের কাছাকাছি পাটাতনে বসল রাজেক আর তমিজ। সামনের গলুইতে বসেছে অন্য দুই মাঝি। বিনু এবং ঝিনুককে ছইয়ের ভেতর যেতে বলে নিজে সামনের দিকের পাটাতনে পা ভাজ করে বসল আফজল হোসেন।
বিনু অবাক হয়ে গিয়েছিল। জিজ্ঞেস করল, আপনি আমাদের সঙ্গে তারপাশা যাবেন?
আফজল হোসেন বলল, হ। গাঙ দিয়া গ্যালেও বিপদ কম না। কাইল রাইতেই তো আল্লার দোয়ায় পরানে বাইচা গ্যাছেন। আমারে সামনের পাটাতনে বইসা থাকতে দেখলে কেও সন্দ করব না’
