চরম বিপদে এই মানুষটাই একমাত্র অবলম্বন। দৈবপ্রেরিতের মতো সে সকালবেলায় তাদের কাছে। এসেছিল। তারপর নদীর পাড়ের জঙ্গল থেকে মামুদপুর গ্রামের এই ঘরে এনে আশ্রয় দিয়েছে। যখনই বিনুর মনোবল ধূলিসাৎ হতে থাকে, সাহস যুগিয়ে সে তার স্নায়ুগুলোকে চাঙ্গা করে রাখে। আশা নষ্ট হলে সবই গেল। সকাল থেকে এই কয়েক ঘন্টায় বিনু বুঝে গেছে, আফজল হোসেন এক কথার মানুষ। যখন বলেছে তারপাশায় পৌঁছে দেবে, নিশ্চয়ই দেবে।
ঝিনুক বরাবরই খুব স্বল্পাহারী। দু’চার গ্রাস খেয়ে জানালার কাছে গিয়ে আঁচিয়ে এল। বিনুরও খাওয়া শেষ। সেও মুখ ধুয়ে আসে। আফজল হোসেন ডাল ভাত মাছ তরকারি যা এনেছিল দুজনে তার অর্ধেকও খেতে পারেনি। ওদিকে রাজেক খাওয়াদাওয়া চুকিয়ে তাদের খালি ডেকচি নিয়ে এ ঘরে এল। আফজল হোসেন তাকে বলল, এইখানের ডেচকি, পানির বালতি, বাসনকোসন লইয়া আমার লগে চল–
সমস্ত কিছু গুছিয়ে নিতে লাগল রাজেক।
বিনুকে খুব সতর্ক হয়ে থাকতে বলে খানিক বাদে রাজেককে সঙ্গে করে চলে গেল আফজল হোসেন।
.
৩.০৫
ঝিনুক আঁচিয়ে এসে ফের শুয়ে পড়েছিল। শোওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘুম। অপার ক্লান্তি, অসীম দুর্বলতা। চোখ মেলে বেশিক্ষণ থাকতে পারছে না সে। মেয়েটার জীবনীশক্তি প্রায় শূন্যে গিয়ে ঠেকেছে।
আফজল হোসেনরা চলে যাবার পর অনেকক্ষণ ঝিনুকের শিয়রের কাছে বসে রইল বিনু। মাথায় একবার হাত রাখল। সাড় নেই। রোগা, রক্তশূন্য, ফ্যাকাসে হাতটা তুলে নিল। ঝিনুক টেরই পেল না। তার সারা শরীর ঘিরে এমন এক আচ্ছন্নতা, যা মোটেই স্বস্তি দেয় না।
সামনের দিকের দরজা জানালা আগেই বন্ধ করে দিয়েছিল বিনু। আফজল হোসেন বাইরের শেকলও তুলে দিয়ে গেছে। একসময় বিনু ঝিনুকের তক্তপোষ থেকে উঠে এসে পেছনের খোলা জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল।
পশ্চিম দিকটা বোধহয় এধারে। দিন ফুরিয়ে এসেছে। খালের ওপারে ধানখেতগুলোর ওপর নিস্তেজ, মরা রোদ গুটিসুটি মেরে পড়ে আছে। সূর্যটাকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। ধানখেতের শেষ মাথায় যেখানে গাছপালার ধ্যাবড়া রেখা দিগন্তের গায়ে লেপটে আছে, সূর্য নিশ্চয়ই তার ওধারে নেমে গেছে।
বেলা হেলতেই কুয়াশা পড়তে শুরু করেছিল। প্রথমে ছিল মিহি। ক্রমশ গাঢ় হয়ে সমস্ত চরাচর ঢেকে দিচ্ছে। আগের মতোই ঝিঁঝি ডাকছে, কাঠঠোকরারা গাছের গুঁড়িতে সমানে তুরপুন চালিয়ে যাচ্ছে। কোথায় যেন একটা তক্ষক অদ্ভুত শব্দ করে উঠল।
লম্বা পায়ে সন্ধে ধেয়ে আসছিল। দেখতে দেখতে হেমন্তের দিনটা শেষবেলার রোদটুকু গুটিয়ে নিয়ে উধাও হল। কুয়াশায় আর অন্ধকারে মেশামেশি হয়ে চারদিক ঝাঁপসা হয়ে যেতে লাগল। জোনাকিরা কোথায় যেন গা-ঢাকা দিয়ে ছিল। সন্ধে নামতেই বেরিয়ে পড়েছে। অন্ধকারে আলোর ফেঁড় তুলে তুলে নেচে বেড়াচ্ছে।
মশাদের হিংস্র একটা বাহিনী মানুষের রক্তের গন্ধ পেয়ে জানালা দিয়ে ঝড়ের গতিতে ঢুকে পড়ে। বিনুর ওপর তো বটেই, ঝিনুকের চোখেমুখেও তারা ঝাঁপিয়ে পড়েছে।
ঘরে আলো নেই। বিনু সিগরেট খায় না যে পকেটে দেশলাই থাকবে। রাজেকের নৌকোয় বেতের ঝুড়িতে একটা পাঁচ ব্যাটারির টর্চ ছিল। হানাদারেরা নৌকোসুদ্ধ টর্চ ফর্চ সব নিয়ে চলে গেছে। রাত্তিরে যে বিনুদের এখানে থাকতে হতে পারে, আফজল হোসেন খেয়াল করেনি। করলে নিশ্চয়ই লণ্ঠন বা কুপি দিয়ে যেত।
ক্ষিপ্র হাতে জানালা বন্ধ করে ঝিনুকের কাছে চলে এল বিনু। মশারা মেয়েটার গালে কপালে সমানে উঁচ বিধিয়ে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে ঝিনুকের গলা থেকে ক্ষীণ, কাতর আওয়াজ বেরিয়ে আসছে, উঁ অ্যাঁ–। কাল রাত থেকে এখন পর্যন্ত মশারা মেয়েটার গা থেকে কতটা রক্ত শুষে নিয়েছে, কে জানে।
এই ঘরে ঢোকার পর বোরখা খুলে ফেলেছিল ঝিনুক। সেটা তুলে নিয়ে জোরে জোরে নাড়তে নাড়তে মশা তাড়াতে লাগল বিনু। কিন্তু মশাগুলো খুবই ধুরন্ধর, ফাঁক দিয়ে দিয়ে ঢুকে কামড় বসাতে লাগল।
কতক্ষণ মশা তাড়িয়েছিল, খেয়াল নেই। হঠাৎ বাইরে শেকল খোলার শব্দ শোনা গেল। তারপরই আফজল হোসেনের স্ত, চাপা গলা কানে আসে, তরাতরি কপাট খোলেন–
রাজেকও একই সুরে ডাকাডাকি করছে, দেরি কইরেন না ছুটোবাবু, জবর বিপদ–
দু’জনেরই কণ্ঠস্বরে যা আছে তা হল অস্বাভাবিক আতঙ্ক এবং কাপুনি। হঠাৎ রাজেকদের এত ভয়ের কারণ কী হতে পারে, বোঝা যাচ্ছে না। বিনু আন্দাজ করল, তাদের নিয়েই মারাত্মক কিছু ঘটেছে। পলকে ঠান্ডা, কনকনে ত্রাস তার মধ্যেও চারিয়ে গেল।
আফজল হোসেন শেকল খুলে দিলেও ভেতরে খিল আটকে রেখেছিল বিনু। তার হাত-পা ভীষণ থরথর করছে। সেই অবস্থাতেই খিল খুলল সে। সঙ্গে সঙ্গে আফজল হোসেন এবং রাজেক প্রায় ঝাঁপিয়ে ঢুকে পড়ল।
আফজলের হাতে বড় টর্চ ছিল, সেটা জ্বালতেই জোরালো আলোয় ঘর ভরে গেল। ব্যগ্র গলায় সে বলল, অখনই আপনেগো এখান থিকা চইলা যাইতে হইব। এই কি, বিবিসাব ঘুমায় দেখি! ওনারে। তোলেন। দেরি করনের সোময় নাই।
খোলা দরজা দিয়ে বাইরের উঠোনে পাঁচজনকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে। কুয়াশা মাখা অন্ধকারে পাঁচটি ঝাঁপসা ছায়ামূর্তি। শরীরের কাঠামো থেকে চেনা গেল, এদের একজন তমিজ। বাকি চারজন অচেনা। ওরা কারা, কে জানে। তবে আফজল হোসেন যখন সঙ্গে করে নিয়ে এসেছে, ওদের দিক থেকে দুর্ভাবনার কিছু নেই।
