ঝিনুক আর আপত্তি করল না, তক্তপোষ থেকে নেমে পড়ল। জলের বালতির গায়ে একটা সিলভারের মগ আটকানো ছিল। সেটা খুলে নিয়ে বালতি থেকে জল তুলে বাধ্য মেয়ের মতো পেছনের জানালার কাছে গিয়ে কয়েক আঁজলা চোখেমুখে ছিটলো। তারপর কুলকুচি করে মুখের জল জানালার বাইরে ফোয়ারার মতো ছুঁড়ে দিল।
জলের স্পর্শে মুখটা এখন বেশ নরম লাগছে। কপালের শিরাগুলোর দপদপানি আর নেই। ঘুমটাও কেটে গেছে।
বিনুও মুখ ধুয়ে এল। ঘরের কোণে ক’টা কাঠের পিঁড়ি এবং জলচৌকি উঁই হয়ে পড়ে আছে। অফজল হোসেন একটা জলচৌকি টেনে বসতে বসতে বলল, তরাতরিতে বেশি কিছু আনতে পারি। মাই। ন্যান (নিন), খান। ডেচকিতে থাল (থালা), গ্যালাস, চাইমচা (চামচ), হগল আছে।
অল্প সময়ের মধ্যে মোটামুটি ভালই ব্যবস্থা করেছে আফজল হোসেন। সরু চালের ধবধবে ভাত, বেগুন ভর্তা, নানারকম আনাজ দিয়ে পাঁচমেশালি তরকারি, টাটকিনি মাছের পাতুরি আর রসগোল্লা।
ডেকচির কোনা থেকে চিনা মাটির নকশা-করা থালা গেলাস ইত্যাদি বার করে ভাত তরকারি মাছ টাছ সাজিয়ে ঝিনুককে দিল বিনু। নিজেও নিল।
খেতে খেতে বিনুর মস্তিষ্কে অদ্ভুত একটা চিন্তা পাক খায়। যাদের প্রতি অপার বিদ্বেষ এবং ঘৃণা নিয়ে সে এ দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছে, তাদেরই একজন, যাকে সে আগে কোনও দিন দেখেনি পর্যন্ত, এমন এক পরিত্যক্ত নিঝুম বাড়িতে, কাছে বসে ঘনিষ্ঠ পরিজনের মতো তাকে আর ঝিনুককে খাওয়াচ্ছে–এটা যেন সত্যি নয়। খাপছাড়া স্বপ্নের মতো মনে হয়।
আফজল হোসেন হঠাৎ বলল, জানেন, আরেটু হইলে ধরা পইড়া যাইতাম। উপুরআলার দোয়ায় জবর বাইচা গেছি।
থালা থেকে ভাতের গ্রাস তুলতে গিয়ে থমকে যায় বিনু। ভীরু গলায় জিজ্ঞেস করে, কী হয়েছিল?
আফজল হোসেন জানায়, তোকজনের চোখে যাতে না পড়ে সে জন্য গ্রামের বাইরে ধানখেতের ভেতর দিয়ে ঘুরে ঘুরে রাজেককে নিয়ে এখানে আসছিল সে। ঘুরপথে আসার কারণ, কেউ দেখে ফেললে, ডেকচি আর জলের বালতি নিয়ে কোথায় চলেছে, গ্রামের ভেতর সিধা রাস্তা থাকতে ধানখেতে কেন, এমনি হাজার গণ্ডা জবাবদিহি করতে হবে। খানিকটা আসার পর চোখে পড়ল, উলটো দিক থেকে আলপথ ধরে রহিম মাস্টার আসছে। নির্বিঘ্নে কিছু কি হবার যো আছে! সামান্য জেলে জোলা চাষী টাষী হলে ধমকধামক দিয়ে চুপ করিয়ে রাখা যায়। কিন্তু রহিম মাস্টার মান্যগণ্য লোক, স্থানীয় আপার প্রাইমারি স্কুলে পড়ায়। সে কোনও প্রশ্ন করলে জবাব দিতেই হয়। অগত্যা রাজেককে নিয়ে আল থেকে ধানখেতের অনেকখানি ভেতরে গিয়ে চুপচাপ লুকিয়ে ছিল আফজল হোসেন। রহিম মাস্টার ধানখেত পেরিয়ে গ্রামে ঢুকে যাবার পর তারা ফের আলপথে ফিরে আসে, তারপর সোজা এখান না, রহিম ছাড়া আর কারোর সঙ্গে তাদের দেখা হয়নি।
দমবন্ধ করে শুনে যাচ্ছিল বিনু। এবার তার বুকের ভেতর থেকে আবদ্ধ বাতাস ধীরে ধীরে বেরিয়ে এল। পরক্ষণে অন্য একটা দুশ্চিন্তা তার মাথায় ভর করে।
বিনু বলল, এত ভাত তরকারি মাছ কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন, আপনার বাড়ির লোকেরা জানতে চাননি?
আফজল হোসেন বলল, চাইছিল। তাগো কইছি পরে জানামু। হের পর কেউ আর কিছু জিগায় নাই।
বিনু আন্দাজ করে নিল, নিজের বাড়িতে লোকটার প্রচণ্ড দাপট। পরে জানাবে বলার পর কেউ দ্বিতীয় বার কৌতূহল প্রকাশ করতে সাহস পায়নি।
কিছুক্ষণ চুপচাপ। তারপর বিনু সঙ্কোচের সুরে বলে, আফজল সাহেব, সেই সকাল থেকে আমাদের। জন্যে কী কষ্টই না করছেন! এত ছোটাছুটি! তা ছাড়া, লোকে আমাদের খবরটা পেয়ে গেলে আপনার। বিপদও কম হবে না। কিন্তু যে অবস্থায় আমরা
হাত তুলে বিনুকে থামিয়ে দিয়ে আফজল হোসেন বলে, কষ্টের কথা কইতে আছেন! মাইনষের লেইগা মাইনষের এইটুক তো করতেই হয়। আর বিপদের কথা কন? এই লইয়া ভাবি না। উপরআলা আছে, তেনিই (তিনিই) ভরসা। অহন ভালায় ভালায় আপনেগো তারপাশায় পৌঁছাইয়া দিতে পারলে নিশ্চিন্ত হইতে পারি।
এই মুহূর্তে তাদের জন্য আফজল হোসেন কী মারাত্মক ঝুঁকি নিয়েছে, সেটাই ভাবছিল বিনু। তারপাশায় পৌঁছনোর চিন্তাটা ফের তার মাথায় ফিরে এসে অসহ্য চাপ দিতে থাকে। উদ্বিগ্ন মুখে সে জিজ্ঞেস করে, স্টিমারঘাটে যাবার কিছু ব্যবস্থা হল?
না। মাথা নাড়তে নাড়তে আফজল হোসেন বলে, ইট্ট সোময় লাগব
সময়? আজ কি তা হলে এই মামুদপুর গ্রাম থেকে তাদের যাওয়া হচ্ছে না? ধনা বারুইর ছেড়ে যাওয়া বাড়িতেই আটকে থাকতে হবে? বিনুর উৎকণ্ঠা লাফিয়ে লাফিয়ে অনেকখানি চড়ে যায়। শুকনো গলায় জিজেস করে, কতটা সময় লাগবে?
আফজল হোসেন বলে, ক্যামনে কই? গাঙ পাড়ি দিয়া তারপাশায় যাওনের নাও তো মেলাই (নৌকো তো অনেকই আছে। কিন্তুক বিশ্বাসী মাঝি পাওন দরকার। কার মনে কী বিষ রইছে, বাইরে থিকা তো ট্যার পাওন যায় না। বুইঝা শুইনা বন্দবস্ত করতে হইব। দেখা যাউক।
অর্থাৎ, যতক্ষণ না এমন মাঝি পাওয়া যাচ্ছে যে সম্পূর্ণ নির্ভরযোগ্য, যে কোনও রকম ক্ষতি করবে না, বিনুদের পরিচয় জানতে পারলেও টু শব্দটি করবে না, আফজল হোসেন খুব সম্ভব এমন কারোর খোঁজে আছে। বিনুদের ব্যাপারে সামান্য ঝুঁকিও সে নিতে চাইছে না।
বিনু অস্পষ্ট গলায় বলে, হ্যাঁ।
বিপন্ন যুবকটির শঙ্কাতুর মুখের দিকে তাকিয়ে হয়তো মায়াই হয় আফজল হোসেনের। আশ্বাস দেবার সুরে বলে, ডরাইয়েন না, য্যামন কইরা পারি আপনেগো তারপাশায় লইয়া যামুই।
