আধ ঘন্টাও লাগল না, বিনুর চোখের সামনে হাসেম এবং মতিন দুখানা নতুন টিন খুলে মাথায় চাপিয়ে আরও দূরে ঘন গাছগাছালির আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেল।
বিনু আন্দাজ করে নিল, দু’চারদিনের মধ্যে শুধু ওই ঘরটারই না, রাজেন শীলের বাড়ির অন্য ঘরগুলোর চালের টিন, দরজা জানালা খুলে নিয়ে যাবে মতিন, হাসেম বা গ্রামের আর কেউ। অন্য যারা সাত পুরুষের ভদ্রাসন ছেড়ে চলে গেছে, তাদের পরিত্যক্ত ঘরবাড়ির হালও ওইরকমই হবে। বিনুর মনে হল, যুগীরা কুমোররা বামুন কায়েতরা যে প্রজন্মের পর প্রজন্ম এখানে বাস করে গেছে, হয়তো একদিন তার সামান্য চিহ্নটুকুও অবশিষ্ট থাকবে না। হঠাৎ হেমনাথের কথা মনে পড়ল। তিনি প্রতিজ্ঞা করেছেন, জন্মভূমি ছেড়ে কোথাও যাবেন না। অসীম মনোবল তার, দেশের প্রতি অফুরান আবেগ। কিন্তু তিনিও কি শেষ পর্যন্ত রাজদিয়ার মাটি আঁকড়ে পড়ে থাকতে পারবেন? কে জানে।
মতিনরা রাজেন শীলের ঘরের টিন খুলে নিয়ে যাবার পর একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে বিনু। এখন চারদিক একেবারে সুনসান। শুধু পাখির ডাক, ঝিঁঝির ডাক এবং গাছের গুঁড়িতে কাঠঠোকরাদের ঠোঁটের অবিরত ঠক ঠক ছাড়া যতদূর চোখ যায়, সব নিস্তব্ধ।
খুবই অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিল বিনু। সূর্য যখন আকাশের ঠিক মাঝামাঝি থেকে পশ্চিম দিকে খানিকটা হেলে গেছে, সেই সময় ফের কাদের গলা শোনা গেল। বিনু ত্রস্তভাবে জানালার পাল্লা বন্ধ করতে যাচ্ছিল, দেখতে পেল, আফজল হোসেন এবং রাজেক সামনের কাঁচা রাস্তা দিয়ে এদিকে আসছে। আফজলের হাতে কলাপাতা ঢাকা দেওয়া একটা বড় ডেকচি। রাজেকের ডান হাতে ওই মাপেরই আরেকটা ডেকচি, সেটার ওপরও কলাপাতা। তার বাঁ হাতে জল ভর্তি টিনের বালতি। জানালা খোলা দেখলে আফজল হোসেন হয়তো অসন্তুষ্ট হবে, তাই সেটা আস্তে টেনে বন্ধ করে দিল বিনু।
একটু পর সিঁড়ির ধাপে পায়ের আওয়াজ পাওয়া গেল। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই রাজেক ডাকল, কপাট খোলেন ছুটোবাবু–
বিনু দরজা খুলে দিতেই রাজেক আর আফজাল হোসেন ঘরে ঢুকে পড়ল। আফজল রাজেককে বলল, পানির বালতিখান এহানে নামাইয়া কান্ধের ডেচকি (ডেকচি) লইয়া উই ঘরে গিয়া দুইজনে খাইয়া লও–বলে উঠোনের ওধারের ঘরটা দেখিয়ে দিল। বিনু জানত না, ধনা বারুইর ছাড়া-বাড়ির এই ঘরখানায় তাদের পৌঁছে দেবার পর রাজেককে সঙ্গে করে মামুদপুর গ্রামের ভেতর দিকে নিজের বাড়িতে চলে গিয়েছিল আফজল হোসেন। ভাত তরকারি জলটল বয়ে আনার জন্য। বাড়ির লোকজন বা গ্রামের কাউকে দিয়ে আনালে তাদের খবরটা মুহূর্তে চারদিকে চাউর হয়ে যেত। রাজেককেই শুধু নিয়ে গিয়েছিল আফজল। তমিজ নিশ্চয়ই উলটো দিকের ঘরে জানালা কপাট বন্ধ করে বসে আছে।
রাজেক দরজার দিকে পা বাড়াতে যাবে, আফজল হোসেন বলল, তরাতরি খাইয়া ডেচকি নিয়া আইসো। এনাগো খাওন হইলে খালি বালতি ডেচকি নিয়া আমার লগে আমাগো বাড়ি যাইবা। বলতে বলতে নিজের হাতের ডেকচিটা মেঝেতে নামিয়ে রাখল।
আইচ্ছা- মাথা হেলিয়ে ঘরের বাইরে বেরিয়ে গেল রাজেক।
পেছনের খোলা জানালার দিকে এবার নজর পড়ল আফজল হোসেনের। সে জিজ্ঞেস করল, উইটা তো বন্ধ আছিল। ঘরে ঢুইকা বুঝিন খুইলা দিছিলেন?
বিনু বেশ ঘাবড়ে যায়। জানালাটা খোলার কারণে আফজল হোসেন কতটা অসন্তুট হয়েছে, বুঝবার জন্য তার মুখের দিকে তাকায়। ভয়ে ভয়ে বলে, ঘরটা খুব অন্ধকার। তাই–
ঠিক আছে। উই দিকে মানুষজন বড় এট্টা আসে না। বলতে বলতে তক্তপোষের দিকে তাকাল আফজল, বিবিসাবে ঘুমাইতে আছে। অহন জাগাইলে কথা শেষ না করে কুণ্ঠিতভাবে থেমে গেল।
পেছনের জানালা খোলার জন্য মারাত্মক অপরাধ যে হয়ে যায়নি, ব্যাপারটা হালকাভাবেই নিয়েছে আফজল হোসেন, এতে স্বস্তিবোধ করে বিনু। সে জানায়, শারীরিক এবং মানসিক দিক থেকে ঝিনুক এমনই বিপর্যস্ত যে বসে থাকতে পারছিল না। শুইয়ে দেবার সঙ্গে সঙ্গে ঘুমিয়ে পড়েছে।
সহানুভূতির সুরে আফজল হোসেন বলে,হ, শরীলের আর দোষ কী। অ্যামনেই বিবিসাবু রোগা মাইয়া, গায়ে জোর-বল নাই। হের (তার) উপুর যা তাফাল যাইতে আছে। কিন্তুক
উৎসুক চোখে তাকাল বিনু, কোনও প্রশ্ন করল না।
আফজল হোসেন বলতে লাগল, মেলা বেইল (অনেক বেলা) হইয়া গ্যাছে। উনার ঘুম। ভাঙ্গাইয়া খাইতে কন। প্যাটে ভাত পড়লে শরীলে তাকত আইব।
বিনু তক্তপোষের কাছে গিয়ে ডাকাডাকি করতে লাগল, ঝিনুক-–ঝিনুক–
ঘুমের ঘোরে বারকয়েক হুঁ হাঁ করার পর উঠে বসল ঝিনুক। চোখ আধখোলা, লালচে। মাথা অল্প অল্প দুলছে। কপালের দুপাশের শিরা দপদপ করছে। জড়ানো গলায় সে বলল, ডাকছ কেন?
বিনু উত্তর দেবার আগে আফজল হোসেন বলল, আগে চৌখে পানি দ্যান। ঘুমের চটকা দুইটা যাইব। হের পর দু’গা (দুটি) খাইয়া লন।
অন্য লোকের গলা শুনে পুরোপুরি চোখ মেলে তাকায় ঝিনুক। আফজল হোসেনের দিকে তাকিয়ে বলে, আমার খেতে ইচ্ছা করছে না।
আফজল হোসেন ঝিনুককে বোঝায়, খেতে ইচ্ছা না করলেও খেতে হবে। এখান থেকে তারপাশা, তারপাশা থেকে গোয়ালন্দ, গোয়ালন্দ থেকে কলকাতা। পথ তো একটুখানি নয়। তা ছাড়া, দিনকাল আগের মতো সহজ, স্বাভাবিক নেই। এখন পদে পদে সংকট, সমস্ত কিছুই ঘোর অনিশ্চয়তায় ভরা। শরীরে শক্তি থাকলে তবু খানিকটা যোঝা যায়।
