হ। ক্যামনে যে সোংসার চলব, উপরআলাই জানে। অতগুলা প্যাট (এতগুলো পেট)।
হাসেমদের কথা শুনে বিনুর মনে হচ্ছে, ওরা কামলা শ্রেণীর মানুষ, হদ্দ গরিব। গ্রামের বড় ধানী গৃহস্থদের, বিশেষ করে বামন কায়েতদের বাড়ি এবং জমিতে কাজ করে পেটের ভাত জোটাত। পয়সাওলা। হিন্দুরা চলে যাওয়ায় তারা বিপাকে পড়ে গেছে।
কপাটে কান রেখে রুদ্ধশ্বাসে দাঁড়িয়ে ছিল বিনু। না, ওই লোকদুটোর দিক থেকে দুশ্চিন্তার কোনও কারণ নেই। আফজল হোসেনের ভয়ে তারা অন্তত এই বাড়িতে আঙুল ছোঁয়াতে সাহস করবে না। শেকল খুলে এই ঘরে তাদের ঢোকারও সম্ভাবনা নেই। ধনঞ্জয় বারুইর পরিত্যক্ত বাস্তুভিটাতে দাঁড়িয়ে তারা শুধু আক্ষেপই করতে পারে। তার বেশি কিছু নয়।
কথা বলতে বলতে মতিন এবং হাসেম একসময় চলে যায়। তাদের গলার স্বর ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসতে থাকে। এই মুহূর্তে, অদ্ভুত এক পরিস্থিতিতে জীবনমৃত্যুর মাঝখানের সূক্ষ্ম সীমারেখায় যখন তারা দাঁড়িয়ে আছে, ওই দুটো গরিবের চাইতেও গরিব মানুষের প্রতি সহানুভূতিই বোধ করে বিনু। ঘরের সব জানালাকপাট বন্ধ। হাসেম আর মতিনকে দেখার উপায় ছিল না, তবু হতদরিদ্র লোকদুটো তার মনে ছাপ রেখে যায়।
দরজার পাশ থেকে ঝিনুকের কাছে চলে আসে বিনু। মেয়েটা গভীর ঘুমে ডুবে আছে। শ্বাসপ্রশ্বাসের তালে তালে তার বুক খুব ধীরে ধীরে ওঠানামা করছে। কয়েক পলক ঝিনুকের দিকে তাকিয়ে থাকার পর ফের পেছনের সেই জানালাটার কাছে চলে আসে সে। যতক্ষণ পারে ঝিনুক ঘুমোক। ঘুম কিছুটা সময়ের জন্য হলেও মস্তিষ্ক থেকে দুর্ভাবনা, ভয়, আতঙ্ক মুছে দেয়।
সাবধানে জানালার পাল্লা খুলে নলখাগড়ার ঝোপ, খাল, খালের ওধারে আদিগন্ত ধানের খেতগুলের দিকে তাকাল বিনু। এই জানালাটাই এই মুহূর্তে বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে তার যোগাযোগের একমাত্র পথ।
কতকাল ধরে হেমন্ত ঋতুর জল-বাংলাকে দেখে আসছে বিনু। সোনালি-সবুজে ভরা ধানের খেত, ঠাণ্ডা নরম রোদ, আকাশের এ কোণে ও কোণে ছন্নছাড়া নিরীহ কিছু মেঘ, হালকা কুয়াশা, আকাশের নীল ছুঁয়ে ছুঁয়ে ঝাঁকে ঝাঁকে ভাসমান শঙ্খচিল, বসুন্ধরার এই প্রান্তে প্রকৃতির সমস্ত কিছু আগের মতোই রয়েছে। কোথাও এতটুকু হেরফের নেই। কিন্তু মানুষ? আগাগোড়া প্রায় সবাই বদলে গেছে। কী প্রচণ্ড রিষ, কী তীব্র শক্রতা তাদের মনে! চোখেমুখে কী ভয়ঙ্কর আক্রোশ! আবহমান কালের নিসর্গ ঋতুতে ঋতুতে একই নিয়মে পাক খেয়ে যায়। গ্রীষ্মের পর বর্ষা আসে, বর্ষার পর শরৎ হেমন্ত শীত বসন্ত। হাজার বছর আগে হেমন্ত যা ছিল, আজও তা-ই আছে। কিন্তু মাত্র কয়েক বছর আগের মানুষ আর তেমনটি নেই। মানুষের মতো অন্য কিছুই বুঝি বদলে যায় না।
যতক্ষণ না আফজল হোসেন তাদের তারপাশায় পৌঁছনোর ব্যবস্থা করে দিচ্ছে, এই ঘরে আটকে থাকতে হবে। অনবরত আতঙ্কের মধ্যে থাকলে তার উগ্রতা বোধহয় কমে আসে। অনুভূতিগুলো কেমন। যেন ভোতা হয়ে যায়। ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তায় ভরা, কিন্তু তা নিয়ে এখন সেভাবে ভাবেছ না বিনু। দু’চোখে অপার শূন্যতা নিয়ে অনেক দূরে হেমন্তের শস্যক্ষেত্রগুলোর ওধারে ঝাঁপসা দিগন্তরেখার দিকে তাকিয়ে থাকে সে।
হঠাৎ একটানা তীক্ষ্ণ ধাতব আওয়াজ কানে আসে। বিনু চমকে ওঠে। চোখ দুটো জানালার খুব কাছে নিয়ে বাইরের দিকটা ভাল করে দেখতে চেষ্টা করে। কিন্তু এধারে জঙ্গল টঙ্গল ছাড়া অন্য কিছু নেই। নোকজন বা বাড়িঘর চোখে পড়ছে না। মামুদপুর গ্রামের বাড়ি টাড়ি সবই সামনের দিকে।
কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকার পর উঠোনের দিকের একটা জানালার কাছে চলে এল বিনু। কান খাড়া করে বুঝার চেষ্টা করল, শব্দটা ঠিক কোত্থেকে আসছে। মনে হল, খুব কাছে নয়, বেশ খানিকটা দূরে কেউ লোহা বা ওই জাতীয় কোনও ধাতুর ওপর শক্ত ভারী কিছু দিয়ে ক্রমাগত ঘা মারছে।
আফজল হোসেন সাবধান করে দিয়েছিল, তবু ভীষণ কৌতূহল হচ্ছে বিনুর। খুব সন্তর্পণে জানালাটা খুলে এক আঙুলের মতো ফাঁক করল সে। না, উঠোনে কেউ নেই। সাহস করে জানালাটা আরও একটু খুলল। উঠোনের ওধারে রাজেক এবং তমিজ যে ঘরটায় আছে, সেটার দরজা জানালা বন্ধ। অর্থাৎ আফজল হোসেনের নিষেধাজ্ঞা তারা অক্ষরে অক্ষরে পালন করে চলেছে।
জানালা খোলার সঙ্গে সঙ্গে ধাতব শব্দটা আরও স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। এবার হদিস পাওয়া গেল। এই ঘর থেকে কোনাকুনি প্রায় শ’পাঁচেক হাত দূরে দু’টো লোক একটা ঘরের চালে বসে আছে। একজন হাতুড়ি জাতীয় কিছু দিয়ে সামনে বাড়ি মারছে। আরেকজন অন্য কোনও যন্ত্র ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে কী যেন খুলবার চেষ্টা করছে। খুব সম্ভব দুই টিনের জোড়ের মুখের ভ্রু বা পেরেক।
চট করে সেই লোক দুটোকে মনে পড়ে গেল। খানিকক্ষণ আগে এ বাড়ির উঠোনে দাঁড়িয়ে তারা কথা বলছিল। অবশ্য তখন বন্ধ দরজার এধার থেকে তাদের দেখা সম্ভব ছিল না। নিশ্চয়ই ওরা হাসেম এবং মতিন, আর দূরের ওই ঘরটা কোনও এক রাজেন শীলের। বিনু আগেই শুনেছিল, হাসেমরা রাজেন শীলের ঘরের টিন খুলে নিয়ে যাবে। এখন সেই কাজটাই করছে।
একদৃষ্টে তাকিয়েই আছে বিনু। হাসেম এবং মতিনকে দেখতে দেখতে হঠাৎ রাজেন শীলের জন্য অদ্ভুত বিষাদে তার মন ভরে যায়। লোকটাকে সে দেখে নি, কোনওদিন দেখা হওয়ার সম্ভাবনাও নেই। পিতৃপুরুষের বাসস্থানে নতুন টিন দিয়ে ঘর ছেয়েছিল রাজেন। এই বাড়ির সঙ্গে কত মায়ায় জড়িয়ে ছিল সে। হয়তো ভেবেছিল, বাপ-ঠাকুরদার মতো সন্তানসন্ততি নিয়ে আজীবন এখানেই কাটিয়ে যাবে। ভেবেছিল, মামুদপুর গ্রামের ভিটেমাটির সঙ্গে তাদের বন্ধন অচ্ছেদ্য। গভীর মমতা দিয়ে পুরুষানুক্রমে যা তারা গড়ে তুলেছিল, কে ভাবতে পেরেছে, একদিন সেখান থেকে অস্তিত্বের সবগুলো শেকড় উপড়ে নিয়ে সীমান্ত পেরিয়ে ওপারে চলে যেতে হবে?
