কাত হয়ে শুয়ে আছে ঝিনুক, চোখ এখন সম্পূর্ণ বোজা। খুব আস্তে আস্তে শ্বাস টানছে সে।
একটু চুপচাপ।
তারপর ঝিনুক ফিস ফিস করে বলে, আমি তোমাকে ভীষণ বিপদে ফেলে দিয়েছি।
বিনু চকিত হয়ে ওঠে, কী বলছ তুমি!
ঠিকই তো বলছি। আমার জন্যেই তোমার এত কষ্ট, এত ভোগান্তি। পুরুষমানুষ–একা থাকলে একটা না একটা উপায় করে চলে যেতে পারতে। আমি তোমার ওপর বোঝার মতো চেপে আছি। আমার জন্যে কখন যে তোমার কী ক্ষতি হয়ে যাবে!
এই সব বাজে চিন্তা ছাড়। এখন ঘুমোও।
বিনু গভীর মমতায় ঝিনুকের রুক্ষ চুলে হাত বুলিয়ে দিতে থাকে। আর কোনও কথা বলে না ঝিনুক। গাঢ় ঘুমে ক্রমশ আচ্ছন্ন হয়ে যায়।
কতক্ষণ কেটে গেছে, বিনুর খেয়াল নেই। ঝিনুকের চুলে দূরমনস্কর মতো আঙুল বুলিয়ে যাচ্ছিল সে।
খোলা জানালাটার বাইরে রোদের তেজ বেশ বেড়েছে। সূর্যটাকে দেখা যাচ্ছে না, তবে বোঝা যায়, সেটা আকাশের অনেকটা উঁচুতে উঠে এসেছে। এতক্ষণ নলখাগড়ার বনে ডাহুক আর ঝিঁঝি ডাকছিল। এখন তাদের সঙ্গে ঘুঘুরা গলা মিলিয়েছে। এই সমবেত কণ্ঠস্বর চারপাশের স্তব্ধতাকে আরও নিবিড়, আরও ঘনীভূত করে তুলেছে যেন।
হঠাৎ পাখি এবং পতঙ্গের ডাকাডাকি ছাপিয়ে উঠোনের দিক থেকে মানুষের গলা ভেসে এল। আফজল হোসেনই কি ফিরে এসেছে? কিন্তু তার তো দুপুরের আগে ফেরার কথা নয়। সূর্যটাকে দেখা গেলেও, বাইরের রোদের রং দেখে বোঝা যায় না, এখনও সেটা খাড়া মাথার ওপর উঠে আসেনি।
বুকের ভেতরটা ধক করে ওঠে বিনুর। চকিতে ঝিনুকের শিয়রের কাছ থেকে উঠে গিয়ে খোলা জানালাটা বন্ধ করে দেয় সে। যারা উঠোনে কথা বলছে তাদের ভেতর যদি আফজল হোসেন না থাকে, আর কোনও কারণে ওরা বাড়ির পেছন দিকে চলে আসে তার পরিণতি কী হতে পারে, সেটা। ভাবতেই শিরদাঁড়ার ভেতর দিয়ে হিমস্রোত বয়ে গেল বিনুর।
জানালার কাছ থেকে বিনু সামনের দরজার পাশে এসে কাঠের পাল্লায় কান রেখে, স্নায়ুমণ্ডলী টান টান করে দাঁড়িয়ে রইল। গলার স্বর এবার স্পষ্ট। বোঝা যাচ্ছে, দুজন লোক উঠোনে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের কথাগুলো পরিষ্কার শুনতে পাচ্ছে সে।
একজন বলল, ধনা বারইর ছাড়া-বাড়িটার উপুর আমার চৌখ আছিল। কী বাহারের ঘরগুলা! নয়া টিনের চাল, উচা ভিত।
দ্বিতীয় জন বলল, ঘরদুয়ার লইয়া আমি ভাবি না। কানির পর কানি জমিন ধনা বারইর। বীজধান ফালাও, ফনফনাইয়া চারা বাইর হয়, সার দেওন লাগে না। এক এক কানিতে পঁচিশ তিরিশ মোণ ধান ফলবই। হেয়া ছাড়া, ধর গা (ধর গিয়ে), রবি ফসলের খন্দে তিল, কলই, সউরষা (সর্ষে) তো আছেই। দুই চাইর কানি যদিন পাইতাম-–
প্রথম জন বলল, হুদা (শুধু তর আর আমারই রে হাসমা, ধনা বারই আর গোসাইগো জমিজেরাত ভিটামাটির উপুর গেরামের মেলা মাইনষের নজর। গোসইগো বাড়িঘর পুইড়া ছাই। তাগো দ্যাড় শ’ কানি জমিনে খুটি কুইপা (পুঁতে) চিলবিলা কইরা বছির হালিম তালাতরা ভাগ কইরা নিছে। আমরা দূরে খাড়ইয়া বুইড়া আঙ্গুল চোষলাম। বছিররা যা ডাকাইত, কাছেই ঘেষতে দিল না।
হাসমা, অর্থাৎ হাসেম নামের লোকটা বলল, ঠিকই কইছ মতিনচাচা, আমাগো নসিবে ঠনঠনঠন। একখান কথা খালি ভাবতে আছি, গোসাইগো দুই পোলা কইলকাতায় থাকে। হেরা (তারা) যদিন গেরামে আইসা জমিন বুইঝা লইতে দারোগা পুলিশের কাছে যায়, তহন কী হইব?
দেখতে না পেলেও আন্দাজ করা যাচ্ছে, মতিন যার নাম সে বয়স্ক লোক, আর হাসেম অল্পবয়সী।
মতিন বলল, পরে কী হইব, ক্যাঠা জানে। যুগীগো, বামনগো, কুমারগো কেওর কেওর (কারোর কারোর জমিন বেদখল হইয়া গ্যাছে। আবার মেলা (অনেক) ছাড়া-বাড়ি আর জমিন অ্যামনেই পইড়া আছে। হেই দিকে অহন তরি (এখনও পর্যন্ত) কেও হাত বাড়ায় নাই।
হাসেম বলল, আইজ বাড়ায় নাই। দুই চাইর মাস দেইখা হাত যে বাড়াইব না, ক্যাঠা কইব (কে বলবে)?
মতিন এবং হাসেমের কথা শুনে মনে হচ্ছে, মামুদপুর গ্রামের যে বাসিন্দারা সীমান্তের ওপারে চলে গেছে তাদের অনেকেরই ছেড়ে-যাওয়া জমিজমা অন্যেরা দখল করে নিয়েছে। মামুদপুরেরই শুধু নয়, নানা জায়গায় এমন বেদখল হবার খবর আগেই শুনেছে বিনু।
মতিন বলল, ধনা বারইর বাড়িখান মাঝেমইদ্যে আইসা দেইখা যাই। কিন্তুক এইহানে হাত ছোঁয়ানের উপায় নাই।
হাসেম বলে, হ, জানি। ধনা বারই জবর চতুর। দ্যাশ ছাড়নের আগে বিষয় আশয় বড় মিঞার হাতে দিয়া গ্যাছে। বড় মিঞা হইল এহানকার পিছিডাং (এখানকার প্রেসিডেন্ট)। তেনার হিপাজতে, যে সোম্পত্তি আছে, কেওর ঘেটিতে (কাবোর ঘাড়ে) এমুন মাথা নাই যে হের (তার) থিকা এক বিঘত জমিনও দখল করে। এইখানে আসি আর উয়াস (দীর্ঘশ্বাস ফেলাইয়া চইলা যাই।
বড় মিঞা অর্থাৎ আফজল হোসেন। তার দাপট এতটাই যে ধনঞ্জয় বারুইর বাড়িঘর জমিজমায় হাত ঠেকাতে কারোর সাহস হয়নি। ধনঞ্জয়ের বরাত ভাল।
মতিন বলল, এইহানে খাড়ইয়া থাইকা আর কী হইব?
লও যাই, রাজেন শীলের বাড়ি গিয়া দেখি। এই বচ্ছর জষ্টি মাসে অরাও নয়া টিন দিয়া ঘর ছাইছিল। আমারে দিয়াই ছাওয়াইছিল। যদিন চালের দুইখান টিন খুইলা লইয়া যাইতে পারি, গুঞ্জে (গঞ্জে) গিয়া বেচলে কয়টা ট্যাকা পামু। হাতে কামকাইজ (কাজকর্ম) নাই, পহার বড় আকাল।
হ। গেরামে ভাঙ্গন লাগনের পর কামকাইজ জবর কইমা গ্যাছে। আগে সারা বছর বামনগো কায়েতগো জমিনে হাল দিতাম, ধান পাট রুইতাম, ফসল পাকলে কাইটা আনতাম। বাড়ির কামও কম আচ্ছিল না। নয়া ঘর বানাও, পাটের রশি পাকাওসুপারি নাইকল (নারকেল) পাড়, বাগ বাগিচায় ফলের গাছ রোও (বোনো)। কত যে কাম! অহন মাসে পাঁচ দিনও কেও ডাকে না।
