আফজল জিজ্ঞেস করল, আমাগো ভাত কি আপনেরা খাইবেন?
জাতপাত যে মানে না তা জানিয়ে বিনু বলল, আমার বাবার এক মসুলমান বন্ধু আছেন কেতুগঞ্জে। তার বাড়িতে আমরা অনেকবার খেয়েছি।
আপনেরা কুন খাইদ্য খান আর কুনটা খান না, আমি জানি। আপনেগো লেইগা দুফারে ভাত, ডাইল, ভাজাভুজি আর মাছের ঝোল লইয়া আসুম। গোস্ত আনুম না।
গোস্ত বলতে আফজল কী ইঙ্গিত করল, বুঝতে অসুবিধা হয় না বিনুর। সে কিছু বলল না।
আফজল বলল, অহন যাই। বাইরে থিকা কপাটে শিকল তুইলা দিয়া যামু। ঘরে মানুষ আছে, কেও য্যান ট্যার না পায়। রাজেক এবং তমিজকে সঙ্গে করে বেরিয়ে গেল সে।
একটু পর দরজায় শেকল লাগাবার আওয়াজ ভেসে এল।
.
৩.০৪
আফজল হোসেনরা চলে যাবার পর বোরখা খুলে ফেলল ঝিনুক। তাকে ধরে আস্তে আস্তে একটা তক্তপোষে বসিয়ে দিল বিনু।
মানুষ বাস করলে বাড়িঘরে তরতাজা একটা ভাব থাকে। বেশ কিছুদিন বারুইদের এই বাড়িতে লোকজন নেই। তা ছাড়া, দরজা জানালাও বন্ধ রয়েছে। আলোবাতাস না খেললে যেমন হয়, ঘর জুড়ে অন্ধকার, চারপাশ থেকে ভ্যাপসা গন্ধ উঠে আসছে। কেমন যেন গা ছমছম করে।
ঝিনুক নির্জীব গলায় বলল, কিছু দেখতে পাচ্ছি না। একটু থেমে বলল, দম বন্ধ হয়ে আসছে।
আফজল হোসেনের নিষেধাজ্ঞাটা মাথায় রয়েছে বিনুর। নিরাপত্তার কারণে সামনের দিকের জানালাগুলো খোলা চলবে না। দরজা খোলার প্রশ্নই নেই। বাইরে থেকে সেটা বন্ধ রয়েছে। হঠাৎ তার মনে পড়ল, পেছন দিকের জানালাগুলো সম্বন্ধে আফজল কিছু বলে যায় নি। হয়তো ওগুলো খুললে তেমন ভয়ের কারণ নেই।
একটু ইতস্তত করল বিনু। তারপর পেছনের কাঁচা বাঁশের দেওয়ালের কাছে চলে গেল। খুব সতর্কভাবে একটা জানালার ছিটকিনি খুলে পাল্লা সামান্য ফাঁক করে বাইরে তাকাল। বারুইদের বাড়ির চৌহদ্দি ঘিরে পোত্ত বাঁশের খুঁটি পুঁতে পুঁতে বুক-সমান উঁচু বেড়া বসানো। তারের বাঁধন দিয়ে সেটা মজবুত করা হয়েছে। সীমানার পর নলখাগড়া জঙ্গলের ফাঁকে ফাঁকে অগুনতি বইন্যা আর হিজল গাছ বিশৃঙ্খলভাবে দাঁড়িয়ে আছে। তারপর কচুরিপানায় বোঝাই একটা খাল। খালটার ওধার থেকে যতদূর চোখ যায়, ধানের খেত। কার্তিক মাস পড়তেই খেতগুলোতে আমন ধান পাকতে শুরু করেছে। এখনও পুরোটা সোনার রং ধরেনি। ধানের দানাগুলোর কিছুটা সবুজ, কিছুটা সোনালি।
বারুই বাড়ির এই পেছন দিকটা একেবারে নিস্তব্ধ। মানুষজন চোখে পড়ছে না। খুব সম্ভব এধারে। কেউ আসে না। তাই হয়তো আফজল হোসেন এ পাশের জানালা খুলতে বারণ করে যায়নি।
বউন্যা আর হিজল গাছগুলোর মাথায় পাখপাখালি চোখে পড়ছে না। হয়তো দিনের আলো ফোঁটার পর তারা খাদ্যের খোঁজে দূরে কোথাও চলে গেছে। শুধু খালের ধার ঘেঁষে যে দু’চারটি হিজল গাছ। ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে সেগুলোর ডালে ক’টা মাছরাঙা জলের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে বসে আছে। আর দেখা যাচ্ছে, খালে হাঁটু পর্যন্ত পা ডুবিয়ে বকেরা ধ্যানস্থ হয়ে রয়েছে।
অপার নৈঃশব্দের ভেতর নলখাগড়ার জঙ্গল থেকে শুধু ঝিঁঝিদের অশ্রান্ত বিলাপ আর মাঝে মাঝে ডাহুকের ডাক ভেসে আসছে। এই জল-বাংলার যেখানেই জংলা জায়গা সেখানেই ডাহুক আর ঝিঁঝি। এই প্রাণী দু’টো কখনও চুপচাপ থাকতে পারে না, সারাক্ষণ জানান দিয়ে যায়, তারা আছে।
কিছুক্ষণ সতর্কভাবে বাইরে তাকিয়ে থাকার পর জানালার পাল্লা পুরোপুরি খুলে দেয় বিনু। হেমন্তের এক ঝলক স্নিগ্ধ বাতাস এবং রোদ ঘরের ভেতর ছড়িয়ে পড়ে।
হঠাৎ আধফোঁটা কাতর শব্দ কানে আসতে চমকে পেছন ফিরে তাকায় বিনু। তক্তপোষের ওপর ঝিনুকের রুগ্ণ শরীরটা ক্রমশ হেলে যাচ্ছে। সে আর সোজা হয়ে বসে থাকতে পারছে না।
উৎকণ্ঠিত বিনু দৌড়ে এসে ঝিনুককে ধরে ফেলে। জিজ্ঞেস করে, কী হয়েছে ঝিনুক?
ঝিনুক ক্ষীণ গলায় বলে, মাথায় ভীষণ যন্ত্রণা। আমি আর পারছি না।
ভয়, আতঙ্ক, প্রচণ্ড অনিশ্চয়তা–ঝিনুকের দুর্বল স্নায়ু এ সবের চাপ আর নিতে পারছে না। তার চোখ বুজে আসছে। বিনু ধীরে ধীরে তাকে শুইয়ে দিতে দিতে বলল, সারা রাত ভাল করে ঘুমোত পার নি। এখন কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে নাও। ঘুমোলে শরীরটা ঝরঝরে হয়ে যাবে।
ঝিনুকের ঠোঁটদুটো সামান্য নড়ল। অস্ফুট গলায় সে বলল, তোমার কী মনে হয়?
প্রশ্নটা ঠিকমতো বুঝতে না পেরে বিনু জিজ্ঞেস করে, কোন ব্যাপারে?
ঝিনুক বলে, আমরা কি কোনওদিন বর্ডার পেরিয়ে ওপারে যেতে পারব?
কাল থেকে যে সব ঘটনা ঘটে চলেছে, তাতে পাকিস্তান সীমান্তের ওপারে সুদূর কলকাতায় পৌঁছনো আদৌ সম্ভব হবে কিনা, সে সম্বন্ধে সন্দিহান হয়ে পড়েছে মেয়েটা। বিনুও যে পুরোপুরি নিশ্চিত তা কিন্তু নয়। আফজল হোসেন ভাল মানুষ, তার মহানুভবতার যথেষ্ট পরিচয় পাওয়া গেছে। অনেকখানি ঝুঁকি নিয়ে সে তাদের সাহায্য করতেও চেষ্টা করছে। একবার মনে হয়, সে নিরাপদে তাদের তারপাশায় নিয়ে যেতে পারবে। পরক্ষণে সংশয়ে মন ভরে যায় বিনুর। সমস্ত আবহাওয়া যেখানে ঘৃণায় বিদ্বেষে অবিশ্বাসে বিষাক্ত হয়ে আছে, শেষ পর্যন্ত সেখানে আফজল হোসেন কতটা কী করে উঠতে পারবে, কে জানে। ঝিনুককে ভরসা দেবার জন্য জোর দিয়ে বলল, নিশ্চয়ই কলকাতায় যেতে পারব। মিঞাসাহেবের ওপর আমার বিশ্বাস আছে। কিছু একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে।
