আফজল হোসেন ফের বলে, ধনা বারই আছিল আমার পোলাপান কালের বন্দু। জিলা বোডের ইস্কুলে কয় বচ্ছর একলগে পড়ছি, এক লগে দুই জনে গাঙ হাতইরা (সাঁতরে) পারাপার করছি, বাইচ খেলছি। রাইতে পলাইয়া গিয়া গাবতলির গঞ্জে যাত্রা শুনছি। একই বচ্ছর দুই জনের বিয়া হইছিল। হে যে কী আনন্দ আর মাতামাতি! পাকিস্থান হওনের পর পরই ধনারা কইলকাতায় চইলা যাইতে চাইছিল। আমি তারে বুঝাইয়া সুঝাইয়া আটকাইছি। কিন্তুক দিন বিশেক আগে এইখানে যা ঘটল, আর ভরসা পাইলাম না। ধনারা হগল (সব) ফেলাইয়া গেল গিয়া। যাওনের সময় বাড়িঘর জমিজেরাত আমারে দেখতে কইয়া গ্যাছে। যদিন সুদিন ফিরে, অরা আবার দ্যাশে আইব। কিন্তুক
নিজের অজান্তেই বিনু জিজ্ঞেস করল, কিন্তু কী?
সুদিন আর ফিরব কিনা, জানি না।
একটু চুপচাপ।
তারপর আফজল হোসেন ফের বলল, ধনার ছাড়া-বাড়িতেই দিনের বেইলটা আপনেগো থাকতে হইব।
গ্রামের জনহীন এলাকায় কেন তাদের নিয়ে আসা হয়েছে, এবার খানিকটা আঁচ করতে পারল বিনু। জঙ্গলে সাপখোপ, বিছে বা হিংস্র জন্তু-জানোয়ারের ভেতর বসে থাকার চেয়ে নির্জন বাড়িতে দিনটা কাটানো অনেক নিরাপদ। তা ছাড়া, গ্রামের এই অংশে অন্য এলাকার লোকজন খুব সম্ভব তেমন আসে না। যদি আসত, আফজল হোসেন নিশ্চয়ই তাদের এখানে টেনে আনত না।
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আফজল কী যেন ভাবে। তারপর কিছুটা কুণ্ঠার সুরে বলে, আপনেগো আমার বাড়ি লইয়া যাইতে পারলে ভালা লাগত। কিন্তুক’ বলতে বলতে হঠাৎ থেমে গেল সে।
উৎসুক চোখে আফজলের দিকে তাকাল বিন, তবে কোনও প্রশ্ন করল না।
আগের কথার খেই ধরে আফজল এবার বাকিটা বলল, কিন্তুক আমার পোলা দুইটার মনের গতিক ভালা না। উই যে বাড়িখান দ্যাখেন– আঙুল বাড়িয়ে বেশ খানিকটা দূরে একটা পোড়া বাড়ির ধ্বংসস্তূপ দেখাতে লাগল সে, উইটা আছিল গোসাইগো (গোস্বামীদের)। দ্যাশভাগের আগে। কী যে দাপট আছিল তাগো, ভাবতে পারবেন না। হিন্দু হইলেও কামার কুমার যুগী ঋষি (চর্মকার) জাউলাগা মানুষ বইলা মনে করত না। মুসলমানরা তাগো চৌখে পুকা-মাকড়ের থিকাও খারাপ। মুসলমানগো ছাওয়া (ছায়া) গায়ে লাগলে তাগো নিকি দোজখে (নরকে) যাইতে হইত। হেই বার, তহন যুজ্যু চলতে আছে, আমার বড় পোলা কামাল মুন্সিগঞ্জের হরগঙ্গা কলেজে আই.এ পড়ে, গরমের ছুটিতে গেরামে আইসা জুতা পায়ে গোসাইগো বাড়ির হাতায় ঢুকছিল। গোসাইগো কী গুসা (রাগ)! লোক দিয়া ধইরা খুটিতে বাইন্ধা ব্যাতের বাড়ি মারতে মারতে কামালরে বেহুশ কইরা ফেলাইছিল। হেই থিকা কামাল আর আমার দুটো পোলা শোভান হিন্দুগো উপুর রাগ পুইষা রাখছে। আমি বুঝাই, হগল হিন্দু তো গোসাইগো লাখান না। তাগো কী দুষ? পোলারা বোঝে না। তাগো লাখান গেরামের আরও মেলা (অনেক) মানুষ আছে–জবর মাথাগরম। এইর লেইগা আপনেগো বাড়ি লইয়া গ্যালাম না। আসেন–
নারকেল গুঁড়ির পইঠা ভেঙে আগে আগে ওপরে উঠতে লাগল আফজল হোসেন। তাদের পেছনে বিনুরা।
ঘরটা বাইরে থেকে শেকল তুলে বন্ধ করে রাখা ছিল। শেকল খুলে বিনুদের নিয়ে ভেতরে ঢুকল আফজল। ঘরটায় দুটো বড় তক্তপোষ রয়েছে, আছে বেশ কিছু বাক্সপেটরা। দুটো তক্তপোষেই লেপ কথা তোষক বালিশ মশারি ডাঁই হয়ে আছে। বোঝা যায়, বহুদিন ধরে তিল তিল করে সযত্নে গড়ে ভোলা সাজানো সংসার ফেলে ধনঞ্জয় বারুইরা চলে গেছে।
আফজল হোসেন বিনুকে বলল, আপনে বিবিজানরে লইয়া এই ঘরে জিরাইয়া লন (বিশ্রাম করুন)। উঠোনের ওধারের একটা ঘর দেখিয়ে বলল, আপনেগো দুই মাঝি সুমখের (সামনের) উই ঘরে দিনের বেইলটা (বেলাটা) থাকব। সে আগেই ধরে নিয়েছে বিনু এবং ঝিনুক স্বামী-স্ত্রী। তারা যখন বিশ্রাম করবে তখন একই ঘরে অন্য কারোর থাকা ঠিক নয়। তাই রাজেক এবং তমিজের জন্য আলাদা ব্যবস্থা করে দিল।
বিনু আস্তে মাথা নাড়ল।
আফজল এবার বলে, যতখানি সোময় এইখানে থাকবেন, সুমখের দিকের জানলা কপাট খুলবেন না। গেরামের হগলে জানে, ধনা বারই হেগো (তাদের) জমিজেরাত আমার হাতে দিয়া গ্যাছে। কেও এই বাড়িতে আসে না, তভু ধরেন হটাৎ কইরা আইসা পড়ল। সাবধানে থাকন ভাল। রাজেক এবং তমিজকেও একই পরামর্শ দিল সে। কেননা, এই অঞ্চলে কেউ তাদের চেনে না। দৈবাৎ কারোর চোখে পড়ে গেলে হয়তো জেরা করে করে বিনুদের খবর বার করে ফেলবে। ঝুঁকি নেওয়া কোনওভাবেই উচিত নয়।
বিনু এবং রাজেক জানায়, তারা দরজা জানালা খুলবে না।
একটু কী ভেবে আফজল বলল, এট্টা কথা জিগাই, কিছু মনে কইরেন না।
বিনু বলল, না, মনে করব না। কী জানতে চান বলুন—
আপনেরা কি বামন?
এমন একটা অদ্ভুত পরিবেশে, প্রাণ বাঁচানোর জন্য যখন তারা অজানা গ্রামের পরিত্যক্ত ঘরে আশ্রয় নিয়েছে, তাদের ঘিরে যখন শুধুই অনিশ্চয়তা এবং আতঙ্ক, সেই সময় জাতপাতের প্রশ্নটা কেন। উঠল, বিনুর বোধগম্য হয় না। চমকে উঠে সে বলে, না–কায়স্থ। কেন?
প্রশ্ন করার কারণটা এবার বুঝিয়ে দিল আফজল হোসেন। কাল কখন দুটি ভাত খেয়ে তারা নৌকোয় উঠেছিল। আজ কিছুক্ষণ আগে সামান্য মুড়িটুড়ি খেয়েছে। এখন বাকি দিনটা বারুইদের ছাড়া বাড়িতে কাটাতে হবে। পেটে ভাত না পড়লে ভীষণ কাহিল হয়ে পড়বে বিনুরা। আফজল হোসেন জানে, হিন্দুরা, বিশেষ করে বামুনরা তাদের হাতের রান্না খায় না। বামুনদের জাতবিচার আর ছোঁয়াছুঁয়ির ব্যাপারে ভীষণ কড়াকড়ি।
