নিজের সংসার সম্বন্ধে সাতকাহন ফাদার সময় এটা নয়। তবু যে আফজল এত কথা বলছে তার কারণ আন্দাজ করা যায়। এখানকার আবহাওয়া তো সহজ, স্বাভাবিক নয়। কেমন দমবন্ধ করা। খুব সম্ভব সেজন্য বিনুদের যতখানি পারা যায়, অন্যমনস্ক করে রাখতে চাইছে।
একসময় জঙ্গল পেরিয়ে আফজল বিনুদের যেখানে নিয়ে এল সেটা কোনও গ্রামের একটা অংশ। সেখানে ছাড়া ছাড়া ভাবে অনেক বাড়িঘর চোখে পড়ছে। এক একটা বাড়িতে ছ’সাত হাত উঁচু ভিতের ওপর তিন চার খানা করে ঘর। সেগুলোর কোনওটা পঁচিশের বন্দের, কোনওটা সাতাশের বন্দের। মাথায় ঢেউটিনের চাল, চারপাশে কাঁচা বাঁশের দেওয়াল। বাড়িগুলোর সামনের দিকে অনেকখানি জায়গা জুড়ে ঢালাও উঠোন। এক ঘর থেকে আরেক ঘরে যাতায়াতের জন্য বাঁশের সাঁকো পাতা। রয়েছে।
এখন অবশ্য টানের সময়। সব উঠোনই শুকনো, খটখটে। তবু যে সাঁকোগুলো রয়েছে তার কারণ বর্ষায় নদীতীরের এই নাবাল অঞ্চল নিশ্চয়ই ডুবে যায়। জ্যৈষ্ঠের শেষাশেষি থেকে ভাদ্রের মাঝামাঝি পর্যন্ত উঠোনগুলোতে এক মানুষ জল জমে থাকে। তাই ঘরগুলোর ভিত অত উঁচু, তাই সাঁকোর ব্যবস্থা। আশ্বিনের গোড়ায় জল নেমে যাবার পরও সাঁকোগুলো ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে। কেননা, বছরের পর বছর বর্ষা আসে, কে আর ওগুলো খুলে ক’মাস বাদে আবার কষ্ট করে বানায়। পাঁচ সাত বছর পর জলে সাঁকোর খুঁটি হেজে পচে গেলে তখন অবশ্য না বানিয়ে উপায় কী। এই জলের দেশে যেখানে জমি নিচু, সেখানেই প্রতিটি বাড়িতে সাঁকো চোখে পড়বে।
একটানা আফজল হোসেনই কথা বলে যাচ্ছিল, আর নিঃশব্দে শুনছিল বিনু। হঠাৎ তার খেয়াল হল, গ্রামের ভেতর চলে এলেও জায়গাটা অদ্ভুত রকমের স্তব্ধ আর নির্জন। কোথাও মানুষজন চোখে পড়ছে না।
চারদিক ভাল করে লক্ষ করে চমকে উঠল বিনু। কিছু কিছু বাড়ি অক্ষত আছে ঠিকই। কিন্তু বেশির ভাগেরই টিনের চাল আর জানালা কপাট খুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। কোনওটা আধপোড়া, কোনওটা পুড়ে ঝুড়ে ছাই হয়ে গেছে। সব মিলিয়ে নিঝুম, পরিত্যক্ত, বিধ্বস্ত এক জনপদ। এখানকার বাসিন্দাদের ওপর যে অল্প কিছুদিন আগেই হামলা চালানো হয়েছিল তার ছাপ স্পষ্ট।
আফজল হোসেন বলল, এই জাগাখান (জায়গাটা) আমাগো মামুদপুর গেরামের পুব দিক। এইহানে যুগীরা, নাপিতরা, কুমার বামন আর সদগোপেরা থাকত। দ্যাশভাগের পর কেও কেও ভিটামাটি ছাইড়া চইলা গেছিল। যেই কয় ঘর আছিল, দিন পনর বিশেক আগে হেরাও গ্যাছে গিয়া। একটু থেমে, ভারী গলায় ফের বলল, কত কাল ধইরা, হেই বাপ-দাদা, দাদার বাপ, তাগো বাপের আমল থিকা এক লগে থাকছি। এই মানুষগুলার লগে আর দেখা হইব না।
হিন্দুরা মামুদপুর থেকে সাত পুরুষের ভদ্রাসন ছেড়ে চলে গেছে, সেজন্য আফজল হোসেনের আক্ষেপটা যথেষ্ট আন্তরিক মনে হল বিনুর। যখন পাকিস্তানের বেশির ভাগ লোকই চায়, হিন্দুরা দেশ ছাড়ক, এই লোকটা সেদিক থেকে আশ্চর্য রকমের ব্যতিক্রম। বহু পুরুষ ধরে যারা সুখে দুঃখে পাশাপাশি বাস করে এসেছে, তাদের এভাবে চলে যাওয়াটা তার কাছে খুবই শোকাবহ ঘটনা।
বিনু উত্তর দিল না। আস্তে মাথা নাড়ল শুধু। নিঝুম জঙ্গলের ভেতর বনতুলসী এবং মুত্রা ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে থাকার সময় ভীষণ উৎকণ্ঠা হচ্ছিল তার। এখন মামুদপুর গ্রামের পরিত্যক্ত, জনশূন্য এলাকায় পা দিয়ে আরেক ধরনের উৎকণ্ঠা হচ্ছে। এখন কাউকে দেখা যাচ্ছে না ঠিকই, কিন্তু কেউ যে হুট করে এধারে চলে আসবে না, তার কোনও নিশ্চয়তা নেই। বুকের ভেতর যে আশঙ্কাটা দ্রুত জমাট বাঁধছে তা মুখ ফুটে বলতে পারল না বিনু।
আফজল হোসেন শেষ পর্যন্ত একটা বাড়িতে ওদের নিয়ে এল। এখানে চৌকো মস্ত উঠোনের চারধারে চারখানা পঁচিশের বন্দের ঘর। চালের ঝকঝকে নতুন টিনগুলো দেখে মনে হয়, খুব বেশিদিন আগে ওগুলো লাগানো হয়নি। অন্য সব বাড়ির মতো এখানেও বর্ষায় এঘর থেকে ওঘরে যাবার জন্য সাঁকো পাতা আছে। উঠোনের এক কোণে বাঁধানো মঞ্চে অনেকগুলো সতেজ তুলসী গাছ। আর। আছে ধান রাখার জন্য মস্ত মস্ত গোলাকার পাঁচটা বেতের ডোল। সেগুলোর গায়ে গাবের আঠা লাগিয়ে রীতিমতো শক্তপোক্ত করা হয়েছে। প্রতিটি ডোলে কম করে পনের ষোল মণ ধান রাখা যায়। ডোলগুলো যেখানে, তার উলটো দিকে বড় একটা বাতাবি লেবুর গাছ প্রচুর ডালপালা ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সেটার গুঁড়িতে কম করে আট দশটা লাঙল দাঁড় করানো। বাতাবি গাছটা থেকে খানিক দূরে ক’টা মোটা কাঠের খুঁটি পোঁতা। সেগুলোর গায়ে দশ বারটা বৈঠা পাটের দড়ি দিয়ে বেঁধে হেলান দিয়ে রাখা হয়েছে।
উঠোনটা মোটামুটি পরিষ্কার। ধুলোবালি তেমন জমেনি। হাওয়ায় হাওয়ায় খড়কুটো, বা গাছের শুকনো সরু ডাল বা মরা পাতা উড়ে এসে জমে নেই। বোঝা যায়, খুব অল্প দিন হল, এ বাড়ির বাসিন্দারা গ্রাম ছেড়ে চলে গেছে। আরও যা মনে হল, তারা ছিল বেশ সচ্ছল, ধানী গৃহস্থ।
আফজল হোসেন বলল, এই বাড়িখান আছিল ধনঞ্জয় বারইর। পঞ্চাশ কানি সরস জমিন, হালহালুটি, চৈদ্দ পনেরটা গাই আর বলদ, ছয়খান নাও (নৌকো), নগদ পহা। কুনো অভাব আছিল না। কিন্তু কী যে হইয়া গেল!
কোনাকুনি উঠোন পেরিয়ে দক্ষিণদুয়ারী ঘরখানার সামনে চলে এল ওরা। ভিত উঁচু বলে উঠোন থেকে নারকেল গাছের গুঁড়ি কেটে দশ ধাপ সিঁড়ি বসানো রয়েছে।
