লোকটা বিনুকে বলল, রাজেক মিঞারে খাওয়াইয়া আনছি। আপনেগো লেইগা পানি আর সবিরের (সকালের) খাওনেরটা (খাবার) লইয়া আইছি। মুখ ধুইয়া আগে খাইয়া লন। তমস্ত রাইত তো প্যাটে কিছু পড়ে নাই।
লোকটার সব দিকে নজর। অসীম কৃতজ্ঞতায় মন ভরে যায় বিনুর। বুকের অতল স্তর থেকে দুরন্ত আবেগ উথলে উথলে এসে গলার কাছে জমা হতে থাকে। কিছুক্ষণ আগেও ওই লোকটা সম্পর্কে পুরোপুরি নিঃসন্দেহ ছিল না বিনু। আকাশের গায়ে পেঁজা পেঁজা কালো মেঘের টুকরোর মতো তার মনে সংশয় ভেসে বেড়াচ্ছিল। এ এমন এক নিদারুণ সময় যে কারোকে বিশ্বাস করা যায় না। ওই লোকটা তত সম্পূর্ণ অচেনা। তাকে অবিশ্বাস করার যথেষ্ট কারণ আছে। কিন্তু তাদের রাজদিয়া এবং তার চারপাশের বহু চেনা মানুষ এই ক’বছরে আগাগোড়া বদলে গেছে। তাদের কারোর ওপরেই ইদানীং আর আস্থা রাখা যাচ্ছিল না। সামনাসামনি তারা অবশ্য খারাপ ব্যবহার করেনি। কিন্তু টের পাওয়া যেত, ভেতরে ভেতরে তীব্র আক্রোশ এবং ঘৃণা পুষে রেখেছে।
সমস্ত আবহাওয়া যখন দূষিত এবং বিষাক্ত, উত্তেজনা আর বিদ্বেষ যখন বায়ুস্তরে ভেসে বেড়াচ্ছে, ওই লোকটাকে আশ্চর্য রকমের ব্যতিক্রম মনে হয়। তার কোনও রকম দুরভিসন্ধি থাকলে সকাল বেলা বিনুদের দেখামাত্র তুমুল হইচই বাধিয়ে লোকজন জড়ো করতে পারত। কিন্তু সে সব কিছুই করেনি সে। বরং ওদের বাঁচাবার জন্য গভীর জঙ্গলে এনে লুকিয়ে রেখেছে। এখন আবার জল আর খাবার নিয়ে এসেছে। পুরনো কথাটা ফের মনে হল বিনুর, পৃথিবীর সবাই খারাপ হয়ে যায়নি, কারোর কারোর ওপর ভরসা রাখা যায়।
মুখ ধোওয়া এবং খাওয়া শেষ হলে লোকটা বলল, তমস্ত দিন এই জঙ্গলে থাকন ঠিক হইব। সাপখোপ আছে, বাঘডাসা আছে, বুনা (বুনো) শুয়োর আর বড় বড় বিছা আছে। কখন কী বিপদ ঘইটা যাইব! আসেন আমার লগে–
কোথায় যেতে হবে, বিনু জানে না। তবে সে নিশ্চিত, ওই লোকটার সঙ্গে গেলে তাদের ক্ষতির আশঙ্কা নেই। সে কোনও প্রশ্ন করল না।
লোকটা এবার তার হাতে যে কাগজে-মোড়া প্যাকেট ছিল সেটা খুলে একটা লুঙ্গি এবং একটা বোরখা বার করে বিনুকে দিতে দিতে বলল, ধুতি ছাইড়া আপনে লুঙ্গিখান পরেন, আর বিবিসাবরে বুরখা পরতে কন–
বিবিসাব! বিনু চমকে উঠল। লোকটা ঝিনুককে নিশ্চয়ই তার স্ত্রী ভেবে নিয়েছে। অথচ তাদের যে এখনও বিয়ে হয়নি সেটা বলতে গিয়ে থমকে গেল সে। বললে নানারকম জবাবদিহি করতে হবে। ঝিনুক কে, কেন অনাত্মীয় একটি যুবতাঁকে সঙ্গে করে সে কলকাতায় চলেছে, ইত্যাদি। চোখের কোণ। দিয়ে দ্রুত রাজেক আর তমিজের দিকে তাকিয়ে ইশারা করল বিনু। তারা যেন বিয়ের ব্যাপারে ফস। করে কিছু বলে না বসে। তমিজরা ইঙ্গিতটা বুঝল। ওই লোকটাকে বুঝতে না দিয়ে আস্তে মাথা নাড়ল।
বিনু একটা মোটা গাছের আড়ালে গিয়ে লুঙ্গি পরে, ধুতিটা ভাজ করে নিয়ে ফিরে এল। তারপর বোরখাটা ঝিনুককে পরিয়ে দিল।
লোকটার হাতে প্যাকেটের কাগজ ছিল। সেটা বিনুকে দিয়ে সে বলল, ধুতিখান এইটা দিয়া জড়াইয়া লন।
বিনু তাই করল। তার হাত থেকে রাজেক ধুতির পোঁটলাটা নিল। খালি জলের বালতি এবং বেতের ডালাটা নিল তমিজ।
লোকটা এবার বলল, ক্যান আপনেগো লুঙ্গি আর বুরখা পরতে কইলাম, বুঝতে পারছেন?
হঠাৎ কারোর চোখে পড়লে তাদের পরিচয় জানাজানি হয়ে যাবে, তার পরিণতি মারাত্মক। নিরাপত্তার কারণে তাই লুঙ্গি আর বোরখার ব্যবস্থা। লোকটা কোনও রকম ঝুঁকি নিতে চায় না। বিনু আস্তে মাথা নাড়ল–বুঝতে পেরেছে।
লোকটা বিষণ্ণভাবে, খানিকটা আক্ষেপের সুরে বলল, কী দিনকাল যে পড়ছে।
.
৩.০৩
নদীর কিনার থেকে যে পায়ে-চলা কাঁচা রাস্তাটা পাক খেয়ে খেয়ে অজানা জনপদের দিকে চলে গেছে, লোকটা বিনুদের সঙ্গে করে সেদিকে গেল না। নিঝুম বনভূমির ভেতর দিয়ে দিয়ে ঘুরপথে এগিয়ে চলল।
লোকটা যেন রহস্যময় পথ-প্রদর্শক। কতদূরে সে বিনুদের নিয়ে যাবে, কে জানে।
লোকটার পাশাপশি হাঁটছে বিনু আর ঝিনুক। ঝিনুকের হাঁটতে কষ্ট হচ্ছিল। পা-মাথা টলছিল। সে যাতে পড়ে না যায়, তাই তার কাঁধে হাতের বেড় দিয়ে ধরে রেখেছে বিনু। তাদের পেছন পেছন চলেছে রাজেক এবং তমিজ।
মাথার ওপর নানা রঙের অজস্র পাখি এখনও উড়ছে। মনে হয়, হলুদ কালো সাদা সবুজ নীল, ইত্যাদি টুকরো টুকরো রঙিন কাগজ কেউ বাতসে ছড়িয়ে দিয়েছে। পাখিদের অবিশ্রান্ত কিচিরমিচির, ডানা ঝাঁপটানি, থেকে থেকেই ডাহুকদের তীক্ষ্ণ চিৎকার, ঝিঁঝির ডাক জঙ্গলের জমাট স্তব্ধতাকে ছিঁড়ে খুঁড়ে দিচ্ছেল।
চলতে চলতে লোকটা নিজের থেকেই কথা বলছিল। জানা গেল, তার নাম আফজল হোসেন। এই জায়গাটার নাম মামুদপুর। চারপাশে যে গ্রামগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে সেগুলো হল গাবতলি, চরচিকন্দি, সোনাদীঘি, এমনি অনেক। আফজল হোসেন বড় ধানী গৃহস্থ, প্রায় নব্বই কানি দোফসলা জমির মালিক। স্থানীয় ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্ট। স্ত্রী, দুই ছেলে, এক ছেলের বৌ এবং তিন মেয়ে নিয়ে তার জমজমাট সংসার। মেয়েদের নামকরা বংশে, শিক্ষিত সৎ পাত্রের সঙ্গে বিয়ে হয়েছে। তিন মেয়ের ঘরে মোট এগারটি নাতি-নাতনী। তাদের কেউ না কেউ সারা বছরই বাপজানের বাড়িতে এসে থাকে। বড় ছেলের বিয়ে হলেও এখনও তার ছেলেপুলে হয়নি। ছোট ছেলে এ বছরই মুন্সিগঞ্জের হরগঙ্গা কলেজ থেকে বি.এ পাস করেছে। আফজলের ইচ্ছা, দু’চার মাসের মধ্যে তার বিয়ে দেয়, কিন্তু ছেলেটা একেবারেই রাজি নয়। ঘাড় টেড়া করে রয়েছে।
