লোকটা নিজের সঙ্গে কিছুক্ষণ যুঝে হঠাৎ দ্বিধান্বিত ভাবটা কাটিয়ে নিল। তারপর মনস্থির করে ফেলল, যা হওনের হইব, আপনেগো লেইগা কিছু এট্টা না করলে মনে লয় গুনা (পাপ) লাগব। আল্লায় আমারে মাপ করব না। এক কাম করেন।
ভেতরে সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়ে যেতে যেতে বিনুর মধ্যে আবার ক্ষীণ একটু আশা জেগে ওঠে। কাল রাত থেকে এই একটা ব্যাপার ক্রমান্বয়ে চলছে–কখনও সামান্য আশার সংকেত, পরক্ষণে অপার নৈরাশ্য এবং আতঙ্ক। কলকাতা তো কম দূরের পথ নয়। সেখানে পৌঁছবার আগে, যদি আদৌ পৌঁছতে পারে, এইভাবেই তাদের চলবে। জীবন যে কত দুর্যোগের সমষ্টি, রাজদিয়া থেকে বেরুবার পর এই প্রথম জানতে পারছে বিনু। জোরে শ্বাস টেনে ব্যগ্র স্বরে সে বলে, কী করতে হবে বলুন–
লোকটা বলল, দিনের বেইলে (বেলায়) কিছু করন যাইব না। রাইতে আন্ধার নামলে এট্টা চ্যাষ্টা করুম। তমস্ত (সারা) দিন আপনেগো লুকাইয়া থাকতে হইব। চারদিক খুঁটিয়ে দেখে নিয়ে আস্তে আস্তে মাথা নাড়ে, না, গাঙের এত কিনারে থাকন ঠিক না। কাছেই নৌকাঘাটা। বেইল চড়লে রাইজের কেরায়া নাও, গয়নার নাও আইসা ওইখানে ভিড় জমাইব। সুমখের (সামনের) পথ দিয়া মাইনষের চলাচল বাইড়া যাইব। কেওইর না কেওইর (কারোর না কাহোর) নজরে পইড়া যাইবেন। আসেন আমার লগে–
লোকটা বিনুদের নিয়ে বাঁ ধারে বেশ খানিকটা দূরে গভীর জঙ্গলের ভেতর চলে গেল। এখানে অনেকখানি এলাকা জুড়ে বনতুলসী আর মুত্রার ঝড় উদ্দাম হয়ে আছে। আর আছে উঁচু উঁচু সব গাছ, সেগুলোর ডালপালা ঘন পাতায় ছাওয়া। ফলে সূর্যালোক ভেতরে ঢুকতে পারে না। জায়গাটা দিনের বেলাতেও ছায়াচ্ছন্ন এবং স্যাঁতসেঁতে।
লোকটা জানাল, মানুষজন পারতপক্ষে এদিকে তেমন একটা আসে না। আপাতত বিনুরা এখানে থাক। তারপর গ্রামের ভাবগতিক বুঝে সে ওদের অন্য জায়গায় সরিয়ে নিয়ে যাবে। দিনের বেলাটা যে করেই হোক নিরাপত্তার কারণে মানুষের নজরের বাইরে ওদের থাকতেই হবে।
রাজেক ভয়ে ভয়ে চারপাশে লক্ষ করছিল। বলল, সাপখোপ নাই তো?
লোকটা বলল, জঙ্গলে সাপ থাকব না, হেইটা কি হয় মিঞা? আছে, মেলাই আছে। হুইশার (হুঁশিয়ার) হইয়া এইখানে থাকতে হইব। তুমি আমার লগে আসো–
রাজেক বিনুদের ফেলে যেতে চাইছিল না। না বললে লোকটা হয়তো চটে যাবে। এখন পর্যন্ত তার কথাবার্তা বা আচরণে সন্দেহজনক কিছু পাওয়া যায়নি, বরং তাকে হিতাকাঙ্ক্ষী বলেই মনে হয়েছে। তবু মানুষের মনে কী থাকে, সবসময় কি বাইরে থেকে বোঝা যায়? ঢোক গিলে রাজেক ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করে, কুনখানে যাইতে কন?
লোকটা ধমকে উঠল, গ্যালেই দেখতে পাইবা।
রাজেকের আর কোনও প্রশ্ন করতে সাহসে হয় না। সে তমিজকে বলে, গাছের একখান ডাইল (ডাল) ভাইঙ্গা চাইর দিকে নজর রাখিস। তার মাথায় সাপের চিন্তাটা ঘুরছিল।
মুত্রাবনের পাশে ঘাসের জমি। রোদ না লাগায় এখানকার ঘাস সতেজ নয়, কেমন যেন মরা মরা, হলদেটে। ঝিনুককে হাত ধরে বসিয়ে নিজেও তার পাশে বসল বিনু। তমিজ ততক্ষণে গাছের মাঝারি একটা ডাল ভেঙে নিয়ে চনমনে চোখে চারপাশে লক্ষ রাখতে শুরু করেছে।
কাল রাতে যেমন শুনেছিল, এই দিনের বেলাতেও ঝিঁঝিদের একনাগাড়ে গলা সাধা চলছে। মাঝে মাঝে কোথায় যেন ডাহুক চেঁচিয়ে উঠছে, কাঠ ঠোকরারা শক্ত ধারাল ঠোঁট দিয়ে ঠোকর মেরে মেরে গাছের গুঁড়ি এ-ফোঁড় ওফোঁড় করে চলেছে। কাছাকাছি এক পাল শিয়াল ডেকে উঠল। মশা এবং পোকা মাকড়েরা চারদিকের ঝোপঝাড় থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে বেরিয়ে এসে বিনুদের হেঁকে ধরতে লাগল।
মশা টশা তাড়াতে তাড়াতে এই নিঝুম বনভূমিতে বসে অদ্ভুত এক অনুভূতি হচ্ছিল বিনুর। মানুষের ভয়ে তারা এখানে লুকিয়ে আছে, কিন্তু এখানেও রয়েছে মৃত্যুভয়। বিষধর সাপেরা আচমকা কোন গর্ত থেকে বেরিয়ে এসে ছোবল হানবে, কে জানে।
রাজেক সেই লোকটির সঙ্গে চলে যাবার পর অনেকটা সময় কেটে গেছে। মাথার ওপর ডালপালার যে ঘন আচ্ছাদন, তার ফাঁক দিয়ে সরু সরু রোদের ফালি এসে পড়েছে নিচে। আন্দাজ করা যায়, বেশ বেলা হয়েছে।
সকালে ঘুম ভাঙার পর মুখ ধোওয়ার সময় পাওয়া যায়নি। সেই লোকটা নদীর দিক থেকে হঠাৎ কাছে চলে এসেছিল। বিনু টের পাচ্ছে, বাসি মুখ আর নিশ্বাস থেকে দুর্গন্ধ বেরিয়ে আসছে। গা গুলিয়ে উঠতে লাগল তার।
পাশ থেকে ঝিনুক বলল, মুখ একেবারে পচে গেছে। একটু যদি জল পাওয়া যেত–
বিনু উত্তর দেবার আগেই তমিজ বলে ওঠে, বদনা কি ঘটি উটি থাকলে গাঙ থিকা পানি আইনা দিতাম। কিন্তুক শালার পুতেরা কাইল রাইতে নাও সুদ্ধা (নৌকো সুদ্ধ) বেবাক লইয়া গ্যাছে। দেখি যদিন এই জঙ্গলের ভিতরে খাল উল থাকে। তাইলে আপনেগো দুই জনারে হেইখানে মুখ ধোওনের (ধোওয়ার) লেইগা লইয়া যামু।
অনেক জায়গায় নদী পাড় ভেঙে বিল বা খালের আকারে গ্রাম কি ঝোপজঙ্গল বা ধান খেতের ভেতর দিয়ে বহুদূর ছড়িয়ে পড়ে। তমিজ এধারে ওধারে বেশ খানিক দূরে গিয়ে তেমন কোনও জলের ধারা খোঁজ করে এল। কিন্তু না, এখানে খাল বিল কিছুই নেই।
এই সময় রাজেক আর সেই লোকটি ফিরে এল। রাজেকের এক হাতে টিনের জলভর্তি বড় বালতি, আরেক হাতে বেতের বড় ডালায় মুড়ি, মুছি গুড়, কদমা এবং এক ছড়া সবরি কলা। আর লোকটার হাতে কাগজে মোড়া মোটা একটা প্যাকেট।
