গুছিয়ে ঠিকমতো বলতে পারছিল না রাজেক। তার কথাগুলো অসংলগ্ন, আগোছাল। তবে এটুকু বোঝা যায়, লোকটার মনে বিনু আর ঝিনুক সম্বন্ধে যাতে সহানুভূতির সৃষ্টি হয়, প্রাণপণে সেই চেষ্টাই। করে চলেছে সে। তার হয়তো ধারণা, লোকটা ইচ্ছা করলে বিনুদের বাঁচাতেও পারে।
বিনু ভয়বিহ্বল চোখে লোকটাকে দেখছিল। চেহারায় একটা ব্যক্তিত্বের ছাপ আছে। মনে হয়, এই এলাকার মান্যগণ্য কেউ হবে। তাদের রক্ষা করার ক্ষমতা তার আছে কিনা, থাকলেও তেমন সদিচ্ছা বা মহানুভবতা তার কাছে আশা করা যায় কিনা, বোঝা যাচ্ছে না। কতখানি আক্রোশ সে নিজের মধ্যে ঠেসে রেখেছে, তা-ই বা কে জানে। সাহায্য করতে পারুক আর না-ই পারুক, মারাত্মক ক্ষতি করতেই পারে। চারপাশের গ্রাম ট্রামে বিনুদের খবর জানিয়ে দিলে ঝাঁকে ঝাঁকে হানাদার লাঠি বর্শা নিয়ে ছুটে আসবে।
রাজেক একনাগাড়ে লোকটার ভেতর মহত্ত্ব জাগিয়ে তুলতে চাইছিল, ছুটোবাবু বড় ভালা মানুষ। আমাগো রাইজদার চাইর দিকে রায়ট হইছে, কিন্তুক কুনোদিন তেনি কেওর (কারোর) গায়ে এট্টা টুকাও (টোকা) মারে নাই। হ্যামকত্তারে তো চিনেন, তেনার নাতি তো–
লোকটা এতক্ষণ চুপচাপ দেখে যাচ্ছিল। এই প্রথম কথা বলল, হামকত্তা নামে কেওইরে (কারোকে) চিনি না– তার গলার স্বর রীতিমতো গম্ভীর এবং মোটা ধরনের।
রাজেক তাজ্জব হয়ে যায়। রাজদিয়ার হেমকর্তাকে চেনে না বা তার নাম শোনে নি, এই দুনিয়ার এমন কেউ থাকতে পারে, ভাবতেই পারে না সে। বলে, কনি কী মিঞাছাব, হ্যামকত্তা হইল আমাগো–
হাত তুলে রাজেককে থামিয়ে দিয়ে লোকটা বিনুকে জিজ্ঞেস করে, আপনেরা কারা? কী নাম আপনের? নদীর পাড়ে বেতঝাপের আড়ালে দূর থেকে বিনুদের আবছাভাবে দেখে সে কিছুটা ধন্দে পড়ে গিয়েছিল। ওইরকম জায়গায় ক’টি মানুষ, তারা পুরুষ না মেয়েলোক, বুঝতে পারছিল না। কী উদ্দেশ্যেই বা ওরা ওখানে লুকিয়ে আছে, বোধগম্য হয়নি। খানিকটা সংশয় আর খানিকটা কৌতূহল নিয়ে তাই এগিয়ে এসেছিল। বিনুদের সামনাসামনি দেখার পর সে স্তম্ভিত। ভাবতে পারেনি, একটি অচেনা হিন্দু যুবক এবং রুগণ, কৃশ চেহারার একটি তরুণীর সঙ্গে অতি সাধারণ দু’জন আধবয়সী মুসলমানকে দেখতে পাবে।
বিনু উত্তর দিতে চেষ্টা করল। কিন্তু প্রথমটা গলায় স্বর ফুটল না। তারপর কোনও রকমে নিজের নাম বলল।
লোকটা রাজেককে দেখিয়ে বলে, এই মিঞা তো কইল, আপনে রাইজদার হ্যামকত্তার নাতি। রাইজদায় তাইলে (তা হলে) আপনেগো বাড়ি?
আস্তে মাথা নাড়ে বিনু।
লোকটা এবার জিজ্ঞেস করে, এইখানে আসলেন ক্যামনে?
ভয়ে ভয়ে, মাঝে মাঝে থেমে, কঁপা শুকনো গলায় কাল সন্ধেয় নৌকোয় ওঠার পর যা ঘটেছে, সমস্ত বলে গেল বিনু। রাজেক এবং তমিজের পরিচয়ও দিল।
অনেকক্ষণ চুপ করে রইল লোকটা। তাকে ভীষণ চিন্তাগ্রস্ত দেখাচ্ছে, কপালৈ গভীর কটী রেখা ফুটে বেরিয়েছে। একসময় সে বলল, এইখানে নাইমা নেমে) ভালা করেন নাই। পরক্ষণে কী মনে পড়ে যাওয়ায় বলে, তয় (তবে) না নাইমা উপায়ও আছিল না, জান চইলা যাইত।
বিনু কী বলবে, ভেবে পেল না। নিজেকে দিশেহারা, বিপর্যস্ত লাগছিল। তারই ভেতর খুব সামান্য হলেও একটু ভরসা যেন সে পেয়েছে। লোকটাকে উগ্র, হিংস্র মনে হচ্ছে না। বরং ধৈর্য ধরে সে কাল রাতের যাবতীয় ঘটনার বিবরণ শুনেছে। হয়তো মানুষটা ভাল, সহৃদয়, তার মধ্যে মনুষ্যত্বের ছিটেফোঁটা অবশিষ্ট থাকলেও থাকতে পারে।
লোকটা ফের বলল, কিন্তুক এইখানে বিশখান গেরাম চৈদ্দ পনর দিন ধইরা জবর গরম হইয়া আছে। খুন হইছে, ঘরে আগুন লাগছে। মেলা (অনেক) মানুষ দ্যাশের ভিটামাটি ছাইড়া কইলকাতা
আসাম, কুন দিকে জানি চইলা গ্যাছে। এই অবোস্তায় (অবস্থায়)–বলতে বলতে চুপ করে গেল।
ইঙ্গিতটা অত্যন্ত পরিষ্কার। এই অঞ্চলের আবহাওয়া ভীষণ উত্তেজক। এমন পরিস্থিতিতে বিনুদের যে কোনও মুহূর্তে প্রচণ্ড বিপদে পড়ার সম্ভাবনা।
লোকটা এধারে ওধারে তাকিয়ে সতর্ক ভঙ্গিতে ফের বলল, কেও (কেউ) আপনেগো দেইখা ফেলাইলে মুশকিল হইয়া যাইব। যত তরাতরি পারেন এইখান থিকা চইলা যান।
লোকটাকে খড়কুটোর মতো আঁকড়ে ধরল বিনু। সে এখন নিশ্চিত, লোকটা তাদের আদৌ অনিষ্ট করতে চায় না। দু’টি নির্দোষ অসহায় যুবক যুবতী যাতে প্রাণে বেঁচে যায়, সে জন্য সঠিক পরামর্শই দিয়েছে। বিনু হাতজোড় করে ব্যাকুলভাবে বলে, যাব কী করে? দয়া করে আপনি তারপাশায় যাবার ব্যবস্থা করে দিন। আমার সঙ্গে কিছু টাকা আছে। নৌকো ভাড়া দিতে পারব।
রাজেক ও তমিজ মিনতির সুরে একটানা বলে যায়, মেহেরবানি কইরা ছুটোবাবু আর ঝিনুকদিদিরে রক্ষা করেন মিঞাছাব। আল্লার দোয়ায় আপনের ভালা হইব।
কিছুক্ষণ চিন্তা করে লোকটা বিনুকে বলল, আমি যদিন আপনেগো লেইগা কিছু করতে যাই, তাফালে (ঝামেলায়) পইড়া যামু। মানুষ আর অহন মানুষ নাই। হগল সোময় তাগো মাথায় খুন চইড়া থাকে। অগো গুসা (ওদের রাগ) আইসা পড়ব আমার উপুর।
যে অবলম্বনটুকু ধরে বিনু এই দুঃসহ মৃত্যুপুরীর সীমানা পেরিয়ে যেতে চেয়েছিল সেটা হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। টের পেল, পারাপারহীন হতাশা চারদিক থেকে তাকে জাপটে ধরছে। চোখের সামনে হেমন্তের এই সকাল ক্রমশ গাঢ় অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে।
