হঠাৎ বিনু দেখতে পায়, পঞ্চাশ ষাট হাত দূরে একটা পায়ে-চলা কাঁচা রাস্তা নদীর দিক থেকে। এসে গাছগাছালির ফাঁক দিয়ে এঁকে বেঁকে, পাক খেয়ে খেয়ে ডান পাশে অদৃশ্য হয়েছে। অর্থাৎ খুব কাছে না হলেও এধারে কোথাও মানুষের বসতি আছে। সেখান থেকে লোকজন ওই পথ দিয়ে নদীর দিকে যাতায়াত করে। রাস্তাটা দেখতে দেখতে আশা এবং তীব্র উৎকণ্ঠার মিশ্র একটা অনুভূতি তার শিরায়ুতে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। আশা, কেননা এ অঞ্চলে মানুষ থাকলে তাদের সাহায্য পাওয়া যেতে পারে। উৎকণ্ঠার কারণ সেই মানুষগুলোর মতিগতি কেমন, জানা নেই। ওই কথাগুলোই কাল রাত্তিরে খাপছাড়া ভাবে তার মনে হয়েছিল।
রাজেকের গলা কানে এল, ছুটোবাবু–
মুখ ফিরিয়ে বিনু দেখতে পেল, রাজেক এবং তমিজ তার দিকে এগিয়ে আসছে। কখন ওদের ঘুম ভেঙেছে, টের পাওয়া যায় নি। একবার ঝিনুককেও দেখে নিল সে। মেয়েটা সেইভাবেই হাঁটু মুড়ে ঘাসের ওপর গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে আছে।
কাছে এসে রাজেক বলল, রাইত পুয়াইছে, রইদ উঠছে। অহন তো কিছু করন লাগে—
বিনু লক্ষ করল, মশা আর পোকার কামড়ে রাজেক এবং তমিজের হাত-পা মুখ ফুলে দাগড়া দাগড়া হয়ে আছে। সে আস্তে আস্তে মাথা নাড়ে, হ্যাঁ।
কাঁচা রাস্তাটা রাজেকের চোখেও পড়েছিল। সেদিকে আঙুল দেখিয়ে সে বলে, পথ যহন আছে, মনে লয় খোঁজ করলে কাছেপিঠে গেরামও মিলব।
হ্যাঁ, আমিও তাই ভাবছিলাম।
লগে ট্যাকাপ আছে, না বেবাক নায়ে চামের বাক্সে (সুটকেসে) থুইয়া আইছিলেন? তাইলে কিন্তুক বড় বিপদ–
বিনু জানায়, না, টাকা তার সঙ্গেই রয়েছে।
রাজেকের দুশ্চিন্তা কিছুটা কাটে। বলে, যাউক, আল্লার দোয়ায় ট্যাকাটা বাইচা গ্যাছে। অহন আমাগো যা অবোস্তা, পহা ছাড়া একটা কাইকও (এক পাও) ফেলান যাইব না। দুইটা ট্যাকা দ্যান। দেখি খাওনের জিনিস কিছু মিলে কিনা। আর হেই লগে এই জায়গার মাইনষের ভাবগতিক বুইঝা আসি। আপনেরা এইখান থিকা (থেকে) অন্য কুনোখানে লইডেন (নড়বেন) না। তমিজকে বলল, তুই এইহানে থাক। ছুটোবাবুগো পরি (পাহারা) দিবি।
বিনু কোমরের গোপন থলি থেকে দুটো টাকা বার করে রাজেককে দিল। রাজেক দূরের রাস্তাটার দিকে পা বাড়াতে যাবে, মানুষজনের গলা ভেসে এল। চকিতে ঘুরে দাঁড়াতেই চোখে পড়ল, নদীর দিক থেকে নানা বয়সের দশ বারটি লোক নিজেদের মধ্যে কথা বলতে বলতে কাঁচা পথটা ধরে এগিয়ে আসছে। নদীর কিনার ঘেঁষে একটা বড় ছইওলা নৌকোও দেখা যাচ্ছে। খুব সম্ভব, ওই নৌকোয় গাঙ পাড়ি দিয়ে তারা এসেছে।
রাজেক এস্তভাবে বলে, বইসা পড়েন ছুটোবাবু, তরাতরি (তাড়াতাড়ি) বইসা পড়েন। তার ভয়ের কারণ, বিনু দাঁড়িয়ে থাকলে ওই লোকগুলোর চোখে পড়ে যেতে পারে।
বিনুকে তাড়া দিতে দিতে নিজেও বসে পড়ে রাজেক, তার দেখাদেখি তমিজও।
বিনুর হাত পায়ের জোড় হঠাৎ আলগা হয়ে যায়। হুড়মুড় করে সে ঝিনুকের পাশে ভেঙে পড়ে। লোকগুলো ডাইনে বাঁয়ে, কোনও দিকে না তাকিয়ে রাস্তা ধরে দূরে উঁচু উঁচু গাছের জটলার আড়ালে মিলিয়ে যায়।
রাজেক তীক্ষ্ণ চোখে নজর রেখেছিল। সে বলল, আর ডর নাই ছুটোবাবু। অরা গ্যাছে গিয়া। এইবার– কথাটা শেষ না করে সে থমকে যায়।
বিনুর সাহস কিছুটা ফিরে এসেছিল। সে বলে, এবার কী?
চাপা গলায় রাজেক বলে, উই দ্যাখেন—
নদীর ধার থেকে ওপাশের রাস্তা দিয়ে সবাই চলে যায়নি। আরও একজনকে আসতে দেখা যাচ্ছে।
লোকটা মধ্যবয়সী। খুব একটা লম্বা নয়, মাঝারি মাপের মজবুত চেহারা, মুখময় কাঁচাপাকা দাড়ি। মাথার মাঝখানে গোল জালিকাটা টুপি, গায়ে চেক চেক দামী লুঙ্গি, আর বোম-ঘরগুলোর পাশে কাজকরা গোলাপি পাঞ্জাবি। পায়ে পাম্প শু। দেখে মনে হয়, পয়সাওলা সচ্ছল পরিবারের কর্তা।
রাজেক আগের মতোই গলার স্বর নিচু করে বলল, উই মিঞাছাব আগে যাউক গিয়া। হেরপর (তারপর) আমি যামু—
লোকটার তাড়াহুড়ো নেই, ধীরেসুস্থে হেঁটে যাচ্ছিল। হঠাৎ কী ভেবে এধারে তাকাল। বেতঝোপের আড়াল থাকলেও সে আবছাভাবে বিনুদের দেখতে পেয়েছে। লোকটা থমকে দাঁড়িয়ে গেল, এবং তীক্ষ্ণ সন্দিগ্ধ চোখে লক্ষ করতে লাগল। তারপর পায়ে পায়ে এগিয়ে এল।
কাল রাতে নিবিড় কুয়াশা আর অন্ধকারে ঘাতক বাহিনীর নজর এড়ানো গিয়েছিল, কিন্তু হেমন্তের এই সকালে চারদিকে যখন রোদের ঢল নেমেছে, বিনুরা ধরা পড়ে গেল। কাল ঠিক এই আশঙ্কাই করেছিল সে।
লোকটা বিনুদের কাছে এসে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল। এদিকে ঝিনুকের ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। জেগে উঠেই সামনে লোকটাকে দেখে আতঙ্কে বিনুর একটা হাঁটু আঁকড়ে ধরে সে, এবং চোখ বুজে ফেলে।
বিনুর পরনে ধুতি। লোকটা নিশ্চয়ই তার পরিচয় জেনে গেছে। সে টের পেল, ভয়ে পেটের ভেতরটা পাক দিয়ে উঠছে, গলার কাছে খুব শক্ত কী যেন ডেলা পাকিয়ে যাচ্ছে। মনে হল, হেমন্তের স্নিগ্ধ সকালে নদীর পাড়ে এই অঞ্চলটা হঠাৎ বায়ুশূন্য হয়ে গেছে। শ্বাস টানতে ভীষণ কষ্ট হতে লাগল তার।
রাজেক লোকটার ডান পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। শঙ্কিত এবং ত্রস্ত। হাত কপালে ঠেকিয়ে করুণা ভিক্ষার সুরে বলতে লাগল, সালাম মিঞাছাব, এনি (ইনি) ছুটোবাবু, রাইজদার হ্যামকত্তার নাতি। বি.এ, এম. এ পাস। দুনিয়ায় হ্যামকত্তার লাখান (মতো) মানুষ হয় না। তেনার কাছে গ্যালে কেওইরে (কাউকে)। বৈমুখ করে না। আমাগো বল-ভরসা হামকত্তা। আর উই যে ঝিনুকদিদি, বড় দুঃখী মাইয়া। তেনার কথা শুনলে পাষাণেরও বুক ফাইটা যাইব। ছুটোবাবু আর ঝিনুকদিদি কইলকাতায় যাইতে আছিল। কিন্তুক কাইল রাইতে–
