বিনু ধুতির খুঁট জোরে জোরে নেড়ে ঝিনুকের গা থেকে মশা এবং পোকা তাড়াতে তাড়াতে ব্যগ্রভাবে, ডাকতে লাগল, ঝিনুক-ঝিনুক–
সাড়াশব্দ নেই।
বুকের ভেতরটা ধক করে ওঠে বিনুর, দম বন্ধ হয়ে আসে। মশা আর বুনো পোকা তাড়ানো থামিয়ে দ্রুত একটা হাত ঝিনুকের নাকের নিচে নিয়ে এল সে। না, বেঁচে আছে। ত্রি তির করে নিশ্বাস পড়ছে। ফুসফুস থেকে ধীরে ধীরে আবদ্ধ বাতাস বেরিয়ে এল তার। অনেকখানি ঝুঁকে নরম গলায় ফের ডাকল, ঝিনুক–
ঝিনুক উত্তর দেয় না। হানাদারেরা নদীর দিকে চলে যাবার পর কিছুক্ষণ ক্ষীণ শব্দ করে কেঁদেছিল। আতঙ্ক বা মৃত্যুভয় এমনই প্রবল, এতই পরাক্রান্ত যে তার সঙ্গে দুর্বল শরীরে যুঝতে বুঝতে অসীম ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়েছে সে।
বিনু আর ডাকাডাকি করল না। ঘাসের ওপর থেকে ঝিনুকের মাথাটা সযত্নে কোলে তুলে নিয়ে কাপড়ের খুট নেড়ে মুখচোখ হাত-পা থেকে আবার পোকামাকড় আর মশা তাড়াতে লাগল। বাকি রাতটা না ঘুমিয়ে এভাবেই তাকে কাটিয়ে দিতে হবে।
.
৩.০২
বিনু ভেবেছিল, সারা রাত জেগে থাকবে। কিন্তু কখন সে নিজেও ঘুমিয়ে পড়েছে, জানে না।
ভোরের দিকে আবছাভাবে তার কানে পাখিদের কিচিরমিচির, ডানা ঝাঁপটানোর শব্দ আর নদীর একটানা কলকলানি ভেসে আসতে লাগল। আস্তে আস্তে চোখ মেলল বিনু। চারপাশে উঁচু উঁচু সব গাছ, বেতবন, ঝোপঝাড়। গাছপালার ফাঁক দিয়ে খানিক দূরে নদীর জলস্রোত দেখা যাচ্ছে। বিরাট বিরাট গাছগুলোর মাথায় ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি চঞ্চল ডানা মেলে উড়ছে আর সমানে চেঁচামেচি করে। চলেছে।
কুয়াশার পাতলা একটা স্তর এখনও আকাশের গায়ে জড়িয়ে আছে। তবে বেশিক্ষণ থাকবে না। অনেক দূরে দিগন্তের তলা থেকে সূর্য একটুখানি মাথা তুলেছে। রোদ সেভাবে ওঠেনি। তবে নরম আলো সমস্ত চরাচরের ওপর ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে। ঠাণ্ডা জলে হাওয়া উঠে আসছে নদীর দিক থেকে।
বিনু ভেবে পেল না, নদীর পাড়ে এমন একটা প্রায়-নিঝুম জংলা জায়গায় সে কিভাবে এসে পড়ল। ঘুমের মধ্যে কেউ কি তাকে এখানে ফেলে রেখে গেছে? পরক্ষণে স্মৃতির কোনও অনালোকিত পর্দায় টুকরো টুকরো, খাপছাড়া কিছু দৃশ্য আবছাভাবে ফুটে উঠতে লাগল। মশাল জ্বালিয়ে ঘাতকদের হানা, নৌকোয় সুটকেস, বেতের ডালা ইত্যাদি ফেলে ঝিনুককে কোলে করে রুদ্ধশ্বাসে নদীর পাড়ে উঠে। আসা, ইত্যাদি। ক্রমশ স্পষ্টভাবে সব মনে পড়ে গেল।
ঘুম ভাঙার পর এই প্রথম বিনুর খেয়াল হল, সে প্রায় চিত হয়ে শুয়ে আছে, আর ডান উরুর ওপর ভারী কিছুর চাপ অনুভব করছে। আস্তে আস্তে উঠে বসল বিনু। কাল যেভাবে ঘুমন্ত ঝিনুকের মাথা কোলের ওপর রেখে শুইয়ে দিয়েছিল, ঠিক সেইভাবেই এখনও সে ঘুমোচ্ছে। পা দুটো বুকের কাছে গুটনো, ঠাণ্ডা হাওয়ায় তার রোগা শরীর কেঁপে কেঁপে উঠছে।
ঝিনুকের দিকে ভাল করে তাকিয়ে চমকে উঠল বিনু। ওর গালে গলায় কপালে হাতে পায়ে, শরীরের খোলা জায়গাগুলোতে কোথাও এতটুকু ফাঁক নেই। চামড়ায় চাকা চাকা অসংখ্য লাল দাগ। সমস্ত রাত মেয়েটাকে মশা এবং বুনো পোকারা ছিঁড়ে খেয়েছে। রাজদিয়া থেকে আসার সময় স্নেহলতা খোঁপা বেঁধে দিয়েছিলেন। খোঁপা ভেঙে রুক্ষ চুল এখন উড়ছে।
খানিক দূরে রাজেক এবং তমিজকে দেখা গেল অসাড়ে ঘুমোচ্ছ। কাল তাদের ওপর দিয়েও কম ধকল যায় নি। তার ওপর একনাগাড়ে কয়েক ঘন্টা নৌকো বেয়েছে। সারা রাত এক ফোঁটা জলও পেটে পড়ে নি।
এইভাবে বেতবনের আড়ালে চুপচাপ হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকলে চলবে না। বাঁচার একটা মরিয়া চেষ্টা তো করতেই হবে। কাল মৃত্যুভয়ে সব অনুভূতি ভোতা হয়ে গিয়েছিল। ক্ষুধাতৃষ্ণার বোধ ছিল না। এখন পেটের ভেতর খিদে হাজারটা উঁচ বিঁধিয়ে চলেছে। কাছাকাছি হাটবাজার বা মানুষের বসতি আছে কিনা, কে জানে। থাকলে চিড়ে মুড়ি টুড়ি যোগাড় করা যেতে পারে।
পর মুহূর্তেই নিদারুণ ভয়ে শিরদাঁড়া বেয়ে বরফের মতো কনকনে স্রোত বয়ে গেল বিনুর। রাত্তিরে গাঢ় কুয়াশা এবং অন্ধকারের আড়াল ছিল। তারা লুকিয়ে থাকতে পেরেছে। কিন্তু সূর্যোদয় মানেই আতঙ্ক। দিনের আলোয় কারোর না কারোর চোখে পড়ে যাবার একশ’ ভাগ সম্ভাবনা। তার পরিণতি কী হতে পারে, বিনুর পরিষ্কার ধারণা আছে। চারপাশের পরিস্থিতি না জেনে, না বুঝে, কোথাও পা বাড়ানো তার পক্ষে সম্ভব নয়। সেটা হবে চূড়ান্ত হঠকারিতা।
কুয়াশা ছিঁড়েখুঁড়ে এতক্ষণে রোদ উঠে গেছে। মাসখানেক আগেও রোদে গলানো গিনির মতো যে উজ্জ্বলতা ছিল, এখন আর তা নেই। কেমন যেন ম্লান, নিষ্প্রভ। হেমন্ত যত শীতের দিকে গড়াবে, সূর্যালোক ততই মলিন হতে থাকবে।
খুব আলগোছে, ঝিনুকের ঘুম যাতে ভেঙে না যায়, ওর মাথাটা নিচে ঘাসের ওপর নামিয়ে দিল বিনু। তারপর উঠে দাঁড়াতে গিয়ে দেখল, পারছে না। হাতের ভর দিয়ে শরীর সামান্য তোলার পর কাত হয়ে বসে পড়ল। পায়ে সাড়া নেই। সারা রাত উরুর ওপর ঝিনুকের মাথা থাকায় তার চাপে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। বসে বসেই বেশ কয়েক বার দুই পা দ্রুত মুড়ে, ঝাড়া দিয়ে এবং টান টান করে রক্তের স্বাভাবিক গতি ফিরিয়ে আনল। অবশ ভাবটা প্রায় কেটে গেছে। এবার দাঁড়াতে পারল বিনু। এখান থেকেই গাছপালার ফাঁক দিয়ে এধারে ওধারে তাকাতে লাগল। কাল রাতেও সে চারপাশে কী আছে না-আছে দেখতে চেষ্টা করেছিল। কিন্তু ঘন কুয়াশা এবং অন্ধকার ভেদ করে নজর দশ হাত দূরেও পৌঁছয়নি। ডাইনে বাঁয়ে সামনে, সমস্ত কিছুর ওপর কেউ গাঢ় কালি লেপে রেখেছিল। কাছাকাছি কোথাও গ্রাম আছে কিনা, আজও বোঝা যাচ্ছে না। মানুষজন চোখে পড়ছে না। পাখিদের চেঁচামেচি এবং নদীর অশ্রান্ত জলস্রোতের শব্দ ছাড়া যত দূরে চোখ যায়, শুধুই অপার স্তব্ধতা।
