কিভাবে রাজেকের ক্ষতিপূরণ করা সম্ভব, ভেবে পাচ্ছিল না বিনু। হঠাৎ আলোর চিকন একটা রেখা যেন তার চোখে পড়ে। রাজেক অঝোরে কেঁদে যাচ্ছিল, তার কাঁধে একটা হাত রেখে বলে, কেঁদো না, কেঁদো না। আমার কথা শোন। রাজদিয়ায় ফিরে গিয়ে দাদুর সঙ্গে দেখা করে সব বলো। তিনি নিশ্চয়ই কিছু একটা ব্যবস্থা করে দেবেন।
দাদু অর্থাৎ হেমনাথ। রাজদিয়াবাসীদের তো বটেই, চারপাশের বিশ পঁচিশখানা গ্রামের লোকজনেরও তিনি হেমকত্তা বা হ্যামকত্তা। ওই অঞ্চলের সব চাইতে শ্রদ্ধেয়, সব চাইতে সম্মানিত ব্যক্তি। পাকিস্তান হয়ে গেছে, অনেক কিছুর পরিবর্তন ঘটেছে, তবু এখনও সকলে তাকে যথেষ্ট খাতির করে। মনে কারও যদি বিদ্বেষ কিংবা আক্রোশ থাকেও, সামনাসামনি কেউ এমন কিছু করে না বা বলে না, যাতে তিনি কষ্ট পান অথবা তার মর্যাদার হানি হয়।
বিনুর কথায় হতাশার শেষ প্রান্ত থেকে যেন উঠে আসে রাজেক। চকিতে মুখ থেকে হাত সরায়। আশার সংকেত সেও পেয়ে গেছে। হেমনাথের কাছে কোনও আর্জি নিয়ে গিয়ে দাঁড়ালে তিনি পারতপক্ষে কাউকে ফেরান না, এটা সবাই জানে। রাজেক নিশ্চিত, বিহিত একটা হবেই। রাজেকের দুই গাল চোখের জলে মাখামাখি হয়ে গিয়েছিল। হাতের পিঠ দিয়ে গাল মুছতে মুছতে সে বলে, হ, রাইজদায় (রাজদিয়ায়) ফিরা আগে হ্যামকত্তার কাছে যামু। পরক্ষণে কিছু খেয়াল হতে সচকিত হয়ে ওঠে, কিন্তুক ছুটোবাবু–
কী?
তারপাশায় আপনেগো পৌঁছাইয়া দিমু ক্যামনে?
বিনু চমকে ওঠে। রাজেকের নৌকো খোয়া গেছে, হেমনাথ নিশ্চয়ই তার ব্যবস্থা করে দেবেন, কিন্তু এই মুহূর্তে যে সমস্যা বিশাল ভীতিকর আকার নিয়ে সমস্ত আকাশপাতাল জুড়ে তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে তা হল, নৌকো ছাড়া কিভাবে তারপাশার স্টিমারঘাটে পৌঁছবে? সে একা থাকলেও না হয় ঝুঁকি নিয়ে একটা চেষ্টা করতে পারত। কিন্তু সঙ্গে রয়েছে ঝিনুক। রুগ্ণ, কৃশ, অস্থিসার। জীবনীশক্তি তার প্রায় ফুরিয়ে গেছে। এক সঙ্গে দশ পা হাঁটলে সে হাঁপিয়ে পড়ে। এই ঝিনুককে নিয়ে তারপাশা পর্যন্ত নিরাপদে যাওয়া কি আদৌ সম্ভব হবে?
অন্ধকার এবং কুয়াশা ক্রমশ আরও ঘন হচ্ছে। নদীর পাড়ে ওই অঞ্চলটা যে ঠিক কোথায় এবং জায়গাটার কী নাম, কিছুই আন্দাজ করা যাচ্ছে না। এর মধ্যে এখানে আগুন লাগানো, খুনখারাপি, ধর্ষণের মতো বড় রকমের ঘটনা ঘটে গেছে কিনা, এখানকার মানুষজন কতটা বিদ্বেষ এবং আক্রোশ পুষে রেখেছে, সবই অজানা। একটা দমবন্ধ করা সর্বগ্রাসী আতঙ্ক প্রকাণ্ড হাঁ মেলে বিনুকে যেন গিলে ফেলতে চাইছে। এখন কী করা উচিত, সে ভাবতে পারছে না। তার বোধ বুদ্ধি এবং চিন্তাশক্তি, সমস্ত কিছু লোপ পেয়ে যাচ্ছে। ঝাঁপসা গলায় বিনু শুধু বলতে পারল, এখন কী করা?
রাজেকের মাথাতেও খবু সম্ভব একই চিন্তা ঘুরছিল। সে বলল, ছুটোবাবু, এই আন্ধারে আর খুয়ায় কিছুই করন যাইব না। বিহান (সকাল) হউক, রইদ (রোদ) ফুটুক। হেরপর (তারপর) চাইর দিকের গতিক বুইঝা ব্যবোস্তা করুম।
নিঝুম নদীতীরে, কুয়াশামগ্ন আকাশের নিচে হেমন্তের এই রাতটা বেতঝোপের আড়ালে বসে কাটানো ছাড়া অন্য উপায় নেই। কাল ভোর হলে, আলো ফুটলে, কী ঘটবে তা আর ভাবা যাচ্ছে না। অনিবার্য, অজানা নিয়তির কাছে নিজেকে সঁপে দিল বিনু।
অনেকটা সময় তারপর কেটে গেছে।
চারপাশের ঝোপঝাড়ে ঝিঁঝিরা একটানা ডেকে যাচ্ছে। এই এক পতঙ্গ যাদের ক্লান্তি নেই। মাটির নিচে, নাকি গাছের পাতায় বা ডালে নিজেদের লুকিয়ে রেখে দিবারাত্রি ডেকে যায়। এধারে ওধারে অপার্থিব সবুজ আলো জ্বেলে ঝাকে ঝাকে জোনাকি উড়ছে। কাছে দূরে সর সর করে অদৃশ্য সরীসৃপেরা পেট টেনে টেনে ঘাসের ওপর দিয়ে চলে যাচ্ছে। হয়তো সাপ কিংবা গিরগিটি জাতীয় নিশাচর কোনও প্রাণী। কত যে পোকামাকড় আর মশা বিনুদের হেঁকে ধরেছে তার হিসেব নেই। অনেক দূরে একপাল শিয়াল ডেকে উঠল, পরক্ষণে তাদের চিরশত্রু কুকুরেরা রাগে গজরাতে গজরাতে খুব সম্ভব ওদের তাড়া করে কোন দিকে যেন দৌড়ে গেল।
হঠাৎ বিনুর মনে পড়ল, নৌকোটায় তাদের সুটকে বিছানা খাবার দাবার এবং টুকিটাকি নানা দরকারী জিনিস ছিল। হানাদারেরা নৌকোর সঙ্গে সর্ব নিয়ে গেছে। নিজের অজান্তে তার একটা হাত কোমরের কাছে চলে এল। সেখানে ধুতির নিচে, কাপড়ের সরু থলিতে হাজার খানেক টাকা পুরে ফিতে বেঁধে নিয়ে এসেছিল। টাকাগুলো জায়গামতোই রয়েছে। এখন এই নগদ টাকাটাই যা ভরসা। শেষ পর্যন্ত যদি বেঁচে থাকে, ওটা কাজে লাগবে।
বিনু ডাকল, রজেক—
রাজেক সাড়া দিল, ক’ন ছুটোবাবু—
তোমাদের কিছুই খাওয়া হল না। কত খাবার সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলাম। সব গেল–
আপনেরাও তো খান নাই। একটা রাইত আমাগো নসিবে উপাস দেওয়া আছে। কী আর করুম? বিহান হইলে দেখি, যদিন চিড়া মুড়ি জুটাইতে পারি–
বিনু আর কিছু বলল না।
মুখ থেকে হাত সরিয়ে নেবার পর ঝিনুক অনেকক্ষণ জোরে জোরে শ্বাস টেনেছিল। তারপর তার গলা থেকে ক্ষীণ, কাতর কান্নার মতো আওয়াজ বেরিয়ে আসছিল। এখন ঘাসের ওপর পা দুটো অনেকখানি গুটিয়ে কাত হয়ে শুয়ে আছে সে। অসাড় ও নিস্পন্দ। তার কান্না কখন থেমে গেছে, খেয়াল করেনি বিনু। ঝাঁকে ঝাঁকে মশা এবং বুনো পোকামাকড় তার মুখে, হাতে পায়ে এবং শরীরের খোলা জায়গাগুলোতে অনবরত হুল ফুটিয়ে চলেছে, কিন্তু কিছুই সে টের পাচ্ছে না। গাঢ় কুয়াশায় মনে হয়, একটা অনুভূতিহীন দেহের ঝাঁপসা কাঠামো।
