বিনু উত্তর দিল না। তারপাশায় পৌঁছনো পর্যন্ত রাজেক এবং তমিজের বাঁচা বা মরা তাদের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। সে জানে, এই বিশ্বাসী, নিরক্ষর মানুষ দুটি প্রাণ গেলেও কোনও অবস্থাতেই তাদের ফেলে পালিয়ে যাবে না। তাদের দায়িত্ববোধই পালাতে দেবে না।
রাজেক বলল, ইবলিশগুলান গ্যাছে গিয়া। আর ডর নাই—
হঠাৎ কী মনে পড়ায় বিনু বলল, কিন্তু–
কী ছুটোবাবু?
ভয় কিছুটা কেটে গেলেও নতুন করে একটা দূর্ভাবনা বিনুকে অস্থির এবং চকিত করে তোলে। এই হানাদারেরা তাদের খুঁজে পায়নি ঠিকই, কিন্তু নদীতে ওরা টহলদারি থামিয়ে দেবে, এমন সম্ভাবনা খুবই কম। কেননা, শুধু বিনুরাই না, দেশ ছেড়ে হাজার হাজার মানুষ চলে যাচ্ছে। শিকার এখন খুবই সুলভ। নৌকোয় করেই বিনুদের তারপাশায় যেতে হবে। তখন যে ফের ওদের পাল্লায় পড়বে না, জোর দিয়ে তা বলা যায় না।
রাজেক আর তমিজ আগাছার জঙ্গল থেকে এর ভিতর বিনুদের কাছে চলে এসেছে। বিনুর দুশ্চিন্তার কারণ জানার পর আস্তে আস্তে মাথা নাড়ে রাজেক। ঘোর আশঙ্কা তাদের মধ্যেও চারিয়ে যেতে থাকে। কুয়াশায় অন্ধকারে রাজেকের মুখ ঝাঁপসা দেখাচ্ছে, তবু বোঝা যায়, সে ভীষণ চিন্তাগ্রস্ত।
রাজেক বলে, বিপদের কথা ছুটোবাবু। এই দিকটা আমি ভাইবা দেখি নাই। শালারা গাঙ (নদী) ছাইড়া চইলা যাইব বইলা মনে লয় (হয়) না।
সন্ত্রস্ত বিনু বলে, তা হলে কী করে তারপাশায় পৌঁছব?
রাজেক একটু চুপ করে থাকে। তারপর বলে, এট্টা উপায় আছে ছুটোবাবু। গাঙের মইদ্যে (মধ্যে) বেশি দূর নাও লইয়া যামু না। কিনার ঘেইষা ঘেইষা যাইতে থাকুম। তভু যদিন–
যদি কী?
ইবলিশের ছাওগুলান দেইখা ফেলাইলে অখনকার লাখান পারে উইঠা ঝোপড়া কি জঙ্গলে লুকাইয়া থাকুম।
রাজেক যত সহজে সম্ভাব্য ভয়ঙ্কর বিপদ থেকে রেহাই পাবার উপায় জলের মতো বুঝিয়ে দিল, বিনু জানে সমস্যাটা তত সরল নয়। খানিক আগে ঘাতকেরা নদীর দিকে চলে যাবার পর বুকের ভেতরটা অনেকখানি চাপমুক্ত মনে হয়েছিল। এখন সে টের পেল, নতুন করে অন্তহীন দুশ্চিন্তা ফিরে আসছে। উদ্বিগ্ন মুখে বলল, বার বার কি ওদের ফাঁকি দিতে পারব? একবার না একবার ঠিক ধরা পড়ে যাব। তখন?
রাজেক কী উত্তর দিতে যাচ্ছিল, হঠাৎ তার চোখে পড়ল, গাব গাছের গা থেকে বাঁধন খুলে হানাদারেরা তাদের নৌকোটা নিয়ে চলে যাচ্ছে। তার গলা চিরে কাতর শব্দ বেরিয়ে এল, হা আল্লা
দৃশ্যটা বিনুর চোখেও পড়েছিল। বিহ্বলের মতো তাকিয়ে রইল সে। বোঝা যায়, সওয়ারির সন্ধান না পাওয়ায় ক্ষিপ্ত হয়ে ওরা নৌকোটা নিয়ে যাচ্ছে।
এদিকে প্রাথমিক ভীতি কাটিয়ে লাফ দিয়ে উঠে পড়েছে রাজেক। নৌকোটা হানাদারদের কাছ থেকে ছিনিয়ে আনার জন্য চিৎকার করতে করতে হিতাহিত জ্ঞানশূন্যের মতো সে নদীর দিকে ছুটতে যাবে, বিনুর আকস্মিক বিহ্বলতা কেটে গেল। দ্রুত উঠে দাঁড়িয়ে রাজেককে ধরে ফেলল সে। বলল, ওরা অনেক দূর চলে গেছে। ধরতে পারবে না। তা ছাড়া—
রাজেক জোর করে তার হাত ছাড়িয়ে নিতে চাইল। উদ্ভ্রান্তের মতো বলল, আমারে আটকাইয়েন না ছুটোবাবু। হানাদারদের উদ্দেশে কুৎসিত গালাগাল দিয়ে বলতে লাগল, ধরতে পারুম। গাঙ হাতইরা (সাঁতরে) ঠিকই শালাগো লাগুর (নাগাল) পামু–
বিনু রাজেককে ছাড়ল না, তার হাত আরও শক্ত করে ধরে থাকল। বলল, সর্বনাশ ডেকে এনো রাজেক। ওরা ষোল সতের জন, সবার হাতে দা লাঠি বর্শা রয়েছে। যদি ওদের কাছে পৌঁছতেও পার, ওরা জেনে যাবে তুমি হিন্দু সওয়ারি নিয়ে যাচ্ছিলে। তার ফল কী হবে, মাথা ঠাণ্ডা করে ভাবো।
এদিকটা একেবারেই খেয়াল করে দেখেনি রাজেক। চোখের সামনে তার নৌকোটা নিয়ে যাচ্ছে দেখে মাথার ভেতর আগুন ধরে গিয়েছিল। কিভাবে ওটা ফিরিয়ে আনবে, সেটাই ছিল একমাত্র চিন্তা। বিনুর কথা শোনার পর তার মনে হল, ঠিকই বলেছে ছোটবাবু। সশস্ত্র ওই বাহিনীর হাত থেকে নৌকোটা উদ্ধার করে আনার চেষ্টা নেহাতই গোঁয়ার্তুমি। সে নদীতে ঝাঁপ দিলে তমিজও তার সঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়ত। কিন্তু দু’জন নিরস্ত্র মানুষের পক্ষে অতগুলো খুনীর সঙ্গে যুঝে ওঠা অসম্ভব। নিজেদের প্রাণ তো যেতই, হিংস্র শিকারি জন্তুর মতো গন্ধ শুকে খুঁকে ওরা বিনু এবং ঝিনুককেও নিশ্চয়ই খুঁজে বার করত।
রাগে এবং হতাশায় ধীরে ধীরে বসে পড়ে রাজেক। মাথা ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে দু’হাতে শব্দ করে কেঁদে ওঠে। বলে, চাইর বচ্ছর ধইরা এট্টা দুইটা কইরা ট্যাকা জমাইয়া নাওখান কিনছিলাম। অ্যামন দিনও গ্যাছে, বৌ-পোলাপান লইয়া উপাস দিয়া থাকছি। তভু জমাইনা ট্যাকায় হাত দেই নাই। হেই নাও পুঙ্গির পুতেরা লইয়া গেল! এক্কেরে শ্যাষ হইয়া গ্যালাম ছুটোবাবু। নাও নাই, অহন (এখন) কী খামু, ক্যামনে সোংসার চলব!
নৌকো খোয়া যাওয়ায় উন্মাদ হয়ে গেছে রাজেক। এটাই স্বাভাবিক। সওয়ারি নিয়ে শীতগ্রীষ্ম বার মাস যাদের পদ্মা মেঘনা ধলেশ্বরী পাড়ি দিয়ে পেটের ভাত জোটাতে হয়, নৌকোই তাদের সর্বস্ব। রাজেককে দেখতে দেখতে বুকের ভেতর চাপা কষ্ট অনুভব করতে থাকে বিনু। তীব্র অপরাধবোধে ভেতরে ভেতরে কুঁকড়ে যায়। রাজেকের এত বড় সর্বনাশটা যে হয়ে গেল সেজন্য নিজেও কি সে কম দায়ী? তারপাশার স্টিমারঘাটে যাবার জন্য ঝিনুককে নিয়ে রাজেকের নৌকোয় যদি না উঠত, আর লুটেরারা তার নৌকোটা নিয়ে যেত না।
