ওদিকে আরেক জন গলা অনেক উঁচুতে তুলে বলে, হালারা কাছাকাছিই আছে। বেশি দূর যাইতে পারে নাই। উপুরে উইঠা বিচরাইয়া (খুঁজে) দেখি–
কথাগুলো পরিষ্কার শোনা যাচ্ছে। বেতঝোপের আড়ালে বসে থাকতে থাকতে বুকের ভেতর হৃৎপিন্ডের উত্থানপতন মুহূর্তে থমকে গেল বিনুর। অথৈ নদীতে ভাসতে ভাসতে কলকাতার দিকে এই বিপজ্জনক যাত্রাপথে যে কালীর ছবিটাকে বড় ভরসা মনে হয়েছিল, সেটাই মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াবে কিনা, কে বলবে।
ওধার থেকে রাজেক চাপা গলায় বলল, অরা (রা) গোন্ধ পাইছে। কী হইব ছুটোবাবু?
কী হবে, বিনুর জানা নেই। তবে রাজেক যে ভয় পেয়েছে, সেটা তার গলার স্বর শুনে আন্দাজ করা যাচ্ছে। উত্তর না দিয়ে উদভ্রান্তের মতো সেই উন্মত্ত, উত্তেজিত লোকগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকে সে।
একটু পর দু’তিনজন একসঙ্গে হেঁকে ওঠে, নাও কার? কার নাও?
রাজেক সতর্ক করে দেয়, হুমৈর (সাড়া) দিয়েন না ছুটোবাবু।তার গলা এবার আরও চাপা শোনায়।
বিনু বলে, জানি।
ওধারে নৌকো থেকে সমানে হুমকি ভেসে আসছে, রাও (শব্দ) না কইরা বাচবি না হুমুন্দিরা। খাড়, দেখি কুন গাদে (কোন গর্তে) সাইন্ধা (চুকে) আছস–
তারপরেই দেখা গেল, মশাল আর দাবল্লম নিয়ে চার পাঁচ জন পাড়ের মাটিতে লাফিয়ে পড়ল। বাকি সবাই নৌকোর পাটাতনে দাঁড়িয়ে সমানে হল্লা করে চলেছে।
এদিকে যারা পাড়ে নেমেছিল, তারা গাছগাছালির ভেতর মশালের আলো ফেলে খোঁজাখুঁজি শুরু করেছে।
নিবিড় বেতঝোপের পেছনে বিনুকে প্রাণপণ আঁকড়ে ধরে ভয়ার্ত, বিহ্বল চোখে হিংস্র লোকগুলোকে দেখছিল ঝিনুক। কিছুকাল আগে ঢাকার সেই ভয়ঙ্কর দৃশ্যগুলি মনে পড়ে যাচ্ছিল তার। এমনই একটা হিংস্র বাহিনী সড়কি ল্যাজা নিয়ে শিকারের সন্ধানে বেরিয়ে পড়েছিল। ঘরের এক কোণে আলমারির। আড়ালে নিজের শরীরটাকে যতটা সম্ভব গুটিয়ে নিয়ে লুকিয়ে রেখেছিল সে, আর তীব্র আতঙ্কে সমানে কাঁপছিল। কিন্তু এত করেও রেহাই পাওয়া যায়নি। জন্তুরা তাকে টেনে বার করতে করতে আদিম উল্লাসে ফেটে পড়েছিল।
দৃশ্যটা স্মৃতির স্তর ঠেলে চোখের সামনে ভেসে উঠতেই নিজের অজান্তে ঝিনুকের গলা থেকে কাতর, শীর্ণ একটা আওয়াজ বেরিয়ে এল। তার মনে হল, ঢাকার মারাত্মক ঘটনার মতো এখনই কিছু। একটা ঘটে যাবে। সেদিনের মতোই তার পা থেকে মাথা পর্যন্ত থরথর কাঁপছে। চোখ দুটো ঠেলে। বেরিয়ে আসবে যেন।
লোকগুলো ঝিনুকের গলা শুনতে পেলে তার পরিণতি কী হতে পারে, ভাবতেই আতঙ্কগ্রস্তের মতো তার মুখটা চেপে ধরল বিনু। হেমন্তের হিমঝরা রাত্তিরে তার শরীর ঘামে ভিজে গিয়েছে। মনে হচ্ছে, মেরুদন্ডের ভেতর দিয়ে ঠান্ডা কনকনে বরফের স্রোত বয়ে চলেছে। ঝিনুক তাকে প্রাণপণে জাপটে ধরল। বিনু টের পাচ্ছে, জোরে জোরে বুক তোলপাড় করে শ্বাস ফেলছে ঝিনুক। তার রোগা শরীরটা ভয়ে দুমড়ে, বেঁকে যাচ্ছে।
মুখ চেপে ধরার জন্য ভীষণ কষ্ট হচ্ছিল ঝিনুকের। হঠাৎ নিজেকে ছাড়িয়ে নেবার জন্য মাথা ঝাঁকাতে থাকে সে। বিনু জানে, ঝিনুকের মুখ থেকে হাত সরে গেলেই চিৎকার করে উঠবে, কিন্তু কোনওভাবেই তা হতে দেওয়া যায় না।
একসময় ঝোপঝাড়ের পাশ দিয়ে চারদিকে মশালের আলো ফেলতে ফেলতে দূরে চলে গেল লোকগুলো। খানিকক্ষণ পর ফিরে এসে নিজেদের মধ্যে কথা বলতে বলতে নদীর দিকে ফিরে যেতে লাগল।
কুত্তার পুতেরা কুনখানে যে পলাইল–
দিনের বেইল (বেলা) হইলে ঠিক বিচরাইয়া বাইর করতাম। শিকার ফসকে যাওয়ায় লোকগুলোকে হতাশ মনে হল। ওরা চলে যাবার পর ঝিনুকের মুখ থেকে হাত সরাল বিনু। এতক্ষণ স্নায়ুমন্ডলী কষে বাঁধা তারের মতো টান করে নিজেও শ্বাসরুদ্ধের মতো বসে ছিল সে। এখন ফুসফুস ভরে অনেকখানি বাতাস টেনে নিল। তাদের রাজদিয়ার আশেপাশে এর মধ্যে খুনখারাপি, রক্তপাত শুরু হয়েছে। ঘটেছে ধর্ষণ, বহু বাড়িতে আগুন লাগানোর ঘটনাও। কিন্তু রাজদিয়ায় তেমন কিছু ঘটেনি। তবে প্রবল উত্তেজনা রয়েছে। প্রচন্ড উৎকণ্ঠার মধ্যে দিন কাটালেও, আজ এই প্রথম বিনু জানলো, মৃত্যুভয় কাকে বলে। বেতবঝাপের আড়াল থেকে প্রায় সামনাসামনি ঘাতকদের দেখে তার সারা গা বেয়ে ঘামের স্রোত তো বয়ে যাচ্ছিলই, হৃৎপিন্ড থেকে শুরু করে হাত-পা, স্নায়ু, চিন্তা করার শক্তি, সমস্ত কিছু আসাড় হয়ে যাচ্ছিল। পেটের ভেতরটা গুলিয়ে উঠছিল, কপালের দুপাশের শিরা উপশিরা ছিঁড়ে ছিঁড়ে পড়ছিল। আপাতত মৃত্যুর হাত থেকে রেহাই পাওয়া গেছে। যে আতঙ্ক পাথরের চাঁইয়ের মতো তার ওপর চেপে বসেছিল, সেটা অনেকখানি সরে গেছে। কিছুটা হলেও স্বস্তি বোধ করছে বিনু।
ঝিনুক ভীষণ হাঁপাচ্ছিল। আতঙ্ক কেটে যাবার পর সে খুব কাহিল হয়ে পড়েছে। যে হাত দিয়ে বিনুকে জাপটে ধরেছিল, সে দুটো আলগা হয়ে ঝুলছে। চোখ বুজে আসছে। দুই ঠোঁট সামান্য ফাঁক হয়ে আছে। তার গলা চিরে দুর্বল, কাতর কান্না বেরিয়ে আসছিল।
ওধারে বিনুর মতোই কাঠ হয়ে দমবন্ধ করে বসে ছিল রাজেকরা। ধীরে ধীরে লম্বা নিশ্বাস ফেলে রাজেক ডাকল, ছুটোবাবু–
শরীর আর মনের ওপর দিয়ে তীব্র ঝড় বয়ে গিয়েছে বিনুর। নিজেকে ক্লান্ত, বিধ্বস্ত লাগছিল। নিজীব গলায় সে সাড়া দিল, বল–
তরাসে বুকের ভিরে উয়াস (শ্বাস) আটকাইয়া গেছিল।
