বিনু কী বলতে যাচ্ছিল, তার আগেই মাঝনদী থেকে তুমুল হল্লার শব্দ ভেসে আসে। চমকে সেদিকে তাকাতেই চোখে পড়ে, দু’টো ছইহীন লম্বা ধাঁচের খোলা নৌকোয় প্রচুর আলো জ্বলছে। মনে হয় ওগুলো মশাল। আলো থাকায় বোঝা যাচ্ছে, নৌকো দু’টোয় অনেক লোকজন। তারাই হল্লা করছে। তবে কী বলছে, কোথায় কী উদ্দেশ্যে ওরা চলেছে, এত দূর থেকে বোঝা যাচ্ছে না।
বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না। কুয়াশা ঢাকা নদীতে সঞ্চরমান মশালের আলো দেখে এবার আন্দাজ করা যাচ্ছে, নৌকো দু’টো এদিকেই ধেয়ে আসছে।
বিনুদের নৌকোটা নদীর পাড় থেকে একশ’ হাত তফাত দিয়ে যাচ্ছিল। দূরের নৌকো দু’টো যেভাবে আসছে, তাতে ভয়ঙ্কর একটা ইঙ্গিত রয়েছে। বিনুর হৃৎপিন্ডের উত্থানপতন থমকে গেল যেন।
ওদিকে ছইয়ের দু’ধারে রাজেক এবং তমিজের শিরদাঁড়াও টান টান হয়ে গেছে। নৌকো দু’টোয় যে লোকগুলো উন্মাদের মত চিৎকার করছে তাদের মতলব যে ভাল নয়, মারাত্মক কোনও অভিসন্ধি মাথায় নিয়ে তারা এধারে আসছে, সেটা স্পষ্ট হয়ে গেছে। একটা ব্যাপার রাজেকরা ভেবে পায় না, তাদের নৌকোয় বাইরের পাটাতনে আলো নেই, নিবন্ত একটা হেরিকেন রয়েছে ছইয়ের ভেতরে। দূর থেকে তা বোঝার উপায় নেই। তবু গাঢ় কুয়াশা এবং অন্ধকার ভেদ করে কিভাবে ওরা তাদের দেখতে পেয়েছে, কে জানে। ইবলিশের চোখ। বিনুর মতো রাজেকদের কাছেও একই সাঙ্ঘাতিক সংকেত পৌঁছে গেছে।
রাজেক চাপা গলায় বলল, ছুটোবাবু, গতিক ভালা বুঝি না।
নদীতেও আজকাল ঘাতকেরা হানা দিচ্ছে, এটা আগেই কানে এসেছিল বিনুর। আশঙ্কা থাকলেও ভেবেছিল, নিরাপদেই তারপাশায় পৌঁছে যেতে পারবে, কিন্তু সেটা বোধহয় আর সম্ভব হল না। হেমন্তের এই ঠান্ডা, খোলা নদীতে নৌকোয় বসে থাকতে থাকতে তার সারা গা ঘামে ভিজে যেতে লাগল। কাঁপা গলায় হতবুদ্ধির মতো বিনু জিজ্ঞেস করে, এখন কী করা যায়?
রাজেক দূরের নৌকা দু’টোর দিকে নজর রাখছিল। বলল, হুমুন্দির পুতেরা ঝামেলা পাকাইব মনে লয় (হয়)। এক কাম করি ছুটোবাবু–
কী?
নাও পারে ভিড়াইয়া হগলে (সবাই) উপুরে উইঠা গাছগাছালির আবডালে লুকাইয়া থাকি। অরা আইসা কী করে দেখি। হেইর পর অবোস্তা বুইঝা ব্যবোস্তা করন যাইব।
যা ভাল বোঝো, কর। বিনু এতটাই আতঙ্কগ্রস্ত যে ভেবে চিন্তে নিজে থেকে কোনও রকম সিদ্ধান্ত নিতে পারছিল না। তার মাথার ভেতর সব কিছু তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছিল।
রাজেক চেঁচিয়ে ছইয়ের ওধারের গলুইতে বসা তমিজকে বলল, পারে নাও ভিড়ামু। তরাতরি বৈঠা চালা–
নদীর ওপর দিয়ে নৌকোটাকে প্রায় উড়িয়ে কিনারে এনে কাছি দিয়ে একটা মোটা গাব গাছের গুঁড়িতে বেঁধে ফেলল রাজেক। ওদিকে সেই নৌকা দুটো ঝড়ের গতিতে ধেয়ে আসছে। ত্রস্তভাবে সে বলল, ছুটোবাবু, ঝিনুক বইনেরে লইয়া উপুরে ওঠেন—
ঝিনুক কাত হয়ে শুয়ে ছিল। তার হাত ধরে টেনে উঠিয়ে প্রায় পাঁজাকোলা করে পাড়ের মাটিতে তুলে আনল বিনু। নির্জীব গলায় ঝিনুক শুধু বলল, আমরা তো স্টিমারঘাটে যাব। এখানে নামলে কেন?
বিনু বলল, পরে শুনো–
ঝিনুক আর কোনও প্রশ্ন করল না।
বিনুরা নেমে যাবার পর রাজেক আর তমিজও পাড়ে উঠল। চারদিক ভাল করে তাকিয়ে খানিক দূরে ঘন বেতঝোপ আর আগাছার জঙ্গল দেখতে পেল রাজেক। বলল, ছুটোবাবু, আপনেগো এইখানে থাকন ঠিক অইব না। শালার পুতেগো চৌখে পড়লে কী করব ক্যাঠা (কে) জানে। উই ব্যাত ঝোপড়ার পিছে গিয়া বইয়া থাকেন। একেবারে মুখ বুইজা থাকবেন। অরা য্যান ট্যার না পায়।
আর তোমরা?
আমরাও আপনেগো কাছাকাছি থাকুম। খালি নাও দেইখা অরা (রা) হ্যাঙ্গাম (হাঙ্গামা) না কইরা চইলা যাইব। আমরা নায়ে থাকলে নিয্যস জিগাইব নাও কুনখানের, কই থিকা (কোত্থেকে) আসতে আছি, সোয়ারি আছিল কিনা, থাকলে হেরা (তারা) কারা, এই হগল। কী কইতে কী কমু, শ্যাষে আমরা বিপদে পইড়া যামু। চাইর জনের জানই চইলা যাইব।
ঝিনুককে নিয়ে বেতঝোপের পেছন দিকে গেল বিনু। রাজেক আর তমিজও ডান পাশে ঘন আগাছার জঙ্গলের ভেতর ঢুকল।
নদীর কিনার থেকে বেতঝোপ টোপগুলো প্রায় তিনশ’ হাত তফাতে। একে ঝোপ জঙ্গলের আড়াল, তার ওপর কুয়াশা আর অন্ধকারের দুর্ভেদ্য পর্দা চারদিক ঢেকে রেখেছে। বিনুরা যেখানে রয়েছে সেখান থেকে তাদের নৌকোটা দেখতে পাবার কথা নয়। কিন্তু এতক্ষণে তুমুল হইচই করতে করতে সেই মশালওলা নৌকো দুটো ওটার কাছে চলে এসেছে। মশালের আলোয় সব কিছু পুরোপুরি স্পষ্ট না হলেও দেখা যাচ্ছে। মাঝনদী থেকে আসা নৌকো দুটো ছ’মাল্লাই, ছই নেই। দুই নৌকোয় কম করে পনের ষোলটা লোক। তারা সবাই সশস্ত্র, প্রত্যেকের হাতে দা সড়কি বল্লম বা মজবুত বাঁশের লাঠি।
দুর্বোধ্য গলায় উত্তেজিতভাবে কিছু বলতে বলতে মাঝে মাঝে কুয়াশাচ্ছন্ন চরাচর চৌচির করে তারা চিৎকার করে উঠছিল, আল্লা হো আকবর
তিন চারজন তাদের নৌকো থেকে লাফ দিয়ে রাজেকদের নৌকোয় চলে এল। ছইয়ের ভেতর ঢুকে গেল দু’জন। বাকি যারা চেঁচাচ্ছিল তাদের সবার ওপর দিয়ে গলা চড়িয়ে একজন বলল, আমাগো দেইখা এই নাওয়ের হুমুন্দির পুতেরা কিনারে আইসা নাও বানছে (বেঁধেছে)।
যারা ছইয়ের তলায় ঢুকেছিল তারা খানিক পর হামাগুড়ি দিয়ে বেরিয়ে এসে আরও সোরগোল বাধিয়ে দিল, এই নাওয়ে হিন্দু আছিল। অগো মালপত্তরের ভিতরে কালীর ফুটো (ফোটো) রইছে।
