অবনীমোহন এবং সুধা সুনীতিকে যদিও চিঠি লিখে কলকাতায় যাবার কথা জানিয়ে দিয়েছে সে, কিন্তু সে সব চিঠি ওরা পেয়েছে কিনা, কে জানে। পাকিস্তান হবার পর দু’দেশের ভেতর ডাক চলাচল ঠিকমতো হচ্ছে না। সব কিছুই এখন অনিয়মিত, বিশৃঙ্খল। সীমান্তের এপার থেকে ওপারে চিঠি টিঠি পৌঁছতে কখনও পনের কুড়ি দিন লেগে যায়, কখনও আবার পৌঁছয়ই না। বিনু ভেবে রেখেছে, কলকাতায় গিয়ে বাবার কাছেই উঠবে। তার প্রথম কাজ হবে ঝিনুককে ডাক্তার দেখিয়ে সম্পূর্ণ সুস্থ করে তোলা। যে সর্বগ্রাসী ভয় এবং আতঙ্কে সে কুঁকড়ে আছে তার মন থেকে তা পুরোপুরি মুছে দেওয়া। তাকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার জন্য এটা একান্ত জরুরি।
বিনু জানে না, ঝিনুকের দুঃস্বপ্নের ঘোর কাটতে কত দিন, কত মাস বা কত বছর লেগে যাবে। সারা জীবনও যদি লাগে, মেয়েটাকে সারিয়ে তুলতেই হবে। ঝিনুকের যে শারীরিক ও মানসিক বিপর্যয় ঘটে গেছে তা থেকে বেরিয়ে আসা খুবই দুরূহ। বিনু জানে, এর জন্য অসীম ধের্য এবং যত্নের প্রয়োজন। সে জন্য নিজেকে সারাক্ষণ প্রস্তুত রাখতে হবে। কিন্তু সবার আগে যেটা দরকার তা হল কলকাতায় পৌঁছনো।
ঝাঁপসা নদীর দিকে তাকিয়ে এমন এক ভবিষ্যতের কথা বিনু ভাবছিল যা ঘোর অনিশ্চয়তায় ভরা। খুবই অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিল সে, হঠাৎ অন্য কোনও নৌকোর জোরে জোরে বৈঠা টানার শব্দে চকিত হয়ে উঠল। হাত পঞ্চাশেক দূর দিয়ে একটা চারমাল্লাই নৌকো জল কেটে কেটে ঝড়ের গতিতে এগিয়ে চলেছে। ওই নৌকোটায় তাদের নৌকোর মতোই আলো দেখা যাচ্ছে না। হেরিকেন বা লণ্ঠন টণ্ঠন থাকলে নিশ্চয়ই ছইয়ের তলায় আলোর তেজ কমিয়ে রাখা হয়েছে। নৌকোটার দু’ধারে দু’জন করে যে চারজন মাঝি বৈঠা টানছে তাদের নাকমুখ চোখ আলাদা করে দেখা যায় না। মনে হচ্ছে অস্পষ্ট চারটে ছায়ামূর্তি।
বিন ভেতরে ভেতরে সন্ত্রস্ত হয়ে ওঠে। রাত্তিরে নদী দিয়ে দেশ ছেড়ে চলে যাওয়াটা তুলনায় নিরাপদ, কিন্তু এমন খবরও পাওয়া গেছে, মাঝে মাঝে নদীতেও হামলা হয়। ঘাতকবাহিনী চারদিকে ছড়িয়ে আছে।
রুদ্ধ গলায় বিনু জিজ্ঞেস করে, ওরা কারা হতে পারে?
সামনের দিকের গলুইতে বসেছে রাজেক। সে বলে, ডরের কিছু নাই ছুটোবাবু। যারা খুনখারাপি করে হেরা (তারা) বাত্তি নিবাইয়া চুপচাপ যায় না। মশাল জ্বালাইয়া, নদী তুলফাড় কইরা, চিল্লাইয়া আসমান জমিন ফাড়তে ফাড়তে আমাগো নায়ে ঝাপাইয়া পড়ত। একটু থেমে বলল, আপনেগো লাখান উই নায়ের (নৌকোর) মানুষগুলায় আওয়াজ না কইরা, আন্ধারে দ্যাশ ছাইড়া যাইতে আছে গিয়া। চিন্তা কইরেন না।
বিনু নৌকো দেখে ভয় পেয়ে গিয়েছিল। রাজেকের কথায় তার দুশ্চিন্তা অনেকটাই কেটে যায়। সত্যিই তো, জল্লাদেরা এমন চুপিসারে নদী পাড়ি দিয়ে চলে যেত না। তাদের ওপর চড়াও হয়ে দা সড়কি চালিয়ে, নৌকোয় আগুন ধরিয়ে সব ছারখার করে ফেলত।
বিনু আস্তে আস্তে মাথা নাড়ে, হ্যাঁ, ঠিকই বলেছ। ওরাও বোধহয় আমাদের মতো তারপাশা স্টিমারঘাটে চলেছে।
রাজেক বলল, হেই মনে লয়।
জোরে শ্বাস টেনে বিনু বলে, কোন গ্রাম ছেড়ে ওরা চলে যাচ্ছে, কে জানে—
হগল গেরামেরই এক হাল ছুটোবাবু। চৈদ্দ পুরুষের ভিটামাটি ছাইড়া হিন্দুরা যাইতেই আছে, যাইতেই আছে।
চারমাল্লাই নৌকোটা ক্রমশ দূরে চলে যেতে লাগল। কুয়াশায় অন্ধকারে কিছুক্ষণের মধ্যে সেটাকে আর দেখা গেল না।
বিনু একইভাবে ছইয়ের ভোলা পাল্লার ভেতর দিয়ে নদীর দিকে তাকিয়ে বসে আছে। রাজেকরা বৈঠা বাইছে তো বাইছেই। একটানা, ক্লান্তিহীন। সময় যেন কাটতেই চায় না। সন্ধেবেলায় ঝিনুককে নিয়ে নৌকোয় উঠেছিল সে। মনে হয়, সময় যেন সেখানেই অনড় হয়ে আছে।
সেই যে চারমাল্লাই নৌকোটা দূরে কুয়াশাবিলীন দিগন্তে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল, তারপর সেইভাবেই আরো কয়েকটা নৌকো পাশ দিয়ে চলে গেছে।
একসময় হঠাৎ বিনুর খেয়াল হয়, সন্ধে থেকে রাজেক এবং তমিজ একনাগাড়ে বৈঠা টানছে। সেই কখন খেয়ে এসেছে। নিশ্চয়ই ওদের খিদে পেয়েছে।
বিনু বলল, অনেকক্ষণ নৌকো বাইছ। রাতও হয়েছে। এবার তোমরা খেয়ে নাও।
রাজেক বলল, সন্ধ্যার আগে ঠাউরমা ঠাইসা খাওয়াইয়া দিছে। ত্যামন খিদা পায় নাই। যাউক আর কিছু সোময়, হের (তার) পার খামু-সে যে ঠাউরমার কথা বলল তিনি স্নেহলতা।
খিদে পেলে আমাকে বলো—
নিয্যস (নিশ্চয়ই) কমু।
একটু চুপচাপ।
তারপর বিনু জিজ্ঞেস করল, আমরা এখন যেখান দিয়ে যাচ্ছি সে জায়গাটার নাম কী?
রাজেক বলল, আন্ধারে আর খুয়ায় (কুয়াশায়) ঠাওর পাই না। নদীর অস্পষ্ট পাড়ের দিকে তাকিয়ে বলতে থাকে, মনে লয় (হয়), চরকান্দার কাছাকাছি আইসা পড়ছি।
একটু যেন হতাশই হয় বিনু। বলে, বাড়ি থেকে বেশিদূর তা হলে আসতে পারিনি।
পথ কি ইট্টখানি ছুটোবাবু? হেইর উপুর নদীতে নাও বাইয়া যাওন–
সকালে তারপাশায় পৌঁছতে পারব তো? দেরি হলে গোয়ালন্দের স্টিমার ছেড়ে যাবে। তখন–ঝিনুককে দেখিয়ে বিনু বলতে লাগল, একে নিয়ে ভীষণ মুশকিলে পড়ে যাব। কোথায় থাকব, কী করব–
তাকে থামিয়ে দিয়ে রাজেক ভরসা দেবার সুরে বলে, ভাইবেন না ছুটোবাবু। ভুরের (ভোরের) আলো ফুটনের আগেই তারপাশার ইস্টিমার ধরাইয়া দিমু।
