অসীম মমতায় ঝিনুকের রুক্ষ চুলে হাত বুলোত বুলোতে বিনু জিজ্ঞেস করে, খুব কষ্ট হচ্ছে?
আস্তে মাথা নাড়ে ঝিনুক–না।
এই এক অদ্ভুত মেয়ে। যত যন্ত্রণাই হোক, শতকষ্টে বুক ফেটে চৌচির হয়ে যাক, মুখ ফুটে কখনও তা বলবে না।
সেই দুপুর বেলায় জোর করে মেয়েটাকে দু’চার গ্রাস ভাত খাইয়ে দিয়েছিলেন স্নেহলতা। তারপর থেকে এখন পর্যন্ত ওর পেটে এক ফোঁটা জলও পড়েনি। সেই যে ঢাকা থেকে সব কিছু খুইয়ে ভেঙেচুরে একটা ধ্বংসস্তূপের মতো ঝিনুক ফিরে এসেছিল, তখন থেকে বাঁচার কোনও ইচ্ছাই তার মধ্যে অবশিষ্ট নেই। খিদেতেষ্টার অনুভূতিটাই নষ্ট হয়ে গেছে। কেউ খাইয়ে দিলে একটু খেত। কারোর সঙ্গে কথা বলত না, কোথাও বেরুত না, সারাক্ষণ ঘরের কোণে মুখ বুজে অসাড় মূর্তির মতো পড়ে থাকত। জীবনের সব লক্ষণ তার মধ্যে থেকে যেন মুছে গেছে।
বিনু ফের বলে, খিদে পেয়েছে?
আগের মতোই মাথা নেড়ে ঝিনুক জানায়–না।
বিনু বলে, পেয়েছে। তুমি বুঝতে পারছ না।
ঝিনুক উত্তর দেয় না।
বিনু এবার বলে, সেই কখন দুটি ভাত খেয়েছিলে। তারপর অনেকটা সময় পার হয়ে গেছে। একটু কিছু খাও। এতক্ষণ খালি পেটে থাকতে নেই।
ঝিনুকের এক জবাব–না।
বিনু জানে, হাজার বার বললেও ঝিনুক খেতে চাইবে না। স্নেহলতা রাস্তায় খাওয়ার জন্য বেতের বড় ঝুড়ি বোঝাই করে যে খাবার দাবার দিয়েছিলেন তার থেকে খানিকটা চিড়ে, একটু পাতক্ষীর আর একটা কলা বার করে বাঁশের সাজিতে নিয়ে ঝিনুককে বলল, হাঁ কর–
একটু কী ভাবল ঝিনুক। এবার কিন্তু সে আপত্তি করল না। মুখটা সামান্য ফাঁক করল।
বিনু অল্প অল্প করে চিড়ে, কলা, ক্ষীর ঝিনুকের মুখে দিতে দিতে বলতে লাগল, অনেক দূর যেতে হবে। তারপাশা থেকে স্টিমারে গোয়ালন্দ, সেখান থেকে ট্রেন ধরে কলকাতা। শরীর এমনিতেই তোমার দুর্বল। পেট ভরে না খেলে উঠে দাঁড়াবে কী করে? এতটা রাস্তার ধকল কিছুতেই সইতে পারবে না।
বিনুর কথা কানে গেল কিনা, কে জানে। সামান্য দু’চার মুঠো চিড়ে টিড়ে খাওয়ার পর ঝিনুক বলল, আমি আর খেতে পারব না।
বিনু বুঝতে পারে, জোরাজুরি করে কাজ হবে না। ভাবল, পরে আবার খাওয়াতে চেষ্টা করবে। বলল, চিড়ে খেয়ে নিশ্চয়ই গলা শুকিয়ে গেছে। জল খেয়ে নাও–
স্নেহলতার সব দিকে নজর। পোড়ামাটির কলসিতে খাওয়ার জলও সঙ্গে দিয়েছিলেন। কাঁচের গেলাসে জল ভরে ঝিনুককে খাইয়ে দিল বিনু।
জল খাওয়ার পর চোখ আবার আপনা থেকে বুজে গেল ঝিনুকের। নদীর জল ছুঁয়ে ছুঁয়ে ঠান্ডা হাওয়া বয়ে যাচ্ছে। মুখখানা বাইরে রেখে চাদর দিয়ে ঝিনুকের সারা গা ঢেকে দিল বিনু। তারপাশা পৌঁছতে এখনও অনেক দেরি। যতক্ষণ পারে ঘুমিয়ে নিক ঝিনুক।
অনেকটা সময় ঝিনুকের মাথায় হাত বুলোবার পর ফের সামনের খোলা ঝাঁপটার ফাঁক দিয়ে নদীর দিকে তাকায় বিনু। ধু ধু দুর্নিরীক্ষ অন্ধকার এবং কুয়াশায় জেলেডিঙির নিষ্প্রভ আলোগুলো ছাড়া আর কিছুই নজরে পড়ছে না। কিন্তু হেমন্তের এই শান্ত নদী, ঝাঁপসা আকাশ, দু’পাড়ের গাঢ় কালির পোঁচের মতো গাছগাছালি, কৃষ্ণপক্ষের আকাশে অদৃশ্য তারাদের মেলা বা ম্রিয়মাণ চাঁদ– এ সব নিয়ে কিছুই ভাবছিল না বিনু। মনে পড়ছে, কয়েকদিন আগে অবনীমোহন সুধা আর সুনীতিকে চিঠি লিখেছিল সে, কিন্তু তার উত্তর আসেনি।
অবনীমোহন যুদ্ধের সময় ঠিকাদারির কাজে আসাম চলে গিয়েছিলেন। মিলিটারি কনট্রাক্ট নিয়ে শ’য়ে শ’য়ে মজুর যোগাড় করে তিনি তখন মিত্রশক্তির সেনাবাহিনীর যাতায়াতের জন্য সড়ক আর থাকার জন্য ব্যারাক তৈরি করতেন। যুদ্ধ থেমে যাবার পর সে সব কাজ বন্ধ হয়ে যায়। অবশ্য যুদ্ধ যখন পুরোদমে চলছে তখন মাঝে মাঝে জরুরি কাজের ফাঁকে রাজদিয়ায় আসতেন অবনীমোহন। কয়েকদিন কাটিয়ে ফের আসাম। এরই মধ্যে সুধা সুনীতির বিয়ে হয়েছে, সুরমা মারা গেছেন।
যুদ্ধ থামলে অবনীমোহন রাজদিয়া হয়ে কলকাতায় চলে গেছেন। ইচ্ছা ছিল, বিনুকেও সঙ্গে নিয়ে যাবেন কিন্তু পড়াশোনার জন্য বিনুর যাওয়া হয়নি। তা ছাড়া, না যাওয়ার বড় একটা কারণ ঝিনুক। এই মেয়েটার প্রতি বড় মায়ায় তার জীবন তিল তিল করে কখন কিভাবে যে ওর সঙ্গে জড়িয়ে গেছে, নিজেই তা জানে না। সে রাজদিয়াতেই হেমনাথ এবং স্নেহলতার কাছে থেকে গিয়েছিল। ভবিষ্যতের কথা যে স্পষ্ট করে ভাবেনি তা নয়। বিনু জানত, ঝিনুক একদিন তার সারা জীবনের অবিচ্ছেদ্য সঙ্গী হয়ে উঠবে। ঝিনুকের বাবা, হেমনাথ আর স্নেহলতা সেই স্বপ্নই দেখতেন। অবনীমোহন বা সুধা সুনীতির দিক থেকেও কোনও রকম আপত্তি হত না। বরং সবাই খুশিই হত। মুখ ফুটে কেউ কিছু বলেনি কিন্তু তাদের বিয়েটা অনিবার্য জাগতিক কোনও নিয়মের মতোই যেন স্থির হয়ে ছিল। যদিও ঝিনুকরা ব্রাহ্মণ, বিনুরা কায়স্থ, হেমনাথ এসব সামাজিক বাধা মানতেন না। হেমনাথের হয়তো ইচ্ছা ছিল, বিয়েটা রাজদিয়াতেই রীতিমতো ধুমধাম করে থোক। অনেকদিন তার বাড়িতে বড় রকমের কোনও অনুষ্ঠান হয়নি। যুগলের বিয়ে অবশ্য হয়েছে। তাকে হেমনাথেরা নিজেদের পরিবারের একজন ভাবতেন, তবু তার সঙ্গে রক্তের সম্পর্ক তো নেই, সে নেহাতই ছিল কামলা। অবশ্য সুধা সুনীতির বিয়েও এ বাড়িতেই হয়েছে। কিন্তু তারপরও ক’বছর কেটে গেল। বিনুর বিয়ে হলে অবনীমোহন আসনে, সুধা সুনীতিরা আসত, রাজদিয়াবাসীদের সবাইকে নেমন্তন্ন করা হত। বিয়েটাকে ঘিরে নগণ্য শহরটা জুড়ে বিরাট উৎসব লাগিয়ে দিতেন হেমনাথরা। তবে চিরকাল রাজদিয়ায় পড়ে থাকত না বিনু। ঝিনুককে নিয়ে একদিন না একদিন তাকে কলকাতায় চলে যেতে হত। আজ সেই যাওয়াই হচ্ছে, কিন্তু কোন ঝিনুককে সঙ্গে করে? কুয়াশাচ্ছন্ন আদিগন্ত নদীতে নৌকোর পাটাতনে ভাঙাচোরা নির্জীব মাংসপিণ্ডের মতো যে নারীটি চোখ বুজে পড়ে আছে, যার বুকের ভেতর কোনও রকমে হৃৎপিণ্ডটা ধুকপুক করছে ঝিনুকের এমন ভয়ঙ্কর পরিণতি ঘটবে, কোনও দিন কি তা ভাবতে পেরেছিল বিনু? এই ঝিনুককে সুধা সুনীতি বা অবনীমোহনরা কিভাবে গ্রহণ করবেন, জানা নেই।
