রাজেক এবং তমিজ অত্যন্ত বিশ্বাসী, জান কবুল করে ওরা বিনুদের রক্ষা করতে চেষ্টা করবে। কিন্তু দলবদ্ধ হয়ে ঘাতকেরা হানা দিলে রাজেকদের পক্ষে কতটা বাধা দেওয়াই বা সম্ভব? বিনুদের বাঁচাতে গিয়ে ওদের প্রাণটাই হয়তো চলে যাবে।
প্রবল উৎকণ্ঠা নিয়ে বিনু অন্তহীন অনিশ্চয়তার মধ্যে ঝাঁপ দিয়েছে। শেষ পর্যন্ত যদি নির্বিঘ্নে তারপাশায় পৌঁছনোও যায়, সেখানে গিয়ে কী দেখা যাবে? বিনু শুনেছে, তারপাশা ভাগ্যকুল মুন্সিগঞ্জ নারায়ণগঞ্জ কি রাজাবাড়ির স্টিমারঘাটে দিনের পর দিন হাজার হাজার মানুষ প্রচণ্ড আশঙ্কা নিয়ে রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করছে।
সারাদিনে একটাই মাত্র স্টিমার। কোনও কোনও দিন দুটোও দেয়। এদিকে ভয়ার্ত মানুষের সীমাসংখ্যা নেই। নারায়ণগঞ্জ থেকে ছেড়ে স্টিমার নানা ঘাট ছুঁয়ে ছুঁয়ে গোয়ালন্দে যায়। সেখানে থেকে ট্রেন ধরে বর্ডার পার হয়ে কলকাতা।
ছইয়ের পেছন দিকটা কাঁচা বাঁশের ঝাঁপ ফেলে বন্ধ করে দিয়েছে তমিজরা। সামনের দিকের দু’ পাল্লার আঁপের একটা পুরোপুরি আটকানো। অন্যটা একটুখানি ভোলা। তার ফাঁক দিয়ে যতদূর চোখ যায়, নদী এবং আকাশ নিবিড় কুয়াশায় আচ্ছন্ন হয়ে আছে। ঠাণ্ডা, জলো হাওয়া বয়ে যাচ্ছে চরাচরের ওপর দিয়ে।
কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর পর এখন কৃষ্ণপক্ষ চলছে। কুয়াশা এবং হিমের সঙ্গে মিশে আছে অন্ধকার।
হেমন্তের শুরুতে নদী এখন অনেক শান্ত। বর্ষার সেই উথলপাথল খ্যাপামি আর নেই। স্রোত আছে ঠিকই, ঢেউও রয়েছে, কিন্তু দু মাস আগে এই নদীই যে ফুলে ফেঁপে সর্বনাশা পাহাড়প্রমাণ চেহারা নিয়ে প্রবল আক্রোশে ছুটে যেত, তা যেন ভাবা যায় না। তখন তার শুধু খাই খাই, সামনের সমস্ত কিছু গ্রাস করার জন্য আকাশপাতাল হাঁ মেলে থাকত। দু’পাড় ভেঙে, পরম মমতায় গড়ে তোলা মানুষের বসতি, তাদের জমিজমা তছনছ করে গাঁয়ের পর গাঁ গ্রাস করার পর তবে তার শান্তি।
কৃষ্ণপক্ষের এক ফালি ক্ষীণ চাঁদ হয়তো আছে, হয়তো রয়েছে অগুনতি নক্ষত্রও, কিন্তু কুয়াশার পর্দার আড়ালে সে সব ঢাকা পড়ে গেছে। দূরে দূরে রহস্যময় সংকেতের মতো কিছু আলোর ছোটাছুটি চোখে পড়ে। ওগুলো জেলে নৌকোর আলো। সারা বছরই, কী শীত কী গ্রীষ্ম, রাতভর জেলে ডিঙিগুলো নদীর বুকে ঘুরে বেড়ায়। জলের অতল স্তর থেকে মাছ তুলে আনতে না পারলে দু’বেলা পেটের ভাত জুটবে কোত্থেকে? গত দু’বছর ধরে মাঝে মাঝেই দাঙ্গা বাধছে, দেশভাগ হয়ে গেছে, চোদ্দ পুরুষের ঘর-ভদ্রাসন ছেড়ে হাজার হাজার মানুষ চলে যাচ্ছে সীমান্তের ওপারে। কিন্তু যা-ই ঘটুক, গরিবের চেয়েও গরিব মাছ-ধরাদের ডিঙি আর জাল নিয়ে সন্ধের পর নদীতে না বেরিয়ে উপায় নেই। মাছই তাদের সব, মাছের সঙ্গে তাদের বাঁচা-মরা জড়ানো।
নদীর গায়ে ছলাত ছলাত ঢেউয়ের শব্দ হচ্ছে, সেই সঙ্গে তমিজ এবং রাজেকের বৈঠা দিয়ে জল কাটার আওয়াজ। হেমন্তের ঝিরঝির হাওয়া নিঃশব্দে বয়ে যাচ্ছে। ফলে চারদিক একেবারে নিঝুম।
ভেতরে একধারে একটা হেরিকেন ছইয়ের গায়ে দড়ি দিয়ে বাঁধা। পাছে নৌকোর দুলুনিতে সেটা পড়ে যায়, সেই কারণে। হেরিকেনটার আলোর তেজ নেই। বাইরে থেকে যাতে নজরে না পড়ে সেজন্য নিবু নিবু করে রাখা হয়েছে। অর্থাৎ কাউকে কিছু বুঝতে না দিয়ে চুপিসারে রাজেকরা তাদের তারপাশা স্টিমারঘাটে পৌঁছে দিতে চায়। খোলা নদীর জলধারার তুলনায় স্টিমারঘাট অনেকটা নিরাপদ। সেখানে নাকি পুলিশ পাহারার কিছু ব্যবস্থা আছে।
ছইয়ের তলায় চাদর বিছিয়ে বিছানা পেতে দেওয়া হয়েছে। সেটার ওপর শুয়ে আছে ঝিনুক। মাথায় তেলহীন রুক্ষ চুল, চোখ দুটো বোজা, তার তলায় গাঢ় কালি, হনু চামড়া কুঁড়ে বেরিয়ে এসেছে। সমস্ত মুখে কালচে ছোপ। রোগা হাত দুটোর নীল শিরা বেরিয়ে পড়েছে। কে বলবে, কয়েক মাস আগে এই মেয়েটার সারা শরীরে কী লাবণ্যই না মাখানো ছিল! চমৎকার স্বাস্থ্য ছিল ঝিনুকের। স্বভাবটা সামান্য চাপা ধরনের হলেও ভেতরে ভেতরে সে ছিল খুবই টগবগে। বাইরে তেমন একটা উচ্ছ্বাস নেই, ওর মায়ের কারণে মাঝে মাঝেই বিষণ্ণ এবং অন্যমনস্ক হয়ে থাকত। সেই কত কাল ধরে মেয়েটাকে দেখে আসছে বিনু। ওর তাকানো, কথা বলার মৃদু ভঙ্গি, পাতলা ফুরফুরে ঠোঁটের ফাঁকে হাসির চিকন রেখা, হাঁটার সময় নিঃশব্দে আলতো করে পা ফেলা–এ সবের মধ্যে তার মনের কোন প্রতিক্রিয়া ফুটে বেরোয়, মুহূর্তে বুঝে নেয় বিনু। বাইরে যেমনই হোক, বিনু এতদিন জেনে এসেছে ঝিনুকের মধ্যে গোপন এক জলপ্রপাত রয়েছে। সেটা বাইরে থেকে অন্য কেউ টের পায় না ঠিকই, কিন্তু বিনু, একমাত্র বিনুই তার খবর রাখে।
সেই ঝিনুককে এখন চেনাই যায় না। ভগ্নস্তূপের মতো সে বিছানায় পড়ে আছে। শ্বাসপ্রশ্বাসের তালে তালে খুব ধীরে তার বুক ওঠানামা করছে, আর ক্ষীণ গোঙানির মতো একটা আওয়াজ বেরিয়ে আসছে তার গলা থেকে। বুকের ওই উত্থানপতন আর গোঙনিটা না থাকলে মনে হত, সে বুঝি বেঁচে নেই।
বিনু ঝিনুকের মুখের ওপর ঝুঁকে খুব আস্তে ডাকল, ঝিনুক–ঝিনুক–
সাড়া নেই।
অনেকক্ষণ ডাকাডাকির পর ঝিনুক ভীষণ ক্লান্তভাবে চোখের পাতা একটুখানি মেলল। চোখের মণিদুটো ঘোলাটে, লালচে এবং নির্জীব। মনে হয়, কিছুই সে দেখতে পাচ্ছে না। দেখলেও বুঝতে পারছে না।
