শেষ পর্যন্ত স্থির হল, বিনু একলাই ঝিনুককে নিয়ে কলকাতায় চলে যাবে।
হঠাৎ একটা কথা মনে পড়তে স্নেহলতা বলে উঠলেন, কিন্তু—
কী?
স্টিমার তো বন্ধ, যাবে কী করে?
হেমনাথ বললেন, তারপাশা থেকে দিনে একটা কি দুটো করে স্টিমার যাচ্ছে গোয়ালন্দে। এখান থেকে নৌকোয় ওরা তারপাশা যাবে। আমি রাজেক আর তমিজ মাঝিকে ঠিক করে রেখেছি। সে ই বিনুদের তারপশায় নিয়ে স্টিমারে তুলে দিয়ে আসবে।
কিন্তু—
আবার কী?
ঢাকায় গিয়ে ঝিনুকের যা হাল হয়েছে, তারপাশা যাবার পথে আবার কিছু হবে না তো?
ওদিকে কোনও গোলমাল হয় নি। তা ছাড়া রাজেকরা খুব বিশ্বাসী। তারপর অদৃষ্ট।
.
দিন দুই পর সন্ধেবেলা পুকুরঘাট থেকেই রাজেক মাঝির নৌকোয় উঠল বিনুরা। বিনুরা বলতে বিনু আর ঝিনুক। সারারাত বাইলে ভোরবেলা তারা তারপাশা পৌঁছে যাবে। ঝিনুক বিনুর কোলের কাছে চিত্রার্পিতের মতো বসে আছে।
সবে কার্তিকের শুরু। এখনও মাঠে প্রচুর জল। ধানখেত আর শাপলাবন ঠেলে অনায়াসেই নৌকো নিয়ে বড় নদীতে চলে যাওয়া যাবে।
স্নেহলতা শিবানী আর হেমনাথ পুকুর পাড়ে দাঁড়িয়ে আছেন। শিবানী স্নেহলতা খুব কাঁদছিলেন। হেমনাথ রাজেক মাঝিকে সাবধান করে দিচ্ছেন। পাখি পড়ানোর মতো বার বার বলছেন, কিভাবে কেমন করে তারপাশায় নিয়ে যাবে।
রাজেক সমানে মাথা নাড়ছে আর বলছে, আপনে নিচ্চিন্ত থাকেন বড়কত্তা, জান থাকতে ছুটোবাবুগো গায়ে কেও হাত দিতে পারব না। আল্লার কিরা–
বিনু একদৃষ্টে হেমনাথের দিকে তাকিয়ে ছিল। স্নেহলতা শিবানী–কাউকেই দেখতে পাচ্ছিল না সে। তার চোখের সামনের সব কিছু ঘিরে, সমস্ত চরাচর জুড়ে প্রসন্ন পুরুষটি যেন দাঁড়িয়ে আছেন।
হেমনাথকে দেখতে দেখতে অন্যমনস্ক হয়ে গেল বিনু। হঠাৎ ক’বছর আগের সেই দিনটির কথা মনে পড়ে গেল তার। জল-বাংলার এই অখ্যাত নগণ্য জনপদে পা দেবার সঙ্গে সঙ্গে সারা রাজদিয়ায় যেন উৎসব শুরু হয়ে গিয়েছিল। আর আজ? রাতের অন্ধকারে, নিঃশব্দে, সবার চোখের আড়ালে চলে যেতে হচ্ছে। নিরানন্দ, নিরুৎসব এই বিদায় বিনুর বুক অসীম বিষাদে ভরে দিতে লাগল।
এই মুহূর্তে কত কথাই মনে পড়ছে তার। লারমোর, মজিদ মিঞা, রামকেশব, মনা ঘোষ, গয়জদ্দি ব্যাপারি, রজবালি শিকদার, পতিতপাবন, মোতাহার হোসেন সাহেব, ফসলকাটা মাঠে যে লোকটা ইঁদুরের গর্ত থেকে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে ধান বার করত সেই তালেব, চরের সেই ভূমিহীন কৃষাণের দল, এমনকি ধানের খেতে গা দুলিয়ে দুলিয়ে যে বুড়ো সোনালি গোসাপটা আলের ওপর দিয়ে বুকে হেঁটে যেত–সবাই চোখের সামনে ভিড় করে এল। আর মনে পড়ছে শরতের উজ্জ্বল নীলাকাশকে, সাদা সাদা ভবঘুরে মেঘদলকে, কার্তিকের ধূসর হিমকে। জলসেচি শাকের নিবিড় লাবণ্য, বেতঝোঁপ, মুত্রাবন, বড় বড় পদ্মপাতা, জলসিঙাড়া, কাউ আর হিজলবন, কইওকড়া আর হেলেঞ্চা লতার দাম, শঙ্খচিলের ঝক, গোবক, কানিবক, পানিকাউ, শালিক, বুলবুলি, বাঁচা-ট্যাঙরাবাজালি-বজুরি মাছেরা–কত কথা যে মনে পড়তে লাগল! এরাই তো তার হাত ধরে কৈশোর থেকে যৌবনে পৌঁছে দিয়েছে। হায়, কৈশোরের এই রম্যভূমি, যৌবনের এই স্বর্গে আর কোনও দিন ফেরা হবে কিনা, কে জানে।
জল-বাংলার মনোহর দৃশ্য, পশুপাখি, বৃক্ষলতা খুব বেশিক্ষণ বিনুকে বিভোর করে রাখতে পারল। এবার তার চোখ এসে পড়ল খুব সামনে, একেবারে কোলের কাছে, ঝিনুকের ওপর। মেয়েটাকে দেখতে দেখতে অপার স্নেহে, অসীম করুণায় তার বুক ভরে যেতে লাগল। এই সময় হঠাৎ মনে পড়ল, তার বাবা অবনীমোহন পশ্চিম বাংলার মানুষ, মা পূর্ব বাংলার মেয়ে। তার বুকের একধারে পুর্ব বাংলা, আরেক ধারে পশ্চিম বাংলা। তার রক্তের এক স্রোত পদ্ম, আরেক স্রোত গঙ্গা। আর কোলের কাছে। এই মেয়েটা–এই ঝিনুক? সে তো পুর্ব বাংলার লাঞ্ছিত, অপমানিত আত্মা। তাকে নিয়েই সে কলকাতায় চলেছে।
হঠাৎ প্রাণের ভেতর কী হয়ে গেল, কে বলবে। বড় মায়ায় ঝিনুককে সে বুকের কাছে নিবিড় করে টেনে আনল।
পুকুর পাড় থেকে একসময় হেমনাথের গলা ভেসে এল, আর দেরি করিস না রাজেক, নৌকো ছেড়ে দে–
মাঝি বলল, এই ছাড়ি—
একটু পর জলে বৈঠা পড়ল, একটানা বাজনার মতো ছপছপ শব্দ কানে আসতে লাগল।
নৌকো অকূলে ভাসল।
॥ দ্বিতীয় পর্ব সমাপ্ত ॥
৩.০১-০৫ আশ্বিনের মাঝামাঝি
কেয়াপাতার নৌকো – তৃতীয় পর্ব
৩.০১
আশ্বিনের মাঝামাঝি এ বছর পুজো শেষ হয়েছে। তখন থেকেই হিম পড়তে শুরু করেছিল। এই জলের দেশে হিমটা বেশ তাড়াতাড়ি নামে। এখন এই কার্তিকে কুয়াশাও হচ্ছে খুব। বিকেল হতে না হতেই মিহি সরের মতো কুয়াশায় আকাশ ঝাঁপসা হয়ে যায়। সূর্য পশ্চিম দিগন্তের দিকে যত হেলতে থাকে, কুয়াশার স্তরটা ক্রমশ পুরু হতে হতে সমস্ত চরাচর ঢেকে ফেলে।
সন্ধেবেলায় হেমনাথের বাড়ির পুকুরঘাট থেকে নৌকো ছেড়েছিল। সামনের দিকের গলুইতে বৈঠা হাতে বসেছে রাজেক। পেছনের গলুইতে তার চাচাতো ভাই তমিজ। তমিজের হাতেও বৈঠা।
নৌকোর মাঝখানে ছইয়ের ভেতর বিনু আর ঝিনুক। পাটাতনের একধারে রয়েছে শতরঞ্চি-জড়ানো মস্ত বিছানা এবং চামড়ার সুটকেস, যেটার মধ্যে দু’জনের জামাকাপড়, বিনুর বি.এ’র ডিগ্রি, ঝিনুকের ম্যাট্রিকুলেশনের সার্টিফিকেট আর টুকিটাকি নানা দরকারী জিনিস। আছে দক্ষিণা কালীর একটি ছোট ছবি। স্নেহলতা ওটা সঙ্গে দিয়েছেন। তার বিশ্বাস, বিপদে আপদে মা কালী বিনুদের রক্ষা করবেন। সুটকেসের পাশে বেতের বড় ঝুড়ির ভেতর রাস্তায় খাওয়ার জন্য চিড়ে, মুছি গুড়, কদমা, একফানা। পাকা মোহনবাঁশি কলা আর পাতক্ষীর। এত লটবহর সঙ্গে নিতে চায়নি বিনু। প্রথমত, ঝিনুকের ওপর দিয়ে যে মারাত্মক বিপর্যয় ঘটে গেছে তাতে তাকে সামলাবে, না মালপত্রের ওপর নজর রাখবে? তা ছাড়া রাস্তায় কী ঘটবে, না ঘটবে সে সম্বন্ধে বিন্দুমাত্র ধারণা নেই। তবে এটা জানা আছে, এখন জলেস্থলে সর্বত্র মারাত্মক বিপদ ওত পেতে রয়েছে। হেমনাথ ভরসা দিয়েছেন, তারপাশার দিকে যেতে যে এলাকাগুলো পড়ে, সে সব জায়গায় বড় রকমের ঘটনা ঘটেনি। কিন্তু যেভাবে চারপাশে উন্মত্ততা ছড়িয়ে পড়েছে তাতে ঘটতে কতক্ষণ? নৌকো যত এগুচ্ছে, একটা তীব্র, চাপা আতঙ্ক সব দিক থেকে বিনুকে ঘিরে ধরছে।
