ভবতোষ মাথা নাড়লেন।
হেমনাথ আবার বললেন, কবে ফিরবি?
তিন চারদিনের মধ্যে।
ঝিনুককে সঙ্গে নিয়ে ভবতোষ চলে গেলেন।
.
২.৫৬
তিন চারদিনের জায়গায় ষোল সতের দিন কেটে গেল। তবু ঝিনুকরা ফিরছে না। তাদের কোনও বিপদ ঘটল কিনা, বোঝা যাচ্ছে না। স্নেহলতা শিবানী এবং হেমনাথ অস্থির হয়ে উঠলেন। আর বিনু?
কৈশোর আর যৌবনের প্রায় দশটা বছর ঝিনুকের সঙ্গে একই বাড়িতে কাটিয়ে দিয়েছে সে। মাঝে মাঝে ভবতোষ ঝিনুককে নিয়ে গেছেন ঠিকই। কিন্তু দু’একদিন পরেই সে ফিরে এসেছে। একসঙ্গে ষোল সতের দিন তাকে ছেড়ে কখনও থাকে নি বিনু।
ঝিনুক যেন শ্বাসবায়ুর মতো সহজ। কাছে থাকলে টের পাওয়া যায় না। এই দশ বছরে ধীরে ধীরে জীবনের কতখানি জায়গা জুড়ে সে ব্যাপ্ত হয়ে আছে, এই প্রথম বুঝতে পারল বিনু। ঝিনুকের জন্য প্রতি মুহূর্তে তার শ্বাস যেন রুদ্ধ হয়ে আসতে লাগল।
শেষ পর্যন্ত ঠিক হল, হেমনাথ ভবতোষদের খোঁজে ঢাকায় যাবেন। বিনুও সঙ্গে যেতে চেয়েছিল, হেমনাথ নেন নি। বললেন, দু’জনে গেলে কী করে চলবে? বাড়িতে একজন পুরুষমানুষ থাকা দরকার।
দিনতিনেক পর ঝিনুককে নিয়ে ঢাকা থেকে ফিরলেন হেমনাথ। কিন্তু এ কোন ঝিনুক? চুল আলুথালু। চোখের দৃষ্টি স্থির, উদ্ভ্রান্ত। গালে-ঠোঁটে-হাতে, সমস্ত শরীরে কত জায়গায় যে মাংস উঠে উঠে রক্তারক্তি হয়ে আছে! পরনের জামাটা, শাড়িটা নানা জায়গায় ছেঁড়া। কোনও রাক্ষস যেন তার শরীরের সার শুষে নিয়েছে।
ঝিনুককে দেখেই শিবানী স্নেহলতা কেঁদে ফেললেন, কী হয়েছে ঝিনুকের? কী হয়েছে? ভব কোথায়?
হেমনাথকেও চেনা যাচ্ছিল না। শক্তিমান, ঋজু মানুষটা একেবারে ভেঙেচুরে গেছেন যেন। তাঁকে একটা ধ্বংসস্তূপ বলে মনে হচ্ছে।
আড়ষ্ট, ভাঙা গলায় হেমনাথ বললেন, ভব নেই।
স্নেহলতা চিৎকার করে উঠলেন, কী হয়েছে ভব’র? বল–বল–
হেমনাথ যা বললেন, সংক্ষেপে এই রকম। এখান থেকে ঢাকা পৌঁছবার পর ভবতোষ দাঙ্গার ভেতর পড়েছিলেন। ঘাতকের দল ভবতোষকে মেরে ফেলেছে। তারপর ঝিনুককে নিয়ে চলে গিয়েছিল। হেমনাথ ঢাকায় গিয়ে পুলিশ দিয়ে ঝিনুককে উদ্ধার করেছেন। কিন্তু ভাবতোষের মৃতদেহের সন্ধান পাওয়া যায় নি।
শ্বাপদেরা ষোল সতের দিন একটা বাড়িতে ঝিনুককে আটকে রেখেছিল। যে অবস্থায় তাকে উদ্ধার করা হয়েছে, তার চাইতে সে যদি মরে যেত!
স্নেহলতা কাঁদতে কাঁদতে বললেন, কেন মরবে, কেন? কী দোষ ওর?
হেমনাথ ঝাঁপসা গলায় বলতে লাগলেন, কেন যে ওদের আমি ঢাকায় যেতে দিলাম। আমি যদি তখন শক্ত হতাম, কিছুতেই ওরা যেতে পারত না। ভবতোষ মরল। আর এই সোনার প্রতিমা নিজের হাতে বিসর্জন দিলাম।
একধারে দাঁড়িয়ে পলকহীন ঝিনুকের দিকে তাকিয়ে ছিল বিনু। একটা কথাও বলতে পারছিল না। বার বার তার মনে হচ্ছিল, তীক্ষ্ণমুখ অগণিত তীর তার হৃৎপিন্ড বিদ্ধ করে যাচ্ছে।
ঢাকা থেকে আসবার পর দুটো দিন কিছু খেল না ঝিনুক, ঘুমলো না, এমনকি একটা কথাও পর্যন্ত বলল না। দিনরাত শূন্য চোখে দূর ধানখেতের দিকে তাকিয়ে স্থির হয়ে বসে থাকল।
পুরো দুদিন পর ঝিনুক ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল, আমাকে তোমরা মেরে ফেল, আমাকে মেরে ফেল।
স্নেহলতা সান্ত্বনা দেবেন কি, নিজেই কাঁদতে লাগলেন। ঝিনুকের পিঠে হাত বোলাতে বোলাতে বললেন, কাঁদে না দিদি, কাঁদে না–
আমার যে আর কিছুই নেই দিদা! আমার বেঁচে থেকে আর কী লাভ?
ও সব ভুলে যা দিদিভাই—
ভুলতে যে পারছি না।
উত্তর না দিয়ে স্নেহলতা তার পিঠে হাত বুলিয়ে যেতে লাগলেন।
ঝিনুক বলতে লাগল, আমি এখানে থাকব না দিদা, আমাকে আর কোথাও পাঠিয়ে দাও।
কোথায় যাবি দিদি?
যেখানে খুশি পাঠাও। আমার এখানে বড্ড ভয় করছে।
কিসের ভয়, আমরা তো আছি।
না না, তোমরা কিছু করতে পারবে না। ওরা আমাকে আবার ধরে নিয়ে যাবে।
যত দিন যাচ্ছে, ঝিনুকের ভয় ততই বাড়তে লাগল। রাত্রিবেলা চারধারের গ্রামগুলো থেকে যখন বর্বর চিৎকার ভেসে আসে কিংবা মশালগুলো দপ দপ করে জ্বলতে থাকে, সেই সময় ঝিনুক অস্থির হয়ে ওঠে। স্নেহলতা শিবানী হেমনাথ বা বিনু–যে-ই কাছে থাকে তাকে জড়িয়ে ধরে কাঁপতে কাঁপতে বলে, আমি আর বাঁচব না, এখানে থাকলে নিশ্চয়ই মরে যাব।
দেখেশুনে একদিন হেমনাথ বললেন, ওর মনের ভেতর ভয় বাসা বেঁধে ফেলেছে। এখানে রাখা আর ঠিক হবে না।
স্নেহলতা বললেন, এখানে তো রাখবে না বলছ। কোথায় রাখবে তা হলে?
ভাবছি কলকাতায় অবনীমোহন কি সুধা সুনীতির কাছে পাঠিয়ে দেব।
কলকাতায়?
হ্যাঁ।
নিয়ে যাবে কে?
বিনু। এ ছাড়া সত্যিই ওকে বাঁচানো যাবে না।
বিনু কাছেই ছিল। বলল, এক কাজ করা যাক বরং—
হেমনাথ শুধোলেন, কী কাজ?
বাড়িঘর জমিজমা বেচে চল সবাই চলে যাই।
দৃঢ় স্বরে হেমনাথ বললেন, না, কিছুতেই না। কোনও অন্যায় আমি করিনি। বিনা দোষে জন্মভূমি ছেড়ে কেন চলে যাব? দুর্দিন দেখে সবাই যদি পালিয়ে যাই সুদিন আনবে কে? মনে রেখো সব মানুষই পশু হয়ে যায়নি, যেতে পারে না। আগের মতো দিন আবার আসবেই। তা ছাড়া
তা ছাড়া?
এখনও যারা রাজদিয়ায় আর আশপাশের গ্রামগুলোতে আছে, আমি চলে গেলে তারাও থাকবে না। তাদের জন্যও আমাকে রাজদিয়ায় থাকতে হবে।
কিন্তু–
হেমনাথ হেসে ফেললেন, তুই কি বলতে চাস, বুঝতে পেরেছি। এর জন্যে যদি মরতেও হয়, আমি রাজি।
