যুগল চলে যাবার পর পুবের ঘরের তক্তপোষে শুয়ে শুয়ে তার কথাই ভাবছিল বিনু। ওরা কলকাতায় যাচ্ছে।
আট ন’বছর আগে বিনুরা যেদিন প্রথম রাজদিয়া এল সেদিনই খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে কলকাতার কত খবর নিয়েছিল যুগল। কলকাতা তখন তার কাছে স্বপ্ন, তার কল্পনায় কলকাতা রমণীয় স্বর্গ হয়ে ছিল।
কিন্তু চল্লিশের কলকাতা আর এখনকার কলকাতা কি এক? প্রতিদিন ডাকে যে খবরের কাগজ আসে তাতে কলকাতার ভয়াবহ ছবি থাকে। সুবিশাল ওই মহানগর নাকি উদ্বাস্তুতে ছেয়ে গেছে। কোথাও থাকবার জায়গা নেই। তাই ছিন্নমূল নরনারীর দল রেল স্টেশনে, ফুটপাতে, রাস্তায় ছড়িয়ে পড়েছে।
আজকের কলকাতা যুগলকে কোন স্বর্গে পৌঁছে দেবে, কে জানে।
.
২.৫৫
যুগল যা ভবিষ্যদ্বাণী করে গিয়েছিল, অক্ষরে অক্ষরে ফলে গেল। একটা মাসও তারপর কাটে নি, রাজদিয়ার মাটি তেতে উঠল।
ঢাকা থেকে এসে কারা যেন সুজনগঞ্জে, মীরকাদিমে, ওদিকে আউটশাহী বেতকা আবদুলাপুরে প্রায় মিটিং করে যাচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে ঘরের চালে আগুন লাগছে, মাঠের পর মাঠ পাকা ধান কারা রাতের অন্ধকারে কেটে নিয়ে যাচ্ছে। শুধু কি তাই, সন্ধে হলেই ঘরের চালে চালে ঢিল পড়ে, দেশ ছেড়ে চলে যাবার জন্য বেনামা চিঠি আসে। এমন চিঠি খানকতক হেমনাথও পেয়েছেন।
ব্যাপারটা এতেই থেমে থাকল না। সুজনগঞ্জের হাট থেকে ফিরবার পথে সেদিন বারুইপাড়ার রাখাল আর যুগীপাড়ার রাধাবল্লভ সড়কির ঘা খেয়ে এল। তারপর যেদিন গণকপাড়ার কাঁপাসীকে খুঁজে পাওয়া গেল না সেদিন থেকে এই রাজদিয়াতেও ভাঙন শুরু হয়ে গেল। গণকপাড়া তো বটেই, কুমোরপাড়া কামারপাড়া বারুইপাড়া নাহাপাড়া, সব জায়গা থেকেই দলে দলে মানুষ ভিটেমাটি ফেলে স্টিমারে করে কলকাতার দিকে চলে যেতে লাগল। হেমনাথ আর মোতাহার সাহেব পিস কমিটি করেও ভাঙন ঠেকাতে পারলেন না।
ইদানীং সব চাইতে আশ্চর্য ব্যবহার হয়েছে মজিদ মিঞার। আগে প্রায় প্রতি সপ্তাহেই হেমনাথের বাড়ি আসত সে, আজকাল হাজার ডাকাডাকি করলেও আসে না। দেখা হলে এড়িয়ে যায়। তার সম্বন্ধে নানারকম কথা কানে আসছে। লোকটা অদ্ভুতভাবে বদলে গেছে।
শোনা যায়, মজিদ মিঞা নাকি কেতুগঞ্জের দিকে লিগের পান্ডা হয়ে উঠেছে। আশ্চর্য, এই মানুষই দশ বছর আগে, বিনুরা প্রথম যেদিন রাজদিয়ায় এল, পনৈর মাইল জল ঠেলে তাদের দেখতে এসেছিল। এই মানুষই সিগারেট খাবার জন্য তাকে মেরেছিল, মারের চোটে জ্বর এলে সারারাত তার শিয়রে বসে কেঁদেছিল। সুজনগঞ্জের হাটে দাঙ্গা বাধলে এই মানুষই পাগলের মতো ছোটাছুটি করেছিল। রক্তাক্ত, আহত অবস্থায় লারমোরকে রাজদিয়ায় নিয়ে আসার পর সে কমলাঘাটে ছুটেছিল ডাক্তার আনতে। তার হৃদয়ের উত্তাপ, তার আত্মীয়তাবোধ, তার মমতা, মহত্ত্ব বিনুকে এতকাল মুগ্ধ করেছে। আশ্চর্য, সেই মানুষটা বদলে গেল!
রাজদিয়ায় ততটা না হলেও আশেপাশের গ্রামগঞ্জগুলো থেকে প্রায়ই খুন-জখম-আগুনের খবর আসছিল। রাত হলেই উন্মত্ত চিৎকার শোনা যায়, অন্ধকার চিরে চিরে মশালের আলো দপদপ করে জুলতে থাকে।
একদিন আরও নিদারুণ খবর এল। রাজদিয়া থেকে গোয়ালন্দ পর্যন্ত যে স্টিমার সারভিস ছিল তা বন্ধ হয়ে গেছে। সমস্ত পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে রাজদিয়া যেন অজানা দ্বীপের মতো জলবাংলার এই প্রান্তে পড়ে রইল।
শুধু রাজদিয়া বা চারধারের গ্রামগুলোতেই নয়, ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-মানিকগঞ্জ থেকেও গোলমালের খবর আসছিল।
যত শুনছিলেন, যত দেখছিলেন, ততই যেন স্তব্ধ হয়ে যাচ্ছিলেন হেমনাথ। সমস্ত জগৎ থেকে কিছুদিনের জন্য নিজেকে গুটিয়ে এনে চুপচাপ বসে রইলেন। ঠিক বসে রইলেন না, সেই বড় বড় লোহার বাক্সগুলো খুলে সারা জীবনের সঞ্চয় অসংখ্য ভাল ভাল জিনিস– ময়ূরের পালক, সুন্দর হস্তাক্ষর, চকচকে পাথর, চমৎকার ছবি দেখে দেখে কাটালেন। মন খারাপ হলেই তিনি এগুলো নিয়ে বসেন। সারাদিন এসব দেখবার পর সন্ধেবেলা গির্জায় লারমোরের সমাধিতে বাতি জ্বালিয়ে দিয়ে আসতে লাগলেন।
দিনকয়েক পর হঠাৎ বুঝিবা হেমনাথের মনে হল, এভাবে নিজেকে গুটিয়ে এনে ঘরে বসে থাকা ঠিক হয়নি। আবার আগের মতো তিনি গ্রাম গ্রাম ঘুরতে লাগলেন। এই দুঃসময়ে তিনি পাশে থাকলে সবাই ভরসা পাবে।
.
চারদিক জুড়ে যখন আগুন জ্বলছে সেইসময় একদিন দুপুরবেলা ভবতোষ এলেন। চুল এলোমেলো, চোখের কোলে শ্যাওলার মতো কালচে দাগ, মুখময় তিন চার দিনের দাড়ি, চোখ আরক্ত। সমস্ত শরীর ঘিরে সীমাহীন বিষণ্ণতা।
দশ বছর ধরে ভবতোষের এই এক চেহারাই দেখে আসছে বিনু।
এসেই ভবতোষ বললেন, খুব খারাপ খবর কাকাবাবু—
হেমনাথ বাড়িতেই ছিলেন। উদ্বিগ্ন স্বরে বললেন, কী ব্যাপার?
ঝিনুকের মা মৃত্যুশয্যায়। শেষ সময়ে ঝিনুক আর আমাকে একবার দেখতে চেয়েছে।
কে বললে?
সেই খবর পাঠিয়েছে।
একটু ভেবে হেমনাথ বললেন, ঝিনুকের মা এখন কোথায়?
ঢাকায়।
তোর শ্বশুরবাড়ি?
না।
তবে?
যার সঙ্গে চলে গিয়েছিল তার কাছেই আছে।
কিন্তু–
কী? জিজ্ঞাসু চোখে তাকালেন ভবতোষ।
হেমনাথ বললেন, স্টিমার বন্ধ। চারদিকে গোলমাল চলছে। এর ভেতরে ঢাকায় যাবি কী করে?
আমি একটা বিশ্বাসী মাঝি ঠিক করে রেখেছি, সেই নৌকোয় করে নিয়ে যাবে। ভয়ের কিছু নেই।
এ সময় পাঠানো উচিত না। ঝিনুক বড় হয়েছে। তবু ওর মায়ের কথা ভেবে না পাঠিয়ে পারছি না। খুব সাবধানে যাবি কিন্তু–
